kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আরো জীবন

বেণু কর্মকার

ভর দুপুরে গাড়ি করে হাসিমপুর বাজারে নামলেন রায়হান রাশেদ। বাজার তখন বলতে গেলে খালি। বেণু কর্মকারকে খুঁজে পেতে সময় লাগল না বেশি। দোকানের সামনে রোদে কয়লা শুকাচ্ছিলেন

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বেণু কর্মকার

দোকানের মাঝখানে হাপর বসানো। আশপাশে তৈরি দা, বঁটি, কোদাল, পাখির খাঁচা, শিকল ইত্যাদি ছড়ানো। বেণুভূষণ কর্মকারের বাবার নাম জগত্বন্ধু কর্মকার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তালশহরে গ্রামের বাড়ি। ৩০ বছর ধরে নরসিংদী রায়পুরার হাসিমপুরে আছেন। ঘর করেছেন শ্বশুরের ভিটায়। বাজারের বরইগাছের নিচে তাঁর দোকান। দোকানেই সারা দিন কাটে। সকাল ৮টায় দোকান খোলেন। রাত ৯টায় ফেরেন বাড়ি। কখনো দুপুরে খেয়ে আসেন বাসা থেকে।

১০ বছর বয়সে মাকে হারান। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন কোনো রকমে। বাড়ির সামনে বড় ভাইয়ের দা-বঁটি তৈরির দোকান ছিল। একা সামলাতে পারতেন না। বেণুকে সহযোগী করেছিলেন।  কিছুদিন পর এক আত্মীয়ের পরামর্শে স্বর্ণকারের দোকানে গিয়ে কাজে লাগলেন। তারপর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের দিন বাবাও মারা গেলেন। সে সময় বিদেশ যাওয়ার কথা ভেবে এক লোকের কাছে টাকা জমা দিলেন। বিদেশ যাওয়া তো হলোই না, টাকাও ফেরত পাননি। এই ধাক্কা সামলাতে বেগ পেতে হলো। আবার এসে লাগলেন পৈতৃক পেশায়। বড় ভাইয়ের সঙ্গে হাপর টানতে থাকলেন।

 

বিয়ে করলেন 

রায়পুরার হাসিমপুরে বিয়ে করলেন বেণু। বড় শ্যালক বললেন, ‘বাড়িতে তো সুবিধা করতে পারছেন না। আমাদের এখানে চলে আসুন। ঘর করে দিই।’ আজ থেকে ৩০ বছর আগের কথা। বেণু শ্বশুরবাড়ির কাছে এসে ঘর বাঁধলেন। কাজ করতে থাকেন বড় শ্যালকের সঙ্গে। তৈরি করা দা, বঁটি, কোদাল ইত্যাদি বিক্রি করেন। কোনো রকম সংসার চলছে। এক কন্যা সন্তান হলো।

হাসিমপুর বাজারের পুবদিকে একটা বরইগাছের ধারে জায়গা খালি ছিল। জমির মালিকের কাছ থেকে ভিটা ভাড়া নিয়ে সেখানে একটি শণের ঘর তুললেন বেণু কর্মকার।  শুরু করলেন দা, বঁটি, লোহা তৈরির কাজ। একজন কর্মচারী নিলেন। মানুষ আসতে শুরু করল। দোকান জমেও উঠল। পাশে বসল একটা চা দোকান। তারপর আরো অনেক দোকান হলো। তবে হাপর টেনে সংসার ভালো চলে না। অভাব লেগেই থাকে। একপর্যায়ে কর্মচারীও বাদ দিলেন। কিছু টাকা ধার নিলেন এক জায়গা থেকে। সে টাকায় ভৈরব থেকে তৈরি কোদাল, দা, বঁটি, ঝাড়ু, পাখির খাঁচা কিনে আনতে লাগলেন। ১০-২০ টাকা লাভ হলেই বিক্রি করে দেন। দা, বঁটি মেরামত বাবদ পান ৩০ থেকে ৭০ টাকা। তবে ভৈরব থেকে আনতে বেশ খরচ পড়ে। এর মধ্যে ঘর ভাড়াও বাড়ল। বলছিলেন, ‘সংসারের প্রয়োজন তো কম না। তেল, নুন, স্নো-পাউডার সবই লাগে। ধার থেকে আর বেরোতে পারি না।’

 

এর মধ্যে মেয়ের বিয়ে

মেয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে। লোকজন নানা কথা বলে। কিন্তু অভাবের সংসারে কিভাবে বিয়ে দেবেন? আবার ধার করলেন। সাহায্যের জন্য হাতও পাতলেন। মেয়েটার বিয়ে হলো। কিন্তু তার সংসারেও অভাব। কিছুদিন পর স্বামী-সন্তানসহ বাবার বাড়ি চলে আসে মেয়েটা। নাতনিদের পড়াশোনার খরচ জোগাড়ে নতুন করে কষ্ট শুরু করলেন বেণু। দ্বিগুণ পরিশ্রমী হলেন। তবু অভাব যায় না। বললেন, ‘কর্মকারদের অভাব শেষ হয় না। এই কাজ করে সচ্ছল হওয়া অসম্ভব।’ দা-বঁটি তৈরি কষ্টের কাজ। সারা দিন আগুনের তাপ সহ্য করতে হয়। বয়সও এখন সায় দেয় না বেণুকে। কিন্তু কাজ করে যেতেই হয়। অন্য কাজ জানেনও না। গরমের মৌসুমে কষ্ট হয় বেশি। তখন আগুনের তাপ অসহ্য লাগে। কোরবানির ঈদ আর  বৈশাখ মাসে কাজ থাকে বেশি। তখন ভালো রোজগার হয়। ‘গত ঈদে প্রায় ৩৫ হাজার টাকার কাজ করেছি। বেশি করে চাল-ডাল কিনেছি,’ বলছিলেন বেণু।

 

কোথাও যাওয়া হয় না

কোথাও বেড়াতে যেতে পারেন না। সময় হয় না। দোকান বন্ধ করতে মায়া লাগে। দোকান ছেড়ে কোথাও গিয়ে মন বসে না। মন পড়ে থাকে। ‘আমাদের যদি কেউ কম লাভে ও বেশি সময় নিয়ে ঋণ দেয়, তাহলে একটু বাঁচি। এখন লাভ যা হয়, তা কিস্তি দিতে দিতেই চলে যায়,’ বললেন বেণু কর্মকার। 

ছবি : হিমেদুল ইসলাম শাওন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা