kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুখবর বাংলাদেশ

খায়রুল বাশারের আরেক যুদ্ধ

দেশ স্বাধীন করে বাড়ি ফেরার পর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাশার খান ওরফে বাচ্চু যোগ দেন বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপিতে। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি ইউনিয়নের খোদ্দ মেগচামি গ্রামে তাঁর বাড়ি। অবসর গ্রহণ করার পর এখন তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন আরেক যুদ্ধ। লিখেছেন জাহাঙ্গীর হোসেন

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খায়রুল বাশারের আরেক যুদ্ধ

খায়রুল বাশার খান ওরফে বাচ্চু

কদবানুর কথা

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা সদরের পাইককান্দি গ্রামের মৃত সাঈদ সেখের স্ত্রী কদবানু। বয়স ৬০। তাঁর দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। কদবানু বলেন, ভ্যানচালক ছেলে লিটন শেখ, লিটনের স্ত্রী ফিরোজা বেগম ও তাদের সন্তানদের নিয়ে কোনো রকমে চলছিল তাঁর সংসার। দুই বছর আগে হঠাৎ করেই দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে। স্থানীয় চিকিৎসকদের কাছে থেকে চিকিৎসাসেবা নিলেও কাজের কাজ হয়নি তেমন কিছুই। ফলে ক্রমেই কমতে থাকে জ্যোতি। একরকম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। তাঁর এই অবস্থার কথা জানতে পেরে হঠাৎ এক দিন তাঁর বাড়িতে হাজির হন বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাশার। তাঁকে নিয়ে যান পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর জেলার মধুখালীর মালেকা চক্ষু হাসপাতালে। ওই হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মাহবুব আল করিম ছিলেন ঢাকা লায়ন্স চক্ষু হাসপাতাল ও সৌদি আরবের রিয়াদ মিলিটারি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট। ডা. মাহবুব জানান, কদবানুর চোখের ছানি অপারেশন করতে হবে। আর সে জন্য কমপক্ষে আট হাজার টাকা লাগবে। কিন্তু এত টাকা কদবানু পাবেন কোথায়। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তখন খায়রুল বাশার তাঁকে সান্ত্বনা দেন। বলেন, ‘অপারেশন ও ওষুধ কেনার সব ব্যবস্থা আমি করে দেব।’ কিছুদিন পরই কদবানুর চোখের অপারেশন হয় এবং তিনি চোখের আলো ফিরে পান। এখন তিনি অন্য দশজনের মতোই চলাফেরা করছেন। করছেন সংসারের কাজকর্ম।

 

আলম শেখের স্ত্রী আছিয়া বেগম

তায়েনিপাড়া গ্রামের মৃত আলম শেখের স্ত্রী আছিয়া বেগমের বয়স ৫০। দুই মেয়ে ও দুই ছেলের সংসার। স্বামী মারা গেছেন বেশ আগে। কষ্ট করে সংসার চালান। চোখে ছানি পড়লেও অপারেশন করানোর ক্ষমতা  ছিল না। শেষে খায়রুল বাশার তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে বিনা মূল্যে অপারেশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

 

খায়রুল বাশার বলছিলেন

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর আমি বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপিতে যোগ দিই। অবসরে যাই ২০১৫ সালের প্রথম দিকে। এর কিছুদিন পর চোখের সমস্যায় ভুগতে থাকা আমার সহধর্মিণী খুরশিদা বেগমকে নিয়ে যাই ফরিদপুর জেলার মধুখালীর মালেকা চক্ষু হাসপাতালে। সেখানে সহধর্মিণীকে ডাক্তার দেখানোর পর হঠাৎ করেই নজরে পড়ে বয়স্ক দুজন নারী বারান্দার এক পাশে বসে কান্নাকাটি করছেন। অর্থের অভাবে তাঁরা চোখের ছানি অপারেশন করাতে পারছেন না। বিষয়টি আমাকে নাড়া দেয়। বাড়িতে এসে ভাবি, যেহেতু আমার সংগতি আছে, তাই ছানি পড়া হতদরিদ্র মানুষদের জন্য কাজ করব। এরপর ২০১৫ সালে প্রথম কমলা বেগম নামের এক বৃদ্ধার চোখের ছানি অপারেশন করাই। চোখের আলো ফিরে পাওয়ার পর তাঁকে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দেখে আমার খুব ভালো লাগে। এর পর থেকেই চোখে ছানি পড়া মানুষদের খুঁজে ফেরা আমার এক রকম অভ্যাস হয়ে গেছে। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। ছেলে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। স্ত্রী আর সন্তানরাও আমাকে উৎসাহ দেয়। উৎসাহ দেয় আত্মীয়-স্বজন আর এলাকার মানুষরাও। তাই মনে আনন্দ নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।

 

জমানো টাকা থেকেই

এখন পর্যন্ত ৩২৩ জন নারী ও পুরুষের চোখের ছানি অপারেশন করিয়েছেন খায়রুল বাশার। মূলত নিজের জমানো এবং অবসরকালে পাওয়া টাকা দিয়েই এ কাজ করে চলেছেন। বিত্তবান স্বজনদের কাছ থেকেও কিছু আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন। এখন অবশ্য বেশি সহযোগিতা পাচ্ছেন মধুখালীর মালেকা চক্ষু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। তাঁর কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ হয়ে অর্ধেক টাকা ছাড় দিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এখন খায়রুল বাশার প্রত্যেক রোগীর জন্য চার হাজার টাকা ব্যয় করছেন, সঙ্গে দিচ্ছেন ১৫ দিনের ওষুধ।

খায়রুল বাশার সততা ও কর্মদক্ষতার কারণে আনসার ও ভিডিপির পক্ষ থেকে ৩৫তম রাষ্ট্রপতি পদক পান। এ ছাড়া তিনি মহাত্মা গান্ধী স্বর্ণপদক, মাদার তেরেসা স্বর্ণপদক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্বর্ণপদক পেয়েছেন।

মালেকা চক্ষু হাসপাতালের পাবলিক রিলেশন কর্মকর্তা খান আতাউর রহমান বলেন, ‘খায়রুল বাসার ছানি পড়া দরিদ্র নারী-পুরুষদের অপারেশন করানোর জন্য আমাদের এখানে নিয়ে আসছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। তাঁর এই মহতী উদ্যোগে আমরা শরিক হতে চেয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছি।’

বালিয়াকান্দি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার কিরণ সরদার বলেন,  ‘খায়রুল বাশার বলতে গেলে সারা দিনই ছানি পড়া মানুষদের খোঁজখবর করেন ও সেবা দেন। পকেটের টাকা খরচ করে অপারেশন করান। তিনি একজন ভালো মনের মানুষ।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা