kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

প্রকৃতি সুন্দর

মেঘলা চিতাটা মরে গেছে

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাঙ্গু-মাতামুহুরী রিজার্ভে স্থানীয়দের শিকার করা একটা মেঘলা চিতার ছবি দেখে মনটা কেঁদে উঠল। ভাবলেন, ওটা যদি বেঁচে থাকত, তাহলে দিব্যি ঘুরে বেড়াত বান্দরবানের বন-পাহাড়ে। তারপর মেঘলা চিতার বৃত্তান্ত লিখতে বসেছিলেন ইশতিয়াক হাসান

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মেঘলা চিতাটা মরে গেছে

বান্দরবানের থানচি-আলীকদম এলাকায় সাঙ্গু-মাতামুহুরী বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অনেক বন্য প্রাণীর আড্ডাখানা এই গভীর বনাঞ্চল। শোনা যায়, কখনো কখনো নাকি বাঘও দেখা যায়। বাঘের খোঁজে কয়েক বছর গিয়েও ছিলাম। তবে বেশি গভীরে ঢোকা সম্ভব হয়নি কখনোই। বনের খোঁজখবর অবশ্য রাখি নিয়মিতই। দিনকয়েক আগে ফেসবুকে হঠাৎ শাহরিয়ার সিজার রহমানের একটি পোস্ট দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বেশ নাদুসনুদুস একটা মেঘলা চিতা মারা পড়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিকারিদের হাতে। ওখানে শাহরিয়ার ভাইদের সংগঠন সিসিএর (ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স) কিছু প্যারাবায়োলজিস্ট কাজ করেন। প্রশিক্ষিত স্থানীয় অধিবাসীদের বলে প্যারাবায়োলজিস্ট। দুর্গম এলাকায় তাঁরা বন্য প্রাণী সংরক্ষণে কাজ করেন। বন্য প্রাণী সম্পর্কে তাঁদের কাছ থেকে নানা তথ্যও পাওয়া যায়। শিকার হওয়া মেঘলা চিতার ছবিটিও ওই প্যারাবায়োলজিস্টদের একজনের সংগ্রহ করা।

 

মেঘলা চিতা যেমন

মেঘলা চিতা বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর প্রাণীগুলোর একটি। প্রাণীটির গায়ের রং ধূসর থেকে মেটে বাদামি। শরীরে মেঘের মতো ছোপ ছোপ। তাই নাম মেঘলা চিতা বা মেঘা বাঘ। ইংরেজিতে ক্লাউডেড ল্যাপার্ড। লামচিতা বা গেছো বাঘ নামেও চেনে কেউ কেউ। একেকটার ওজন ১৮-২০ কেজি। লম্বায় তিন ফুট বা তার বেশি হয়। লেজ প্রায় শরীরের সমান। গাছে চলাফেরা করার সময় লেজটি শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে। মেঘলা চিতারা বৃক্ষচর। গাছে গাছে কাটে বেশির ভাগ সময়। গাছে থাকার কারণে বিড়াল গোত্রের অন্য প্রাণীর মতো এদের পায়ের পাতা নরম নয়। বানর এদের প্রিয় শিকার। কখনো গাছে ওত পেতে থেকে নিচ দিয়ে যাওয়া হরিণ বা অন্য কোনো বন্য প্রাণীর ওপর লাফিয়ে পড়েও শিকার করে। খরগোশ, শজারু, পাখিসহ নানা ধরনের ছোট বন্য প্রাণী খাওয়ায়ও আপত্তি নেই। গাছ থেকে নামার সময় মাথা নিচের দিকে দিয়ে নামে।

 

কিছু আগের কিছু খবর

একসময় প্রাণিবিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে বুঝি মেঘলা চিতা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তারপরই এদের বেশ কয়েকটিকে বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়। ১৯৯২ সালে চট্টগ্রামের চন্দনাইশে দুটি লামচিতার বাচ্চা ধরা পড়ে। ২০০৫ সালে পাওয়া যায় ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ে। আবার ২০০৯ সালে রাঙামাটির বরকলের কাছে দুটি বাচ্চা নিয়ে একটি মা লামচিতা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। স্থানীয়রা তাড়া করলে একটি বাচ্চা নিয়ে মাটি পালাতে পারলেও অপর বাচ্চাটি ধরা পড়ে। যত দূর জানি পরে ওই বাচ্চাটিকে আবার বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। রাঙামাটির সাজেক এলাকায়ও লামচিতা ধরা পড়ার খবর শুনেছিলাম। অবশ্য সাজেকের পাশেই ভারতের ডামপা রিজার্ভ মেঘলা চিতার জন্য রীতিমতো বিখ্যাত। কাজেই সাজেকের আশপাশে এরা বেশ ভালো সংখ্যায়ই থাকতে পারে। আরেকটা ঘটনা বলি। মাহফুজ মামা বন বিভাগে চাকরি করেন। কাপ্তাইয়ে পোস্টিং ছিল তাঁর। সে সূত্রে কাপ্তাইয়ের রাম পাহাড় ও সীতা পাহাড় এলাকা এবং কাপ্তাইমুখ রিজার্ভে গিয়েছি বেশ কয়েকবার। তখন মামার কাছ থেকে শুনি এখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা লতাবাঘ নামে এক ধরনের বাঘের কথা বলে। গাছ বাওয়ায় ওরা খুব দক্ষ। বুঝতে কষ্ট হয় না ওটা মেঘলা চিতা। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান কাপ্তাইয়ে ক্যামেরা ট্র্যাপ বসালে সেখানে মেঘলা চিতার ছবি পাওয়া যায়। তিনিও জানান, লতাবাঘ আসলে মেঘলা চিতাই। এদিকে সাঙ্গু রিজার্ভে সিসিএর ক্যামেরা ট্র্যাপেও সাম্প্রতিক সময়ে ধরা পড়েছে এদের ছবি।

 

যেখানে যেখানে আছে

সাঙ্গু-মাতামুহুরী আর কাপ্তাই ছাড়াও পার্বত চট্টগ্রামের পাবলাখালীসহ অনেক বনে, কক্সবাজারের টেকনাফ গেম রিজার্ভসহ চট্টগ্রামের কোনো কোনো বনে, বৃহত্তর সিলেটের লাঠিটিলা, রেমা-কালেঙ্গা, সাতছড়ি, লাউয়াছড়া, এমনকি ময়মনসিংহের গারো পাহাড় এলাকার খণ্ড বনগুলোতে লামচিতার দেখা পেতে পারেন। বাংলাদেশ ছাড়া আছে ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে। সম্প্রতি এশিয়ার সুমাত্রা ও বোর্নিও দ্বীপের মেঘলা চিতা বা ক্লাউডেড ল্যাপার্ডদের একটু ভিন্ন ধরনের একটি প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন প্রাণিবিজ্ঞানীরা।

 

উড জানিয়ে গেছেন

একসময় সিলেট অঞ্চলে এরা যে প্রচুর ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিছুদিন আগে সেবা প্রকাশনীর জন্য কর্নেল এইচ এস উডের কয়েকটি কাহিনি অনুবাদ করছিলাম। ভদ্রলোক ছিলেন চিকিৎসক। আসাম, বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) ও সিলেটে ছিল পোস্টিং। সিভিল সার্জনও ছিলেন। শিকারের শখের কারণে বন্য প্রাণীর পেছনে ছুটেছেন নাওয়া-খাওয়া ফেলে। তাঁর বইয়ে সিলেটে অনেক ক্লাউডেড ল্যাপার্ড থাকার কথা বলা হয়েছে। ওই সময় নাকি স্থানীয় অধিবাসীদের হাতে ধরাও পড়ত মাঝেমধ্যে। নিজেও সিলেটের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন। এক লোক সাইকেল চালিয়ে আসার পথে দুটি মেঘলা চিতার বাচ্চা দেখে একটাকে নিয়ে সাইকেলে উঠে চম্পট দেয়। এ ছাড়া এক জমিদারের ছেলের কথা বলেছিলেন, যে গন্ধগোকুলের বাচ্চা মনে করে লামচিতার বাচ্চা পুষছিল। তিনি বলেছিলেন, আসামের লোকেরা নাকি একে বান্দর বাঘও বলে। উড বেশ কিছু বানরকে দলেবলে পাথরের চাতালে রাত কাটাতে দেখেছিলেন। মেঘলা চিতার ভয়েই এদের এই অবস্থা বলে তাঁর মনে হয়েছিল। তাঁর অভিজ্ঞতাগুলো কিন্তু আজ থেকে ১০০ বছর আগের।

 

বেঁচে থাকো

আমার ধারণা, বাংলাদেশের বনগুলোতে এখন চিতা বাঘের চেয়ে মেঘলা চিতাই বেশি আছে। গাছে গাছে থাকাই এদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। চিতা বাঘের গ্রামের আশপাশে আসার একটা প্রবণতা আছে। যখনই এসেছে মানুষ পিটিয়ে নির্বংশ করেছে। সাঙ্গু-মাতামুহুরীর অরণ্যে হয়তো এখনো মোটামুটি ভালো সংখ্যায়ই আছে লামচিতারা। ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়া কিংবা শিকার হওয়া তা-ই প্রমাণ করে। কিন্তু শুরুতে যে মেঘলা চিতার কথা বলেছি, ওটার মতো যদি কপাল হয়, একটার পর একটা মাংস বা চামড়ার জন্য শিকার হতে থাকে, তবে এরা কয় দিন টিকে থাকবে বলা মুশকিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা