kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

বাঙালির বিশ্বদর্শন

স্মৃতির নগরী ইয়াঙ্গুন

ফাতিমা জাহান   

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্মৃতির নগরী ইয়াঙ্গুন

আমার হোটেলটা শহরতলীতে, ট্যুরিস্ট এলাকায়। আশপাশে খাবারের দোকানের অভাব নেই। রাতে খেলাম পাশেই একটি রেস্টুরেন্টে। বার্মিজদের মূল খাদ্য ভাত। সঙ্গে স্যুপ বা হিন গিয়ো, সিদ্ধ সবজি, মাছ বা মাংসের তরকারি, যাকে বলা হয় হিন। সাধারণত সব তরকারিতে মাছ বা শুঁটকির এক ধরনের পেস্ট বা মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। রান্নায় মসলার আধিক্য নেই। ফলে খেতে বেশ লেগেছে। খাবারে মাছের আচার থাকবেই। প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় শহর রেঙ্গুন। রেঙ্গুন শব্দের আভিধানিক অর্থ দ্বন্দ্ব বা বিবাদের সমাপ্তি। ১১ শতাব্দীতে মন গোষ্ঠীর রাজা এ নগরটির পত্তন ঘটান।

১৮৫২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রেঙ্গুন ছিল বার্মার ঐতিহ্যবাহী আধুনিক রাজধানী। বর্তমান পরিধি ৬০০ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। ১৯৮৯ সালে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর ব্রিটিশদের দেওয়া নাম বার্মা ও রেঙ্গুন বদলে মিয়ানমার ও ইয়াঙ্গুন রাখে।

ঐতিহাসিক শোয়েডাগন প্যাগোডা দিয়ে ভ্রমণের শুরু। একটা ট্যাক্সি নিয়ে চললাম প্যাগোডার উদ্দেশে। রেঙ্গুনে ট্যাক্সি আর লোকাল বাস ছাড়া আমাদের মতো ভ্রমণকারীদের চলাচলের অন্য কোনো মাধ্যম নেই। কারণ এ শহরে না আছে অটোরিকশা, না অনুমতি আছে ভ্রমণার্থীদের সাইকেল বা মোটরসাইকেল চালানোর। ১৫ মিনিটের মাথায় পৌঁছে গেলাম শোয়েডাগন প্যাগোডার পাদদেশে। এটি বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন প্যাগোডা হিসেবে পরিগণিত হয়। বলা হয়ে থাকে, দুই হাজার ৬০০ বছর আগে স্তুপা ও প্যাগোডাটি নির্মিত হয়। কিন্তু দালিলিক প্রমাণ মেলে ষোড়শ শতাব্দীতে।

মন জনগোষ্ঠীর রাজা প্যাগোডাটি নির্মাণ করেন। সিংগুট্টা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত প্যাগোডাটির উচ্চতা ৯৯ মিটার। স্তুপাটি সোনা দিয়ে মোড়ানো। তৎকালীন রাজার সঙ্গে জনসাধারণও প্যাগোডাটি স্বর্ণমন্দিরে রূপান্তরিত করতে নিজেদের সোনা-দানা দান করেছিল। চতুর্দশ, সপ্তদশ ও বিংশ শতাব্দীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় প্যাগোডাটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। প্যাগোডাটির ভিত্তি ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি আর গোলাকার। দেখলে মনে হয়, যেন সোনার তৈরি বিশাল একটি ফানেলকে উল্টোভাবে বসানো হয়েছে। স্তুপার চূড়ায় সোনার তৈরি ছাতায় পাঁচ হাজার ৪৪৮টি হিরা এবং দুই হাজার ৩১৭টি পদ্মরাগমণি বা চুনি বসানো। সবচেয়ে ওপরে যে হিরাগুলো বসানো হয়েছে তা ৭৬ ক্যারেটের। প্রধান স্তুপাকে ঘিরে ছোট অনেক স্তুপা রয়েছে। আর চত্বরটি ঘিরে আছে অনেক উপাসনাগৃহ। গৌতমবুদ্ধের বিশাল মূর্তিসংবলিত বিশালাকারের প্রার্থনালয়গুলো বিভিন্ন আকৃতির ও মনোরম নকশা দ্বারা যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

বিশাল প্যাগোডা চত্বরটিতে চারটি প্রবেশদ্বার। মূল সড়ক থেকে সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ে চড়ার ব্যবস্থা আছে প্রতিটি দ্বারমুখে। প্রধান ফটক পার হতেই টিকিট কাউন্টার। প্যাগোডাটি নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি কারণ, বলা হয়ে থাকে এখানে গৌতমবুদ্ধের আটটি চুল সংরক্ষিত আছে। প্যাগোডা প্রাঙ্গণে স্তুপাকে ঘিরে চক্রাকারে ঘুরে আসতে হয়। মূল স্তুপার সামনে এবং আশপাশে অনেক ছোট ছোট স্তুপা এবং গৌতমবুদ্ধের বিভিন্ন আকারের মূর্তি ক্রমান্বয়ে সাজানো। স্তুপার প্রথম ভাগে ঢোকার অনুমতি আছে শুধু বৌদ্ধভিক্ষু ও পুরুষ দর্শনার্থীদের। ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিক থেকে স্তুপা ঘুরে আসতে হয়। প্রতিদিন শত শত ভিক্ষু, স্থানীয় মানুষজন ছাড়াও প্রচুর বিদেশি পর্যটক প্যাগোডাটি দর্শন করেন। স্তুপা, তার আশপাশের কারুকাজ, স্থাপত্যশৈলী ইত্যাদি দেখতে কমপক্ষে ৬-৭ ঘণ্টা প্রয়োজন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শহরগুলোর মধ্যে এ শহরেই ব্রিটিশ স্থাপত্যের আদলে তৈরি ভবন সবচেয়ে বেশি।

পরবর্তী গন্তব্য সুলে প্যাগোডা, দুই হাজার বছরের পুরনো উপাসনালয়। এর স্থাপত্যশৈলী প্রায় শোয়েডাগন প্যাগোডার মতোই; তবে উচ্চতা ৪৬ মিটার আর অষ্টভুজাকৃতি। এটি শহরের ঠিক মধ্যখানে অবস্থিত। তবে বাইরের কোলাহল প্যাগোডার ভেতরের নির্জনতাকে কোনোভাবেই ছুঁতে পারেনি। প্যাগোডাটি একবার প্রদক্ষিণ করতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগল। দেখা গেল, এখানে উপাসনা করা ছাড়াও অনেকে বসে একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিচ্ছেন। এ রকম এক বৃদ্ধের দলের পাশে বসেছিলাম। সেখান থেকে গেলাম চাউখতাতগাই প্যাগোডায়। যেখানে গৌতমবুদ্ধের আধা শোয়া প্রতিকৃতি রয়েছে। এটি পৃথিবীতে বুদ্ধের সবচেয়ে বড় আধা শোয়া অবস্থার প্রতিকৃতি। প্রতিকৃতির পায়ের তলায় আঁকা বৌদ্ধধর্মের ১০৮টি শুভসংকেত। দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটক ও ভিক্ষুরা প্রতিদিন পুণ্য সঞ্চয়ের আশায় আসেন এখানে। পরের গন্তব্য ইনইয়া লেক। ইয়াঙ্গুন শহরে জল সরবরাহের জন্য ব্রিটিশরা লেকটি তৈরি করেছিল ১৮৮৩ সালে। ইনইয়া মিয়ানমারের দীর্ঘতম লেক। পরিধি ৩৭ একর। সময় কাটানোর জন্য লেকটি আদর্শ। বিভিন্ন বয়সের মানুষ আসেন এখানে। লেকের কিনারাজুড়ে হাঁটার জন্য ফুটপাত রয়েছে। লেকের একপাশে ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যপাশে অং সান সু চির বাড়ি। লেকটির কিনারা ধরে হাঁটা শুরু করলে একবার ঘুরে আসতে প্রায় ঘণ্টাদুয়েক লাগে। ইনইয়া লেক থেকে চলে গেলাম বোগইয়োকে আং সান মার্কেটে। হস্তশিল্প আর প্রেশাস, সেমি প্রেশাস পাথরের গয়নার জন্য মার্কেটটি বিখ্যাত। কাঠের ওপর কারুকাজ করা একটি দেয়ালে ঝোলানোর ফ্রেম নিলাম আর বন্ধুদের জন্য কিনলাম নাম না জানা কিছু পাথরের গয়নাগাঁটি। এখানে গয়নাগুলো আশাতীত রকমের সস্তা। তবে দরদামে পাকা হতে হবে। ফ্রি ওয়াই-ফাই ছাড়াও মার্কেটে সারি সারি চেয়ার পাতা রয়েছে কেনাকাটা করতে আসা মানুষের বিশ্রামের জন্য। একটি চেয়ারে বসে অভ্যাসবশত মানুষজন দেখতে লাগলাম। ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী বৌদ্ধভিক্ষুরা তাদের অন্নসংস্থানের জন্য ভিক্ষা করছে লাইন ধরে। কেউ তাদের আশাহত করছিল না। যেমন আমার মতো ভ্রমণকারীদের আশাহত করেনি ইয়াঙ্গুন।

     ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা