kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আরো বাংলাদেশ

মোমেনার যুদ্ধ

অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। দুই সন্তান ছোট রেখে স্বামীও মারা যান। তার পর থেকে মোমেনা চালিয়ে যাচ্ছেন বেঁচে থাকার লড়াই। মোস্তফা খান বলছেন সে লড়াইয়ের গল্প

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মোমেনার যুদ্ধ

ফুলপুর শহর থেকে প্রতিদিন ১৫-২০ কিলোমিটার দূরের গাঁয়ের বাজারে ঘুরে ঘুরে কিনে আনেন হাঁস, মুরগি আর কবুতর। খাঁচায় করে নিয়ে আসেন শহরে, বাজারে বিক্রি করে যা লাভ হয় তা দিয়েই সংসার চালান।

বৃদ্ধ মা, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে মোমেনার সংসার। স্বামী আবুল হাশেম মারা গেছেন ১২ বছর হয়। মেয়ে হাফিজা আক্তারকে টাঙ্গাইলের সখিপুর মহিলা কলেজে অর্থনীতি পড়াচ্ছেন। হাফিজা এখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছেলে মনিরুজ্জমান তুহিন ময়মনসিংহ পলিটেকনিক কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার ছনধরা ইউনিয়নের কাশীগঞ্জ গ্রামের আয়াত আলীর ছয় মেয়ের মধ্যে চতুর্থ ছিলেন মোমেনা খাতুন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১২ বছর বয়সে বিয়ে দেন মা-বাবা। মা-বাবার এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে কষ্ট হলেও অভাবের সংসার বলে কোনো প্রতিবাদ করেননি। স্বামীর বাড়ি হালুয়াঘাট উপজেলার মৌজাখালী। স্বামী আবুল হাশেম ছিলেন বিআরডিপির চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। ভালোই চলছিল মোমেনার সংসার। হঠাৎই আবুল হাশেম জটিল রোগে আক্রান্ত হন। পুরো পরিবার তাঁর চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খেয়ে যায়। ২০০৬ সালে স্বামী মারা যান। মেয়ে হাফিজা আক্তার তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। ছেলে মনিরুজ্জমানের বয়স মাত্র দুই বছর। কিছুদিন পর বাপের বাড়িতে চলে আসেন মোমেনা। অভাব-অনটনের সংসারে বাবাই ছিলেন পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবার সঙ্গে তিনিও কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন। নিজের সন্তানদের লেখাপড়ার দিকে নজর দেন। এ ছাড়া ছোট দুই বোনকেও বিয়ে দেন। একসময় ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে চলে আসেন ফুলপুর সদরে। ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল সায়েম বাসায় কাজে যোগ দেন।

মোমেনাও অসুস্থ

হঠাৎ ধরা পড়ে মোমেনা জটিল কিডনি রোগে আক্রান্ত। আব্দুল্লাহ আল সায়েম তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করান ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলেও শরীরের ব্যথা কমছিল না। এমন পরিস্থিতিতে কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তখন নিজে কিছু করার কথা ভাবতে থাকেন। এর মধ্যে বাবা মারা যান। মা বাড়িতে একা হয়ে যান। তাই বৃদ্ধ মাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন মোমেনা। ফুলপুর সদরের জীর্ণ এক টিনশেড বাড়িতে সবাই মিলে থাকতে শুরু করেন। সেখান থেকেই নিজে নিজে একটি ব্যবসা শুরুর চিন্তা করেন। যেহেতু টাকা-পয়সার টানাটানি, তাই কম টাকায় ব্যবসা করার কথা ভাবছিলেন। হঠাৎই মনে হলো প্রত্যন্ত এলাকার বাজারগুলো থেকে হাঁস, মুরগি, কবুতর কিনে শহরের বাজারে বিক্রি করবেন। হাতে যা টাকা ছিল আর কিছু ধার করে চলে গেলেন নারায়ণখোলা, শাকুয়াই, ভাইটকান্দিসহ দূর-দূরান্তের বাজারে। বাজারে ঘুরে ঘুরে কেনেন হাঁস, মুরগি ও কবুতর। এতে বেশ ভালো লাভ হতে থাকে।  প্রথম দিকে অল্প অল্প করে কিনতেন। এখন প্রায় ১০০-২০০ হাঁস, মুরগি ও কবুতর কিনে আনেন একেকবার। পৌর শহর থেকে প্রায় ১৫-২০ কিলোমিটার দূর-দূরান্তের এসব বাজারে কখনো অটোরিকশা, কখনো হেঁটে যেতে হয় মোমেনাকে। বলছিলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে অনেক কষ্ট হয়। তবু নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভেবে কষ্টকে কষ্ট ভাবি না।’ মোমেনা ভাবেন, শিক্ষা ছাড়া এখনকার সমাজে কোনো গুরুত্ব নেই। আর্থিক ও পারিবারিক সমস্যার কারণে নিজে লেখাপড়াটা করতে পারিনি। চলার পথে অনেক রকম বাধা পেয়েছি। তবে ভেঙে পড়িনি। আত্মবিশ্বাস ছিল সব সময়। একজন নারী হয়ে এ ব্যবসা করতে আমার আগে লজ্জা লাগত। তবে এখন তেমন কোনো সমস্যা হয় না।’

 

ছেলে বড় হবে

মোমেনার স্বপ্ন, ছেলে একদিন দেশসেরা ইঞ্জিনিয়ার হবে। মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে মেধাতালিকায় স্থান করে নেবে। আমার ছেলে-মেয়েদের সবাই ভালোবাসে, শত কষ্টের মধ্যে এটাই আমার সুখ। মায়ের কাজের প্রশংসা করে মেয়ে হাফিজা আক্তার বলেন, ‘মাকে যে আমরা কতটা ভালোবাসি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। মায়ের কাজকে আমরা সম্মানের সঙ্গে দেখি। কারো কাছে হাত না পেতে মায়ের কারণে আজ পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছি। বাবা মারা যাওয়ার পর বাবা হারানোর কষ্ট মা আমাদের বুঝতে দেয়নি।’

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা