kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সৃজনশীল বাংলাদেশ

সংগ্রামীদের জন্য শংকর

শংকর ধর প্রতিমাশিল্পী হিসেবেই বেশি পরিচিত। তবে গত এক যুগ ধরে স্বাধীনতাসংগ্রামীদের স্মরণে ভাস্কর্য গড়ছেন। মোহাম্মদ আসাদ বলছেন শংকর ধরের গল্প

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



সংগ্রামীদের জন্য শংকর

১৯৫৪ সালে পুরান ঢাকার পান্নিটোলায় জন্ম শংকর ধরের। পান্নিটোলা হলো শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারের মাঝখানে একটা ছোট্ট গলি। তবে ওই জায়গাটুকুও সবাই তাঁতীবাজার বলেই চেনে। সুদূর অতীত কাল থেকেই এখানটায় বিভিন্ন পেশার মানুষের বসবাস। শংকর ধরের বাবা যেমন ছিলেন সূত্রধর। চমৎকার কাঠের কাজ করতেন। শংকর উনসত্তর সালে পড়তেন পোগোজ স্কুলে। জগন্নাথ কলেজ স্কুলের পাশেই। সেই সময় জগন্নাথ কলেজে কোনো আন্দোলন শুরু হলে পোগোজের ছাত্ররাও গিয়ে অংশ নিত। সেভাবেই বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে সক্রিয় হন শংকর ধর। মিছিলের সঙ্গে বহুবার গেছেন মধুর কেন্টিনে। মধুদার পরিবারের সঙ্গেও তাঁর ভালো সম্পর্ক হয়েছিল। সেটা আছে এখনো।

 

সেই ছোটবেলা থেকেই

শংকরের শিল্পীমনের দেখা মেলে শিশুকালেই। তখন সে সুন্দর পুতুল তৈরি করতে পারত। সেগুলো বিক্রি করত রথের মেলায়। জীবিকার তাগিদে কাজে লেগে গিয়েছিলেন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার আগেই। ১৯৭২ বা ৭৩ সালে চলাচল সংসদের বন্ধুদের অনুরোধে কালী প্রতিমা তৈরি করেন শংকর ধর। সেটাই তাঁর গড়া প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রতিমা। সেটা করে অনেক প্রশংসা পেয়েছিলেন। তারপর ১৯৭৪ সালে শাঁখারীবাজারের দুর্গাবাড়িতে দুর্গা প্রতিমা গড়ে প্রশংসিত হন। তার পর থেকে প্রতিবছরই ঢাকায় গড়তেন বেশ কয়টি দুর্গা প্রতিমা। নারায়ণগঞ্জে গিয়েও গড়তেন কিছু। ২০০০ সাল পর্যন্ত নিয়মিত প্রতিমা গড়েছেন। তারপর অসুস্থতার কারণে প্রতিমা গড়া কমিয়ে দিয়েছেন। এখন গড়েন ছোট ছোট লক্ষ্মী বা সরস্বতী প্রতিমা।

 

কিছু বিশেষ কাজ

শংকর ধর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ঢাকেশ্বরী দেবীর প্রতিমা গড়েছেন অষ্টধাতু দিয়ে। স্বামীবাগ ইসকন মন্দিরের কাঠের তৈরি কৃষ্ণগুলো তাঁর হাতে গড়া। নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে গড়েছেন গান্ধীর প্রতিকৃতি। আগা খান গোল্ডকাপ, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পদকের রেপ্লিকা গড়েছেন তিনি।

আমাদের দেশে দেবতার আসন হিসেবে কাঠের তৈরি সিংহাসনের সূচনা করেন শংকর ধর। তাঁর তৈরি সিংহাসন জনপ্রিয় বিদেশেও। সিংহাসন নিয়ে প্রদর্শনী করেছেন ঢাকেশ্বরী মন্দির ও জাতীয় জাদুঘরে। ইংল্যান্ডে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন এই কাজের জন্যই। কয়েক বছরের ভিসা পেলেও থেকেছেন মোটে ২১ দিন। ওই অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক দেবতার সিংহাসন গড়েছিলেন।

 

স্বাধীনতাসংগ্রামীদের জন্য

এক যুগ আগে থেকে শুরু করেন স্বাধীনতাসংগ্রামীদের নামে ভাস্কর্য গড়ার কাজ। প্রথম গড়েন ক্ষুদিরাম স্মরণে ভাস্কর্য। তারপর গড়েছেন সূর্যসেন ও প্রীতিলতা স্মরণে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণেও গড়েছেন ভাস্কর্য। ছয় দফা ও উনসত্তরের গণ-আন্দোলন নিয়েও কাজ করেছেন। অনেক ভাস্কর্য করেছেন একাত্তরকে কেন্দ্র করে। আর শেষ করছেন বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে। তার পুরনো বাড়িটি প্রতিমা, দেবতার সিংহাসন ও ভাস্কর্যের একটি স্টুডিও। সরু গলির ওপর এই বাড়িটির দিকে তাকালে বাইরে থেকেই দেখা যায় পর পর সাজানো অনেক দেবতার সিংহাসন। পরের ঘরটিতে আছে প্রতিমা। তার পরেরটিতে অনেক ভাস্কর্য। কিছু ভাস্কর্য রাখা আছে একটি চৌকির ওপর। শংকর ধর ৫০টিরও বেশি ভাস্কর্যের কাজ শেষ করেছেন এরই মধ্যে। বেশির ভাগই কাঠের তৈরি। কিছু আছে ধাতুর (লোহা ও ব্রোঞ্জ) তৈরি।

ভাস্কর শংকর ধর বললেন, ‘আমি ভাস্কর্যগুলো যত্ন ও ভালোবাসা দিয়ে তৈরি করেছি। আমার ধারণা, স্বর্ণ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য এখনো হয়নি। আমার করার ইচ্ছা আছে। রুপা দিয়েও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য আমিই গড়েছিলাম। স্বর্ণ দিয়ে নৌকা গড়েছি অনেক। দেশমাতৃকার জন্য যাঁরা আত্মদান করেছেন, তাঁদের সম্মান জানানো কর্তব্য বলে ভাবি। সে জন্যই তাঁদের স্মরণে ভাস্কর্য গড়ছি। বেশির ভাগেরই উচ্চতা দুই থেকে তিন ফুট।’

                                             

ছবি: লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা