kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

তালিপাম বাঁচাতে লড়ছেন তিনি

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



তালিপাম বাঁচাতে লড়ছেন তিনি

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

বিশ্বের একমাত্র তালিপামগাছটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সেই গাছও ফুল দিয়ে মারা যায় ২০১০ সালে। আশঙ্কা করা হয়েছিল, পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গাছটি। শেষে সে গাছের ফলের বীজ থেকে প্রায় ৩ শতাধিক চারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন সরকারি বাঙলা কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আখতারুজ্জামান চৌধুরী। ৪৮টি জেলায় ছড়িয়ে দিয়েছেন সেগুলো। আখতারুজ্জামানের সঙ্গে গল্প করে এসেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

 

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার তালিপাম গাছে ফুল এলে উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়। এটিকে তাঁরা তখন পৃথিবীর সর্বশেষ তালিপাম হিসেবে চিহ্নিত করেন। গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম কোরাইফা তালিয়েরা রক্সবার্গ। উল্লেখ্য, ভারতের পূর্বাঞ্চলে ১৮১৯ সালে এর হদিস পেয়েছিলেন ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী উইলিয়াম রক্সবার্গ। ১৯৯৮ সালে তালিপামকে বিশ্বের মহাবিপন্ন উদ্ভিদ বলে ঘোষণা করে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’। ১৯৫০ সালে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ গাছটি শনাক্ত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম সালার খান। আকৃতিগতভাবে এর মিল আছে তালগাছের সঙ্গে। জীবনে একবার মাত্র ফুল ও ফল দেয়। এর পরই ঘটে মৃত্যু। এখন সেই গাছ ছড়িয়ে আছে দেশের ৪৮টি জেলায়। ছড়িয়ে দিয়েছেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী। বৃক্ষপ্রেমী এই মানুষটি পেশায় কলেজ শিক্ষক। তালিপামকে করেছিলেন তাঁর পিএইচডির গবেষণার বিষয়।

 

প্রায় প্রতিদিন গাছের কাছে যেতেন

‘শুরুতে নিশ্চিত ছিলাম না তালিপামের বীজ থেকে নতুন চারা গজাবে কি না। কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম গাছটা মহাবিপন্ন এবং বিশ্বে মাত্র একটিই আছে; তখন ভাবলাম এই গাছের বীজ যদি সংগ্রহ করে রাখা যায় এবং সেগুলো থেকে সত্যি সত্যি যদি চারা গজায় তবে এটা সারা দেশে ছড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশ তো বটেই, সারা বিশ্বের জন্য এটা সম্পদ হবে। এ ভাবনা থেকেই প্রতি সপ্তাহে ওই গাছের কাছে যেতাম।’ ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা বলছিলেন আখতারুজ্জামান। তখন তিনি ১৩/সি আজিমপুরে থাকতেন। একদিন ভোরে গাছের নিচে গিয়ে দেখলেন পাঁচটার মতো বীজ পড়ে আছে মাটিতে। সেগুলো বাসায় নিয়ে গেলেন। টবে রোপণ করার মাস দুয়েকের মধ্যে বীজগুলো অঙ্কুরোদগম হলো! আখতারুজ্জামানের আনন্দ যেন আর ধরে না। নিয়ম করে প্রতিদিনই গাছের নিচে যেতেন। মাটিতে পড়ে থাকা ফলগুলো সংগ্রহ করে আনতেন। এভাবে প্রায় হাজারখানেক বীজ হলো। কয়েক শ বীজ রেখে দিলেন গবেষণার জন্য। আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমার বাসায় ২০০ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের মেডিসিনাল গার্ডেনে ৩০০-এর মতো বীজ রোপণ করলাম। এর মধ্যে প্রায় শখানেক বীজ নষ্ট হয়ে গেল। এর পর ভাবলাম, এটা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেব।

বান কি মুনও একটি গাছ লাগিয়েছেন

আখতারুজ্জামান তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে বললেন, ‘স্যার, এটা আমি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চাই।’ শিক্ষামন্ত্রীও সানন্দে রাজি হলেন। ২০১০ সালের ৩০ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে নায়েমে চারটি চারা লাগালেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। ২০১১ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোরে গিয়েছিলেন। যশোর শিক্ষা বোর্ড ক্যান্টনমেন্ট স্কুল প্রাঙ্গণে তিনি একটি তালিপামের চারা রোপণ করলেন। গাছটা এখন বেশ বড় হয়েছে। একই মাসে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশ সফরে এসে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় একটি কমিউনিটি ক্লিনিক উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি সেখানে একটি চারা লাগালেন। আখতারুজ্জামান বললেন, ‘এরপর ব্যাপক আকারে কাজটা শুরু করলাম। যেহেতু গাছটা পৃথিবীর আর কোথাও সেভাবে নেই, তাই আমি এটা ছড়িয়ে দিতে চাইলাম। ভাবলাম, দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারলে শতবর্ষ পরে ব্যাপক আকারে এটার ফুল-ফল পাওয়া যাবে, গবেষকদের অনেক কাজে আসবে।’

 

৪৮ জেলায় ৩০০ তালিপাম

এখন এশিয়াটিক সোসাইটির প্রবেশপথে হাতের ডানে দুটি তালিপামগাছ দেখতে পাবেন। দেয়াল ছাড়িয়ে ওঠা ভিন্ন ধরনের গাছ দুটি রাস্তা থেকে নজর কাড়ে। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের ভেতরে গেলেও দেখতে পারবেন সারিবদ্ধভাবে বেড়ে উঠছে চারটি তালিপাম। এগুলো আখতারুজ্জামানের হাতে লাগানো। শুধু এশিয়াটিক সোসাইটি কিংবা বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন নয়, বঙ্গভবন, গণভবন, বাংলা একাডেমি, ইডেন কলেজ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বলধা গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজসহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় গোটা পঞ্চাশেক তালিপাম লাগিয়েছেন তিনি। আখতারুজ্জামান বললেন, ‘এ পর্যন্ত ঢাকাসহ ৪৮ জেলায় ৩০০-এর মতো তালিপাম লাগিয়েছি। এর মধ্যে প্রায় আড়াই শ গাছ বেঁচে আছে।

জিন ব্যাংকে ১০০ বীজ

পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের জিন ব্যাংকে তালিপামের ১০০ বীজ রাখা আছে বলে জানালেন আখতারুজ্জামান। তিনি বললেন, ‘পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের জিন ব্যাংকের সামনে দুটি গাছ লাগাতে গেলাম। ওখানকার মহাপরিচালক বললেন, ‘এই গাছের বীজ তো অফুরন্ত না। আপনি যদি আমাদের এখানে কিছু বীজ রাখেন, তাহলে ৫০ বছর পরও চাইলে এগুলো থেকে চারা তৈরি করতে পারবেন।’ তখন মনে হলো, ৬৪ জেলায় চারা লাগানো হলেও নানা কারণে কিছু চারা নষ্ট হতে পারে। তাই ১০০ বীজ এখানে রাখা গেলে মন্দ হবে না। যেখানে থাকবে না, এখান থেকে নিয়ে লাগানো যাবে। এটা ২০১১ সালের ঘটনা।

 

অনেক কষ্ট জমা আছে

তালিপামের চারা নিয়ে জেলায় জেলায় ঘুরেছেন আখতারুজ্জামান। এই অভিযানে ঝুলিতে জমা হয়েছে নানা অম্লমধুর স্মৃতি। যেমন—তিনি যে কলেজে পড়েছেন ঝিনাইদহের সেই কেসি কলেজে ৬টি চারা লাগিয়েছিলেন ২০১১ সালে। কয়েক মাস পরে কলেজে নতুন অধ্যক্ষ এলেন। তিনি দুটি তালিপাম কেটে ফেলে কাঁঠালগাছের চারা লাগালেন! একদিন হঠাৎ করে আবার সেই কলেজে গেলেন আখতারুজ্জামান। তালিপামের চারটি চারা দেখতে না পেয়ে মন খারাপ হয়ে গেল তাঁর। এক কর্মচারীর কাছে জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার, বাকি গাছগুলো কই?

—প্রিন্সিপাল স্যার কেটে ফেলতে বলেছেন।

—কেন?

—স্যার বললেন, এসব গাছে ফলটল ধরে না। এগুলো দিয়ে কী হবে!

প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটেছে মেহেরপুরে। সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণে লাগানো একটা চারা বেশ বড় হয়েছিল। ফুলের বাগান করার জন্য চারাটি কেটে ফেলা হয়েছিল! এ রকম বেশ কয়েকটি গাছ কাটা পড়েছে বিভিন্ন জায়গায়।

 

আখতারুজ্জামান বলে চলেন

তালিপাম তালগাছের মতো এমনিতেই বেড়ে ওঠে। সেভাবে কোনো যত্নের প্রয়োজন হয় না। শুধু কেউ যেন কেটে না ফেলে সেদিকটায় নজর দিতে হয়। এই জার্নিটা খুব কষ্টের ছিল। কোনো তহবিল ছিল না। নিজে নিজে যেটুকু পেরেছি, করেছি। প্রতি মাসে বেতনের ২০ শতাংশ টাকা আলাদা করে রাখতাম এ কাজের জন্য। বিভিন্ন জেলায় বাজারের ব্যাগে ভরে চারাগুলো নিয়ে যেতাম। একবার সাতক্ষীরায় গাছ লাগানো শেষে খুলনার দিকে ফিরছিলাম ভ্যানে চড়ে। কাঁচা রাস্তা। দুই-তিন কিলোমিটার যাওয়ার পর বাসস্টেশন। একপর্যায়ে চারাসহ ভ্যান উল্টে রাস্তার পাশে খাদে পড়লাম! পরে পানি থেকে তুলে সেই চারাগুলো নিয়ে আবার রওনা দিলাম। বিএল কলেজে দুটি, খুলনা সার্কিট হাউসে একটি লাগিয়েছিলাম। ভালো খবর হলো, গাছগুলো এখনো বেঁচে আছে। এ কাজ করতে গিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশিসহ (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর) সরকারের নানা দপ্তরের সহযোগিতা পেয়েছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করতে যাতে সুবিধা হয়, সে জন্য মাউশি থেকে আমার নামে একটা জিও (গভর্নমেন্ট অর্ডার) করে দেওয়া হয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রীও খুশি হয়েছিলেন

যশোরে তালিপামের চারা রোপণের কিছুদিন পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সেমিনার করেছিলেন আখতারুজ্জামান। ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আমার শ্রদ্ধেয় কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ছিল। তাদের মধ্যে তৎকালীন সিনিয়র সচিব সুরাইয়া বেগম,  কবির বিন আনোয়ার (মহাপরিচালক, প্রশাসন), শেখ ইউসুফ হারুন (মহাপরিচালক) ও  ড. দেওয়ান হুমায়ূন কবির (পরিচালক, প্রশাসন) অন্যতম। কবির বিন আনোয়ার স্যার একদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে দেশের বিপন্ন উদ্ভিদ নিয়ে আলোচনা করতে বললেন। পাওয়ার পয়েন্টে আমাদের দেশে যে ছয় হাজার প্রজাতির গাছগাছালি আছে সেখান থেকে বেশ কিছু বিপন্ন প্রজাতির গাছাগাছালি দেখালাম। ওই সেমিনারের পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কিছু দুর্লভ বৃক্ষ রোপণের প্রস্তাব করলে উপস্থিত কর্মকর্তারা স্বাগত জানালেন। তখন একটা মাস্টারপ্ল্যান করলেন আখতারুজ্জামান। সে অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তালিপামসহ প্রায় ৬০ প্রজাতির বিরল গাছ লাগিয়েছেন। এর মধ্যে আকাশনিম আর রুদ্রপলাশ—এ দুটি গাছ প্রধানমন্ত্রী নিজেই রোপণ করেছেন ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই। গাছ লাগানোর এক ফাঁকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয় আখতারুজ্জামানের। দেশে অনেক উদ্ভিদ বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে জেনে তিনি আমাকে বললেন, একসময় বড় বড় তেঁতুলগাছ দেখতাম, এখন আর তেমন দেখা যায় না। আখতারুজ্জামান তখন বললেন, স্যার, এখানে অনেক দুর্লভ প্রজাতির গাছ আছে। এসব গাছাগাছালি নিয়ে একটা বই লিখলে ভালো হয়। শুনে প্রধানমন্ত্রী খুশি হলেন। বললেন, ‘গণভবনেও অনেক ভালো গাছ আছে। সেগুলো নিয়ে দুটি বই একসঙ্গে লেখা যায়।’ এখন দুটি বইয়ের কাজ চলছে বলে জানালেন এই গবেষক।

 

তিনি চান

৬৪ জেলায় তালিপামসহ বিপন্ন উদ্ভিদের বাগান করতে চান আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় গাছ নিয়ে যেতে সমস্যায় পড়ি। বাজারের ব্যাগে করে নিতে হয়। অনেক সময় বাসওয়ালারা নিতে চায় না। গাছগুলোরও ক্ষতি হয়। এ জন্য একটা মাইক্রোবাস থাকলে সুবিধা হতো। ভবিষ্যতে বায়োডাইভারসিটি রিসার্চ অ্যান্ড কনজারভেশন সেন্টারও (বিআরসিসি) স্থাপন করতে চান তিনি।

 

একজন আখতারুজ্জামান

জন্ম ঝিনাইদহে ১৯৬৩ সালে। ঝিনাইদহের স্থানীয় স্কুল-কলেজে লেখাপড়া শেষে ১৯৮১-৮২ সেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে ভর্তি হন। ১৯৯০ সালে রসায়নের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ইউনেসকোর অর্থায়নে প্রতিটি জেলায় দুটি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিপন্ন উদ্ভিদ লাগিয়েছেন। ‘বাংলাদেশের বিপন্ন উদ্ভিদ’ নামে একটি বইও লিখেছেন। ব্যক্তিজীবনে দুই সন্তানের জনক। তাঁর স্ত্রী ডা. শারমিন সুলতানা সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিসক।

ছবি: সংগ্রহ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা