kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আরো জীবন

গাছুড়ে

নারকেলগাছে উঠতে তিন মিনিট আর তালগাছে উঠতে পাঁচ মিনিট লাগে। তাঁর মতো দক্ষ গাছুড়ে দশ গাঁয়ে নেই। ৩০ বছরের গাছুড়ে জীবনে এক লাখেরও বেশি নারকেলগাছে চড়েছেন। ফখরে আলম বলছেন জিয়ার কথা

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গাছুড়ে

বিষপিঁপড়া, বল্লা, চেলা, সাপ কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারে না। একটা মোটা হাফপ্যান্ট পরে তরতর করে উঠে পড়েন গাছের মাথায়। গাছ পরিষ্কার করে ডাব-নারকেল নিয়ে নেমে আসেন। বিষপিঁপড়া যে তাঁকে কামড়ায়নি তা নয়; তবে ব্যথা কমানোর ওষুধ তাঁর জানা। একটা গাছের শিকড় খেয়ে ব্যথা কমান। শিকড়টি তিনি নিজেই খুঁজে বের করেছেন।

 

জিয়ার কাছে ফোন আসে

ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙে পড়লে বা ডাব-নারকেল পাড়ার দরকার হলে জিয়ার কাছে ফোন আসে। তিনি এক গাছা দড়ি, ধারালো দা আর বালিধারা (দা ধার করার কাঠ) নিয়ে সাইকেল চালিয়ে গৃহস্থ বাড়ির উঠানে হাজির হন। গাছে উঠে নামিয়ে নিয়ে আসেন ডাব-নারকেল।

সাড়াপোল, রূপদিয়া, চাঁচড়া, নারায়ণপুর, তপস্বীডাঙ্গা, বেড়বাড়িসহ যশোর শহরেরও অনেকেই চেনে গাছুড়ে জিয়াকে।

 

নাম পেলেন যেভাবে

১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ভাতুড়িয়া গ্রামের পাশে নারায়ণপুরে খাল কাটতে আসেন। আজও সেই খালকে লোকে জিয়ার খাল নামেই ডাকে। খাল কাটা শেষে জিয়াউর রহমান ভাতুড়িয়া স্কুল মাঠে এক সমাবেশে বক্তব্য দেন। মহিরন খাতুন দুই বছরের ছেলেকে কোলে নিয়ে স্কুল মাঠে ছুটে যান। ক্যাপ মাথায় দেওয়া প্রেসিডেন্ট জিয়াকে দেখে তিনি কোলের ছেলের নাম রাখেন জিয়াউর রহমান। জিয়ার বাবা জালাল উদ্দিন দরিদ্র কৃষক। পাঁচ সন্তানের মধ্যে জিয়া তৃতীয়। জালাল উদ্দিন ছেলের নাম প্রেসিডেন্টের নামে রাখায় বেশ খুশিই হন।

 

জিয়া স্কুল পালিয়েছিলেন

ছয়-সাত বছর বয়সে জিয়াকে ভাতুড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছিল। জিয়া একা একাই স্কুলে যান-আসেন। একদিন পড়া পারেননি বলে স্কুলের এক শিক্ষক তাঁকে বেত দিয়ে মারেন। হঠাৎ জিয়া শিক্ষকের বেত কেড়ে নিয়ে দৌড়ে পালান। তিনজন স্যার জিয়ার পিছু নেন। জিয়া দৌড়ে বাড়ি গিয়ে ছাগলের ঘরে আশ্রয় নেন। স্যারেরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাঁকে পাননি। ঘণ্টাখানেক পর বেরিয়ে আসেন জিয়া। তারপর আর কোনো দিন স্কুলে যাননি। এক প্রতিবেশীর বাড়িতে কাজ পান জিয়া। পাঁচটি ছাগলের জন্য ঘাস কেটে আনাই তাঁর কাজ। এরপর একদিন মায়ের সঙ্গে চাঁচড়া দারোগাবাড়িতে যান। সে বাড়িতে একজন গাছুড়ে নারকেলগাছ পরিষ্কার করছিলেন। জিয়া মায়ের সঙ্গে গাছের পাতা গুছিয়ে দেন। আর গাছুড়েকে বলেন, ‘আমাকে গাছে ওঠা শিখিয়ে দাও।’ সেখানেই জিয়ার নারকেলগাছে ওঠার হাতেখড়ি। তখন একটা গাছে ওঠা আর গাছ পরিষ্কার করার পারিশ্রমিক ছিল পাঁচ টাকা। এখন ৫০ টাকা অথবা চারটি নারকেল।

 

জিয়ার কষ্ট

অনেক গাছে বিষপিঁপড়া আর বল্লার চাক থাকে। দলে-বলে আক্রমণ করে জিয়াকে। কামড়ে ফুলিয়ে দেয়। তবে সব সময় তাঁর কাছে ব্যথা কমানোর শিকড় থাকে। জঙ্গল বা কবরস্থান থেকে এই শিকড় সংগ্রহ করেন জিয়া। গাছ থেকে নেমে শিকড় খেলেই সব বিষ পানি হয়ে যায়। একবার কাকের আক্রমণও সামলেছেন। লাল দীঘিরপাড়ের এক বাড়ির নারকেলগাছে উঠেছিলেন। ওই গাছে কাকের বাসা ছিল। হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে কাক এসে তাঁকে আক্রমণ করে। দা দিয়ে শেষে নিজেকে রক্ষা করেছিলেন।

নারায়ণপুর গ্রামের মুজিবর রহমান ও ভাতুড়িয়া দাঁড়িপাড়া গ্রামের মশিয়ার রহমান বললেন, ‘বছরে একবার ডাব-নারকেল পাড়া আর গাছ পরিষ্কারের জন্য জিয়াকে ডাকি। জিয়া সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেন। আমরা খুশি হয়ে দুপুরে তাঁকে খাওয়াই। এক গামলা ভাত, সঙ্গে মাছ-মাংস থাকে।’ আধা কেজি চালের ভাত আর আধ কেজি মুরগির গোশত জিয়ার কাছে মামুলি ব্যাপার। জিয়া বললেন, ‘এক কেজি চালের ভাতও খেতে পারি। তবে লজ্জায় খাই না। সকালে হোটেলে ১০টা পরোটা কিংবা ১৫টা শিঙাড়া খাই। তারপর গাছে উঠি।’

 

জিয়ার পরিবার

স্ত্রীর নাম লিচি বেগম। দুই ছেলে। পঞ্চম আর অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। জিয়া বললেন, ‘নিজে লেখাপড়া শিখতে পারিনি, তার জন্য খুব কষ্ট হয়। ছেলেদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য সব কষ্ট স্বীকার করব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা