kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

উদ্যমী বাংলাদেশ

জাকারিয়ার বৃদ্ধাশ্রম

কেউ খবরের কাগজ পড়ছেন। কেউ বই পড়ছেন। কেউ লুডু খেলছেন। যশোর শহরের মুজিব সড়কের ‘কেনায়েত আলী আনোয়ারা খাতুন ওল্ড হোম’ যশোরের একমাত্র বৃদ্ধাশ্রম। কলেজের ইংরেজি শিক্ষক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা, ট্রাকচালক বা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মিলেমিশে এখানে পৃথক পরিবার গড়ে তুলেছেন। এ এ এম জাকারিয়া এর প্রতিষ্ঠাতা। ফখরে আলম জানাচ্ছেন বিস্তারিত

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জাকারিয়ার বৃদ্ধাশ্রম

সুখে-অসুখে প্রবীণদের পাশে থাকেন জাকারিয়া

যশোর জিলা স্কুলের সামনে রোটারি হাসপাতাল। এর পেছনেই বৃদ্ধাশ্রমটি। লম্বালম্বি সাতটি কক্ষ। কোনোটিতে দুটি শয্যা, কোনোটিতে তিনটি। একটি হচ্ছে প্রবীণদের বিনোদনকক্ষ। একটি হচ্ছে খাওয়াদাওয়ার কক্ষ। এখানে প্রবীণদের থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা—সবই ফ্রি। এখানে প্রবীণরা হাসি-খুশির মধ্যেই বসবাস করছেন। ২০১২ সালে এই বৃদ্ধাশ্রমের যাত্রা শুরু হয়। ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হয়। এখানকার সদস্যসচিব এ জেড এম সালেক বলেন, ‘বৃদ্ধাশ্রমের ব্যয় নির্বাহের জন্য ৬১ লাখ টাকা ব্যাংকে এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট) করে রাখা হয়েছে। তারই মুনাফার টাকায় বৃদ্ধাশ্রমের কার্যক্রম চলছে।’

 

বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দারা

ফজলুল হকের বয়স ৫২ বছর। তিনি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের একটি বেসরকারি কলেজের ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। তাঁর  ছোট ছোট তিনটি সন্তান রয়েছে। কয়েক বছর আগে স্ট্রোকে ফজলুল হক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তিনি আর স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেননি। এক আত্মীয়ের মাধ্যমে খবর পেয়ে গত তিন বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন। ফজলুল হক বলেন, ‘এখানে বেশ আছি। মাঝেমধ্যে ছেলে-মেয়েরা এসে দেখে যায়। অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে গল্প করে আর বই পড়ে আমার সময় কাটে। বাড়ি থাকলে হয়তো বাঁচতাম না।  এখানে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করা হয়।’

যশোর সদর উপজেলার বলাডাঙ্গা গ্রামে নুরুল ইসলামের বাড়ি। তাঁর বয়স ৬৫। তিনি ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। স্ত্রীর কিডনি চিকিৎসায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু স্ত্রীকে বাঁচাতে পারেননি। এখন ঠাঁই হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এখানকার খাবারদাবারের মান খুব ভালো। আমি এখন আর একা নেই। আমার সঙ্গে আমার অন্য ভাইয়েরাও আছেন।’

যশোরের চেনা মুখ হারুন-অর রশিদ। তিনি সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে থাকতেন। দীর্ঘদিন প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে বিয়েবিচ্ছেদ হয়ে গেছে। দুই ছেলে-মেয়ে ঢাকায় থাকে। হারুনের বাড়ি যশোর শহরের শংকরপুরে। কিন্তু তাঁর নিজের মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই নেই। বৃদ্ধাশ্রমকে ভালোবেসে এখানেই নিজের ঠিকানা করে নিয়েছেন।

৭৩ বছর বয়সী মো. আলাউদ্দিন ব্যবসা করতেন। বাড়ি যশোর শহরের শংকরপুরে। তাঁর এক মেয়ে ও দুই ছেলে। স্ত্রী রোগগ্রস্ত। তিনি মেয়ের বাড়ি থাকেন। আলাউদ্দিনের ভাত-কাপড়ের অভাব দেখা দিলে এই বৃদ্ধাশ্রমে এসে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘এখানে টিভি দেখছি। তিন বেলা ভালো-মন্দ খাচ্ছি। এখন আমার আর কোনো কষ্ট নেই।’ এই বৃদ্ধাশ্রমে আরো বসবাস করছেন শাজাহান। বয়স তাঁর ৬২। একসময় ট্রাক চালাতেন। এখন ভাতের অভাব, থাকার জায়গারও। এ কারণে এই বৃদ্ধাশ্রমে এসে বাঁচার ঠিকানা খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি বলেন, ‘এখানেই বেশ আছি।’ বই ব্যবসায়ী হাতেম আলী। দোকানটি তাঁর হাতছাড়া হয়ে  গেছে। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে চাকরি করেন। ছোট ছেলে ব্যবসা করেন। হাতেম আলী বলেন, ‘দুনিয়া বড় কঠিন। এখানে আছি এর জন্য কোনো দুঃখ নেই।’

 

একজন জাকারিয়া

যশোর শহরের খড়কি এলাকায় বাড়ি এ এ এম জাকারিয়ার। বাবা অ্যাডভোকেট কেনায়েত আলী নামকরা উকিল ছিলেন। ছাত্রজীবনে জাকারিয়া প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তখন থেকেই মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় এগিয়ে আসতেন। এরপর ব্যাংকে চাকরি নেন। দীর্ঘদিন ব্যাংকের চাকরি শেষে ২০১৪ সালে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে অবসর নেন। কিন্তু তার আগেই বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। গড়ে তোলেন মা-বাবার নামে একটি ট্রাস্ট। এই ট্রাস্টে তিনি ২৫ বিঘা জমি দিয়েছেন। পৈতৃক নিবাস বাঘারপাড়া উপজেলার আজমেহেরপুর গ্রামে ১০০ শিক্ষার্থীর একটি এতিমখানা ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা কোরআনে হাফেজ হন। চালু করেন ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিক। অসুস্থ রোগীদের নিজ খরচে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখান, ওষুধও দেন। তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা। তিনি প্রতি মাসে ৮০ জন শিক্ষার্থীকে লক্ষাধিক টাকা শিক্ষাবৃত্তি দেন।

প্রচারবিমুখ জাকারিয়া বলেন, ‘মানুষের খুব বেশি টাকার প্রয়োজন হয় না। সেবামূলক কর্মকাণ্ডে টাকা খরচ করলে সে টাকা শেষও হয় না। আমি জনকল্যাণকর কাজ করে খুব আনন্দ পাই। জাকারিয়ার স্ত্রী হোসনেআরা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী সব সময়ই মানুষের কল্যাণে কাজ করেন। আমি তাঁকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর সেবামূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করি।’

ছবি : লেখক

 

বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের সঙ্গে জাকারিয়া (ডান থেকে তৃতীয়)


 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা