kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

জাকির বিশ্বাস ও একাত্তরজন

নিজের জীবন থেকেই শিক্ষা পেয়েছেন শিক্ষক জাকির বিশ্বাস। তার পর থেকে আছেন মানুষের পাশে। মানিক আকবর দেখা করে এসেছেন

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জাকির বিশ্বাস ও একাত্তরজন

জাহিদ হাসানের হাতে অর্থ সহায়তা তুলে দিচ্ছেন জাকির বিশ্বাস

২০১৬। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার তিতুদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জাকির বিশ্বাসের মেয়ে জাকিয়া (দুই বছর) অসুস্থ। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ল, জাকিয়া ক্যান্সারে আক্রান্ত। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় ছুটলেন জাকির বিশ্বাস। চিকিৎসা চলতে থাকল। ঢাকায় চিকিৎসকরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আশা কম। চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। শিক্ষক জাকির বিশ্বাস চোখে অন্ধকার দেখলেন। মনে হলো, পৃথিবীতে কোনো আলো নেই। মেয়েকে ছাড়া খালি হাতে কেমন করে চুয়াডাঙ্গায় ফিরবেন? আশা কম, তার পরও জাকির বিশ্বাস নিজের সহায়-সম্বল যা কিছু আছে, বিক্রি করে দিলেন। মেয়েকে ভর্তি করে দিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসা চলতে থাকল।

জাকির বিশ্বাসের হাতে আর কোনো টাকা-পয়সা নেই। উপায় না দেখে তিনি ফেসবুকে নিজের মেয়ের জন্য সাহায্যের আবেদন জানালেন। সাড়া মিলল, বিশেষ করে প্রবাসী কয়েকজন ভাই আর্থিক সহায়তা দিলেন। একসময় আলো ফুটল। মেয়ের শারীরিক অবস্থা ভালোর দিকে যাচ্ছে। চিকিৎসকরাও আশাবাদী হলেন। বললেন, মেয়ে সুস্থ হয়ে যাবে। সর্বশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আর কোনো ভয় নেই।

 

চোখ খুলে গেল

জাকির বিশ্বাস বুঝেছেন, দেশের মানুষের হাতে অনেক টাকা। তার পরও শুধু টাকার জন্য বিনা চিকিৎসায় অনেকে মারা যান। তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সিদ্ধান্ত নিলেন দরিদ্র, অসহায় মানুষের চিকিৎসার জন্য তিনি মানুষের কাছে হাত পাতবেন। যে যা দেবেন, তা নিয়ে তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।

 

শুরু হলো কাজ

সদর উপজেলার গোষ্টবিহার গ্রামের ছয় বছর বয়সী শিশু আকাশ উদ্দিনের বুকের হাড় ভেঙে গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়। চিকিৎসা করানোর মতো অর্থ নেই আকাশের মা-বাবা ও স্বজনদের হাতে। শিক্ষক জাকির বিশ্বাস মেয়ের জন্য যেভাবে সহায়তা চেয়েছিলেন, সেই পদ্ধতিতে গেলেন। আকাশের জন্য ফেসবুকে লিখলেন। এবারও সাড়া মিলল। ৩৫ হাজার টাকা সংগ্রহ হলো। সেই টাকা তুলে দেওয়া হলো আকাশের চিকিৎসার জন্য। এভাবে একের পর এক অসহায় মানুষের জন্য ফেসবুকে লিখছেন জাকির বিশ্বাস। একেবারে শুরুতে জাকির বিশ্বাসের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এলাকার আরো দুজন। পরে আরেকটু বড় হয় দলটি। ১২ জন মিলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে অসহায় মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তা নেওয়া শুরু করেন। ভালো কাজে ভালো মানুষ পাশে পাওয়া কঠিন কিছু নয়। শিক্ষক জাকির বিশ্বাসের পাশে এখন ৭১ জন। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দিয়েছেন জাকির বিশ্বাসের কাজের সঙ্গে। এখন সবাই মিলে কোনো না কোনো দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বিত্তবানদের কাছে সহায়তা চাচ্ছেন। গড়ে তুলেছেন সংগঠন। নাম ‘আমরা মানুষের জন্য’।

 

যেভাবে কাজ করেন

চিকিৎসার জন্য কোনো দরিদ্র অসহায় মানুষের টাকা দরকার। তার কথা নিজের ফেসবুক আইডিতে লেখেন জাকির বিশ্বাস। সেখানে দেওয়া থাকে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নাম্বার, বিকাশ ও রকেট নাম্বার। কেউ সহায়তার জন্য টাকা পাঠালে দ্রুততম সময়ে জাকির বিশ্বাস ওই টাকা প্রদানকারীর নাম ও টাকার পরিমাণ ফেসবুকে লিখে দেন। মোট কত টাকা এলো তা-ও লিখে দেন। যাঁর জন্য টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু হয়, তাঁর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয় সেই টাকা।

 

যাঁরা সহায়তা পেয়েছেন

গত ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত জাকির বিশ্বাস সংগৃহীত অর্থ ২৩ জনের চিকিৎসার জন্য দিয়েছেন। দুটি প্রতিষ্ঠানকেও উন্নয়নকাজের জন্য অর্থ দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের মার্চ-এপ্রিল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৬২ টাকা প্রদান করা হয়েছে। জাকির বিশ্বাসের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পাওয়া সদর উপজেলার হুলিয়ামারী গ্রামের নাইমুর রহমান পবন জানান, তিনি মালয়েশিয়ায় ছিলেন। সেখানে তাঁর ব্রেনস্ট্রোক হয়। মালয়েশিয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসার পর পবনকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশে। মালয়েশিয়া থেকে প্রায় শূন্য হাতে আসতে হয়। চিকিৎসার জন্য টাকার দরকার। পাশে এসে দাঁড়ান জাকির বিশ্বাস। পবনকে নিয়ে নিজের ফেসবুক আইডিতে লিখে সহায়তা চান। সংগ্রহ হয় ৭০ হাজার ৫০০ টাকা। সেই টাকা তুলে দেওয়া হয় পবনের হাতে। পবন বলেন, ‘আমার চিকিৎসা চলছে। এখন অনেকটা ভালো। টাকাটা না পেলে বোধ হয় বিনা চিকিৎসায় মারা যেতাম।’ সদর উপজেলার বড় সলুয়া গ্রামের নাজমুস সাকিব (১৩) ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। তাঁকে চিকিৎসার জন্য দেওয়া হয় ২৯ হাজার টাকা। সাকিবের মামা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘বিপদের সময় জাকির স্যার পাশে ছিলেন। চিকিৎসা করানো হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাকিবকে বাঁচানো যায়নি। সান্ত্বনা এটুকু যে বিনা চিকিৎসায় সাকিবের মৃত্যু হয়নি।’ সদর উপজেলার হালদা চাঁদপুর গ্রামের জাহিদ হাসান ক্যান্সারে আক্রান্ত। তাকে দেওয়া হয়েছে ৩২ হাজার টাকা। চিকিৎসায় তার একটি হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। এখনো তার চিকিৎসা চলছে।

সদর উপজেলার বড় আড়িয়া গ্রামের শিশু তুহিন আলীর বয়স তিন বছর। চোখে সমস্যা। কর্নিয়া সংযোজন করতে হবে। তার জন্য আর্থিক সহায়তা এসেছে ৪০ হাজার টাকা। গত ৩০ অক্টোবর চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলামের মাধ্যমে তুহিন আলীর পরিবারের হাতে ওই টাকা তুলে দেওয়া হয়। এর আগে হুলিয়ামারী গ্রামের রোকসানা খাতুনকে ২০ হাজার টাকা, একই গ্রামের মনোয়ার হোসেনকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা, আলমগীর হোসেনকে দেওয়া হয়েছে ৪০ হাজার টাকা।

     ছবি : লেখক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা