kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মহাপৃথিবী

ভয়ংকর যাত্রা

একটি লরির পেছনে কনটেইনারের ভেতর ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে ৩৯ জন ভিয়েতনামীর করুণ মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তোলপাড় চলছে ব্রিটেনে। এই ঘটনা জাওয়াদ আমিরিকে মনে করিয়ে দিয়েছে নিজের জীবনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। তিনিও একইভাবে ব্রিটেনে এসেছিলেন। বিবিসিকে বলেছেন সে ভয়ংকর যাত্রার কথা

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভয়ংকর যাত্রা

কনটেইনারে লুকিয়ে ব্রিটেনে আসতে গিয়ে প্রায় মরতে বসেছিলেন জাওয়াদ আমিরি

২৮ বছর বয়সী জাওয়াদ আমিরি এসেছেন আফগানিস্তান থেকে। ফ্রান্সের উপকূলে ক্যালে বন্দর থেকে একটি কনটেইনারের ভেতর লুকিয়ে তিনি ব্রিটেন ঢোকেন। তাঁরা ছিলেন মোট ১৫ জন অভিবাসীর একটি দল।

কনটেইনারটি ছিল সিলগালা করা। ব্রিটেনের এম-ওয়ান মোটরওয়ে দিয়ে যখন এই কনটেইনারটি নিয়ে লরিটি যাচ্ছিল, তখন ভেতরে অক্সিজেন স্বল্পতায় সবাই মরতে বসেছিলেন।

জাওয়াদ আমিরির সাত বছর বয়সী ভাই আহমেদের টেক্সট মেসেজ তাঁদের সবার জীবন বাঁচায়।

 

এটি ছিল এক চলন্ত কবর

প্রতি রাতে মানুষ পাচারকারী দলের লোকজন একটি লরি নিয়ে আসত। সেটির পেছনে তারা ২০ থেকে ৩০ জন পর্যন্ত অভিবাসীকে তুলত। প্রত্যেকের কাছ থেকে তারা টাকা নিত। আপনি বাঁচলেন না মরলেন, সেটা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।

আমি ও আমার সাত বছরের ছোট ভাই আহমেদ একটি রেফ্রিজারেটেড লরির পেছনে উঠি। আমাদের সঙ্গে আরো ১৩ জন। আমাদের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে ওরা লরির দরজা বন্ধ করে দিল। সবাই তখন ভীষণ ভয়ে আর আতঙ্কে। কারণ ভেতর থেকে দরজা খোলার কোনো উপায় নেই।

লরির ভেতরে ছিল অনেক ওষুধের বাক্স। দুই সারি ওষুধের বাক্সের মাঝখানে একটুখানি জায়গা, বড়জোর আধা মিটার। সেখানে আমাদের প্রায় ১৫-১৬ ঘণ্টা ধরে শুয়ে থাকতে হয়েছিল। আমাদের নড়াচড়ার কোনো জায়গা ছিল না। বসার উপায় নেই, দাঁড়ানোর উপায় নেই। মনে হচ্ছিল আমরা যেন একটা চলন্ত কবরের মধ্যে শুয়ে আছি।

ভেতরে ছিল পুরোপুরি অন্ধকার। শুরুতে বেশ ঠাণ্ডা ছিল। কারণ এটি একটি রেফ্রিজারেটেড কনটেইনার। কিন্তু এরপর এয়ারকন্ডিশনিং আর কাজ করছিল না, এটি বিকল হয়ে গিয়েছিল। এরপর ভেতরে তাপমাত্রা বাড়তে থাকল। আমরা আমাদের কম্বল সরিয়ে নিলাম, কাপড়চোপড় খুলে ফেললাম। আমাদের সঙ্গে শুধু অল্প পানি ছিল। তারপর পানিও ফুরিয়ে গেল। আমাদের টয়লেটে যাওয়ারও কোনো উপায় নেই।

 

আমরা দেয়ালে জোরে জোরে আঘাত করছিলাম

ভেতরে শ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমার ভাই কাঁদছিল। ও খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল আর কাশছিল। আমি ওকে বলে যাচ্ছিলাম, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে, ওরা দরজা খুলে দেবে।’ আমরা ঘামছিলাম।

কনটেইনারের ভেতরটা আরো গরম হয়ে উঠছিল। আমরা কথা পর্যন্ত বলতে পারছিলাম না। আমরা চিৎকার করে ড্রাইভারকে ডাকছিলাম, দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলাম।

ড্রাইভার অনেকবার থেমেছিল। আমরা আশা করছিলাম যে ও দরজা খুলবে। কিন্তু ও দরজা খুলতে চায়নি।

খুব খারাপ ভাষায় ও আমাদের গালাগাল দিচ্ছিল এবং আমাদের চুপ থাকতে বলছিল চিৎকার করে।

আমাদের মধ্যে কারো কারো কাছে ফোন ছিল। কিন্তু ওরা পুলিশ ডাকতে চাইছিল না। কারণ ওদের ভয় ছিল, পুলিশ ডাকলে তো সবাই  ধরা পড়ে যাবে, তারপর সবাইকে আবার ফেরত পাঠিয়ে দেবে।

 

আহমেদের পাঠানো টেক্সট মেসেজই ১৫ জন মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিল


 

ভেতরে কোনো অক্সিজেন ছিল না

আমার ফোনের ব্যাটারির চার্জ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার ভাই আহমেদের ফোনটা ছিল খুব ছোট।

আহমেদ ওর ফোন থেকে আমাদের অভিবাসী ক্যাম্পের একটি এনজিওর এক মহিলাকে টেক্সট মেসেজ পাঠাল। আহমেদকে ওই মহিলাই ফোনটি দিয়েছিল। ভুল ইংরেজিতে আহমেদ লিখেছিল, ‘আমাদের সাহায্য করো। লরির ভেতরে কোনো অক্সিজেন নেই এবং ড্রাইভার থামছে না।’

ওই মহিলা তখন জবাব দিল, ‘তোমরা নড়াচড়া করো না। বেশি কথাও বলো না। আমরা পুলিশ ডাকছি।’

এরপর পুলিশ এলো। তাদের সঙ্গে ছিল কুকুর। পুলিশ এসে লরিটি খুঁজে বের করল। তারপর পেছনের দরজা খুলে দিল। এরপর আমরা সবাই খুশি।

একজন ডাক্তার এসে আমাদের সবাইকে পরীক্ষা করলেন। ডাক্তার বললেন, সবাই ঠিক আছে। তারপর আমাদের একটি হোস্টেলে নিয়ে যাওয়া হলো।

 

১০ বছর বয়সী আহমেদ সেই লরির এই ছবিটি এঁকেছে


 

ওদের জন্য আমার খুব দুঃখ লাগছে

আমি এখন সুখী। আমার যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি আছে। আমি এখন একটি কলেজে কোর্স করছি নির্মাণশিল্পে কাজ করার জন্য।

আমার ছোট ভাইয়ের বয়স এখন ১০ বছর। লরিতে আমাদের যে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেটি নিয়ে এবং ওর স্বপ্ন নিয়ে সে একটা ভার্চুয়াল রিয়ালিটি প্রগ্রাম তৈরি করেছে।

আমি যখন গাড়িতে যাওয়ার সময় আমার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখন তার কাছ থেকে এসেক্সে এই অভিবাসীদের মৃত্যুর খবর পাই।

সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হচ্ছিল, আমার শরীর হয়তো আমার গাড়িতে, কিন্তু মানসিকভাবে আমি যেন ফিরে গিয়েছিলাম সেই লরির ভেতরে। আমি অসুস্থ বোধ করছিলাম। আমার সেই দুঃসহ স্মৃতি যেন ফিরে আসছিল। আমার মনে হয় ওরা অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছে। ওদের জন্য আমার এত খারাপ লাগছে।

ওরা তো শুধু ৩৯ জন মানুষ মাত্র নয়, ওদের আছে ৩৯টি পরিবার। যারা হয়তো হারিয়েছে একজন ভাই বা একজন বোনকে।

ব্রিটেনের মানুষ খুব বুদ্ধিমান, ভালো ও দয়ালু। যারা নিজের বাড়িঘর, পরিবার এবং সব কিছু ছেড়েছুড়ে এভাবে ভিনদেশে পাড়ি জমায়, তাদের ব্যাপারে এই ঘটনার পর আমরা যেন আরো দায়িত্বশীল হই, সেটাই আমি আশা করব।

(ঈষৎ সংক্ষেপিত ও অভিযোজিত)

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা