kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

আরো একটি যুদ্ধের কথা বলছি

বীরাঙ্গনাদের নিয়ে নির্মিত ‘রাইজিং সাইলেন্স’ ‘সেরা অনুসন্ধান’ শাখায় এশিয়ান মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবেও তথ্যচিত্রটি বেস্ট ডকুমেন্টারি এবং আমেরিকার মুনডান্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে ‘মুনডান্স উইনার পদক’ (প্রামাণ্যচিত্র) লাভ করে। নির্মাতা লীসা গাজীর সঙ্গে আলাপে বসেছিলেন জুয়েল রাজ

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে




আরো একটি যুদ্ধের কথা বলছি

তথ্যচিত্রের নাম ‘রাইজিং সাইলেন্স’, কারণ লীসা বীরাঙ্গনাদের বেঁচে থাকার গল্প বলতে চেয়েছেন। তিনি বললেন, ‘বীরাঙ্গনাদের ঘিরে, তাঁদের নির্মম সত্যকে ঘিরে নিস্তব্ধতা তৈরি করেছি আমরা। অন্যের অপরাধের ভার চাপিয়ে দিয়েছি তাঁদের ওপর। আমরা তাঁদের মাথা উঁচু করে বাঁচার সুযোগ দিইনি। তবে ভস্ম থেকে উঠে দাঁড়াবার শক্তি যাঁরা ধারণ করেন, আমাদের কি সাধ্য তাঁদের নীরব রাখার। সে কারণেই এই নাম। তাঁদের বয়ানে যেমন উঠে এসেছে একাত্তরের সেসব অন্ধকার দিনের কথা, আবার স্বাধীন দেশে আধা শতক পাড়ি দেওয়ার কথাও বলেছেন। যুদ্ধে সব হারানো সেই নারীদের স্বীকৃতি পেতেও অপেক্ষা করতে হয়েছে বছরের পর বছর। শেষে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া শুরু করে; তবে আন্তর্জাতিক কোনো স্বীকৃতি তাঁরা এখনো পাননি।

 

শুরুর কথা

‘বাবা লুতফুর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের জোনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। ছোটবেলা মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে কেটেছে; তবে বীরাঙ্গনাদের গল্প প্রথম শুনেছি ১৭ বছর বয়সে, বাবার মুখে। আমি চারপাশে তাঁদের খুঁজতাম; কিন্তু সবাই কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। পঁচাত্তরের পর তো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই নির্বাসিত হয়। স্কুলের ইতিহাস বইয়ে বীরাঙ্গনাদের কথা পর্যন্ত ছিল না। একাত্তরে নির্যাতনের শিকার ওই নারীদের বীরাঙ্গনা নাম দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বীরাঙ্গনাদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র ও কারিগরি প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। পঁচাত্তর সালের পর ওই কেন্দ্রগুলো পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কয়েক দশক লজ্জা, বিচ্ছিন্নতা আর বৈষম্যের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন তাঁরা।’ বলছিলেন লীসা।

২০১০ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে আসেন লীসা গাজী। তখন নাট্যব্যক্তিত্ব ইসরাত নিশাতের সঙ্গে সিরাজগঞ্জে বীরাঙ্গনাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই সেই দিন কয়েকজনের সাক্ষাত্কার রেকর্ড করেছিলেন অনুমতি নিয়ে। ২০১২ সালে জানলেন, যাঁদের সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে দুজন মারা গেছেন। ভীষণ ধাক্কা খেলেন। মনে হলো, তাঁদের গল্প আর বাংলাদেশের গল্প তো অভিন্ন। এই বীর নারীরা চলে গেলে তো আর কিছুই থাকবে না।

তারপর কিছুকাল আগে ফ্রান্স সীমান্তে সিরিয়ান উদ্বাস্তুদের নিয়ে কাজ করার সময় দলে এক পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত দম্পতি ছিলেন। এক রাতে ডিনারের টেবিলে স্ত্রী যখন বলছিলেন লীসা বাংলাদেশের বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করছেন; স্বামী তখন বলেছিলেন, এই দুই লাখ বীরাঙ্গনা কল্পকাহিনি! লীসা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সেদিন। বললেন, ‘মনে হয়েছে, আমরা ব্যর্থ হয়েছি একাত্তরের নির্যাতন, রক্তপাত, যৌন সহিংসতার ভয়াবহতার কথা পৃথিবীকে জানাতে। ভাবলাম, এই নির্যাতন আর তাঁদের ত্যাগের কথা পৃথিবীকে জানাতে হবে।’

 ভাঙে নীরবতা

‘‘৯ জন বীরাঙ্গনার একান্ত আপন কথাগুলো তুলে আনার চেষ্টা করেছি ‘রাইজিং সাইলেন্স’-এ। দিনের পর দিন তাঁদের সঙ্গে থেকেছি। অতি আপন ভেবে তাঁরা আমাকে তাঁদের নির্যাতনের কথা বলেছেন। তাঁদের বীরগাথা শুনিয়েছেন। যে ৯ জন বীরাঙ্গনাকে নিয়ে ‘রাইজিং সাইলেন্স’ তাঁদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছেন। একে একে হারিয়ে যাবে সবাই; কিন্তু তাঁদের কথা রয়ে যাবে। এই বোধ থেকেই তথ্যচিত্রটি নির্মাণে আগ্রহী হয়েছি।’’ বলছিলেন লীসা।

 

সেসব নিকষকালো দিন

১৯৭১ সালে ৯ মাসব্যাপী যুদ্ধের সময় চার বোন —আমিনা, মালেকা, মুখলেছা ও বুধি বেগমকে পাকিস্তানি সেনা ও স্থানীয় দোসররা অপহরণ করে নিয়ে যায়। তাঁরা বন্দি ছিলেন প্রায় আড়াই মাস। তাঁদের একজন বুধি বেগম মুক্তি পাওয়ার আগেই যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মারা যান। মালেকা বলেন, ‘ওই একটি কক্ষে আমরা ২২ জন লাশের মতো পড়ে থাকতাম।’ মুখলেছা অত্যাচার থেকে বাঁচতে পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। রাইজিং সাইলেন্সে মুখলেছা বলেছেন কিভাবে পাকিস্তানি সেনারা নারীদের তুলে নিয়ে মানববর্ম হিসেবে ব্যবহার করত। লীসা গাজী ৮০ জনেরও বেশি বীরাঙ্গনা নারীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো যেসব বীরাঙ্গনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁদের বেশির ভাগই দরিদ্র ও জরাগ্রস্ত। বেশির ভাগই সন্তান, মা-বাবা বা স্বামী হারিয়েছেন। লীসা বলছিলেন, ‘আমরা যদি যৌন সহিংসতার ইতিহাস অগ্রাহ্য বা নাকচ করি, তবে তা কোনো দিনও বন্ধ হবে না। আমাদের তাঁদের কথা শুনতে হবে।’

যা চেয়েছি

‘কত কষ্ট, কত অপবাদ, মানসিক অত্যাচার সহ্য করে তাঁরা টিকে ছিলেন। অনেক বীরাঙ্গনাকে নষ্টা মেয়ে আখ্যা দিয়ে গ্রাম থেকেও বের করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সন্তানরাও নানা কটু কথা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। এসব সহ্য করে তাঁরা যে টিকে ছিলেন সেটাই বড় কথা। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কিছু মানুষ এঁদের রক্তাক্ত করেছে সামাজিকভাবে হেয় করে। আবার কিছু মানুষ তাঁদের ব্যবহার করে অনেক ফায়দা নিয়েছে।

তাঁরা মমতা চান, আদর চান, সম্মান চান। আমি সেই হূদয় নিয়ে তাঁদের কাছে গিয়েছি। অনেক দিন তাঁদের সঙ্গে মিশেছি। তাঁদের এটা বুঝিয়েছি—আমি ছবিটি করছি তাঁদের সম্মানিত করার জন্য। ছবিটি যাঁরা দেখবেন সবাই বীরাঙ্গনাদের জন্য হাহাকার প্রকাশ করবেন, তাঁদের সম্মান করবেন। আর এটাই আমি চাই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করেন যাঁরা, তাঁদের অবশ্যই চলচ্চিত্রটি দেখা উচিত বলে মনে করি। যেসব বীর নারীর বেদনা মিশে আছে আমাদের স্বাধীনতায়, তাঁদের গুরুত্ব জানুক প্রজন্ম, তাঁদের যথাযোগ্য সম্মানটা যেন করে সবাই।’ বলছিলেন লীসা

 

বিশেষ অভিজ্ঞতা

‘রাইজিং সাইলেন্স’ নির্মাণের নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি অভিজ্ঞতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন লীসা। বলেন, ‘এই সব মহীয়সী নারীর কাছে না গেলে তাঁদের বিশাল মন ও ত্যাগের কথা কোনো দিন বুঝতে পারতাম না। একজন নারী যে নিজেই অনেক দিন ধরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি। তাঁর মুক্তির কোনো পথ নেই। অথচ নতুন কোনো মেয়েকে ধরে আনা হলে সেই নারী চেষ্টা করেছেন কিভাবে ওই মেয়েটিকে এখান থেকে মুক্তি দেওয়া যায়। নিজে মৃত্যুর মুখে থেকে অন্যকে বাঁচানোর এই যে মানসিকতা, সাধারণ নয় মোটেই। তাঁদের ভাবনাটা ছিল, যা হয়েছে আমার সঙ্গেই হোক। আর কোনো মেয়ের জীবন যেন নষ্ট না হয়।

 

হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যাঁরা

ছবিটি প্রযোজনা করেছে লন্ডনভিত্তিক সংগঠন কমলা কালেক্টিভ, ওপেনভাইজার ও মেকিং হার স্টোরি। এ ছাড়া মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, দ্য ওয়েসিস গ্রুপ, মুকওয়েগে ফাউন্ডেশন, নারী দিগন্ত, হোপ অ্যান্ড মাইক, মেম সাহেব রেস্টুরেন্টসহ অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন সহযোগিতা দিয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ে। পাশাপাশি বিলেতের বাঙালি কমিউনিটির সহযোগিতাও ছিল। যেমন রোখসানা নামের একজন তাঁর সঞ্চয় থেকে তুলে দিয়েছিলেন এক হাজার পাউন্ড। মানবাধিকারকর্মী পুষ্পিতা গুপ্তা তাঁর নিজের বাসায় আয়োজন করেছিলেন চ্যারিটি ডিনারের। আগামী পরিকল্পনা সম্পর্কে লীসা বলেন, ‘এখনো তেমন কোনো পরিকল্পনা করিনি। আপাতত এই ছবিটি নিয়েই আছি। ইচ্ছা আছে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের। আমি বীরাঙ্গনাদের এই কাজটির শুটিং করেছি বাংলাদেশের পাঁচটি অঞ্চল ও কলকাতায়। কাজটি কিন্তু করেছি বাংলাদেশের মানুষের জন্য।’

ছবি: শিহাব খান

ব্যক্তি লীসা গাজী

১৯৯৯ সাল থেকে ব্রিটেনে আছেন। স্বামী ফয়সাল গাজী। দুই সন্তান শ্রেয়া ও ঋষি। লীসা কমলা কালেক্টিভের সহপ্রতিষ্ঠাতা। তাঁর মঞ্চনাটকের মধ্যে রয়েছে—বীরাঙ্গনা : উইমেন অব ওয়ার, সোনাটা, রোকেয়ার স্বপ্ন, দৈত্যের প্রতিশোধ, চিন্তাশীল মানুষ ও বনবিবি। তাহমিমা আনামের ‘আ গোল্ডেন এজ’ উপন্যাসের স্ক্রিপ্ট লেখেন আর তাতে অভিনয়ও করেন। তিনি আকরাম খানের ‘দেশ’-এ একজন সাংস্কৃতিক সমন্বয়কারী ও একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে কাজ করেন। ২০১২ সালে গ্লোব থিয়েটারে অনুষ্ঠিত গ্লোব টু গ্লোব ফেস্টিভালে তিনি দ্য টেমপেস্টের একজন স্ক্রিপ্ট লেখিকা হিসেবে কাজ করেন। ২০১০ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রৌরব’ প্রকাশিত হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা