kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অমূল্য ভালোবাসা

ভারতের ধরমশালায় হোমায়েদ ইসহাক মুন একটি প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন কিছুদিন। জানাচ্ছেন সে অভিজ্ঞতার কথা

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



অমূল্য ভালোবাসা

হিমাচল প্রদেশের কাংড়া জেলার পাহাড়ঘেরা শান্ত এক জায়গা ধরমশালা। এখানকার মুবারকপুরের এক সুন্দর বাড়িতে চিরু আরামেই ছিল। হঠাৎ বাড়ির মানুষজন ঠিক করল তারা আর মুবারকপুরে থাকবে না। কিন্তু যেখানে যাবে সেখানে চিরুকে নিয়ে যেতে পারবে না। তাই চিরুকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে এলো। চিরু আশ্রয়হীন হয়ে গেল। তার খাওয়াদাওয়াও ঠিকমতো হচ্ছিল না। তার মধ্যে রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া অনেক। একদিন একটি গাড়ির সঙ্গে জোরে ধাক্কা খেল চিরু। মারাত্মক আহত হলো। স্থানীয় এক বাসিন্দা ধরমশালা এনিম্যাল রেসকিউ ট্রাস্টে (সংক্ষেপে বলা হয় দার) খবর দিল। শেষে চিরুর জায়গা মিলল দারে।

 

অনেক সঙ্গী পেল সেখানে

চিরু একটি শান্তশিষ্ট কুকুর। দারে সে আরো অনেক সঙ্গী পায়। রাস্তা থেকে তাকে উদ্ধার করার সময় ডাক্তাররা ভাবেননি চিরু চলতে-ফিরতে পারবে। তারপর অপারেশন, ওষুধপত্র আর সেবায় সে একসময় সেরে উঠল। তবে পেছনের দুই পায়ে ভর করে সে বেশি দৌড়ঝাপ করতে পারে না। দ্রুত দৌড়াতেও তার অসুবিধা হয়। তাকে খুব যত্ন সহকারে হাঁটতে নিয়ে যেতে হয়। এই দায়িত্বটি কিছুদিন ছিল আমার ওপর।

 

যেভাবে গেলাম ধরমশালায়

একটা পর্বত অভিযানে গিয়েছিলাম লাদাখের লেহতে। যাওয়ার আগেই ঠিক করেছিলাম ধরমশালা থেকে একবার বেড়িয়ে আসব। সেখানে আমার বন্ধু নেইল গুরুং থাকে। আমার সঙ্গে দুই বছর আগে তাঁর পরিচয় হয়। নেইলই আমাকে দারের কথা বলে এবং স্বেচ্ছাশ্রমের সুযোগের কথা জানায়। আমার বিড়ালপ্রীতির কথা সে আগে থেকেই জানত। নেইল নিজেও দারে অনেক দিন কাজ করেছে। আমি বেশি কিছু না ভেবে তাদের ওয়েবসাইটে একবার চোখ বুলিয়ে একটা ই-মেইল করে দিলাম—আমি ভলানটিয়ার হতে আগ্রহী এবং যাওয়ার নির্ধারিত সময়ও জানিয়ে দিলাম। তারাও আমার ইচ্ছাটাকে উৎসাহ দিয়ে ফিরতি ই-মেইল করে। পর্বতারোহণ শেষ করে লেহ শহর থেকে ধরমশালা পৌঁছাতে সড়কপথে প্রায় তিন দিন লেগে গেল। সিদবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে যখন বাস থেকে নামলাম, তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। সবাই গভীর ঘুমে, সুতরাং অপেক্ষা করতে হবে। এই শহরের রাস্তায় দল বেঁধে কুকুররা ঘোরাফেরা করে। দূর থেকে দেখলে কামড়ে দেবে এমন ভয় হতে পারে; কিন্তু তারা বেশ বন্ধুসুলভ। আমি যখন নেইলের জন্য রাক্কার রোডে অপেক্ষা করছিলাম, তখন একদল কুকুর অচেনা মানুষ পেয়ে আশপাশে ঘোরাঘুরি শুরু করেছে। তাদের দলে ভেড়াতে বিস্কিটের প্যাকেটটি তুলে নিলাম।

 

নেইলের কুকুর ন্যান্সি

ন্যান্সির বয়স প্রায় ১০ বছর। তার দুই চোখের দুটি কর্নিয়াই নষ্ট হয়ে গেছে এবং তাতে ইনফেকশনও হয়ে গেছে। এ জন্য একটি চোখ অপারেশন করে তুলে নিতে হয়েছে। আর অন্য চোখটিরও অপারেশন করতে হবে। ন্যান্সির জন্য নেইলের যে নিঃস্বার্থ ও অমূল্য ভালোবাসা, মায়া আর দায়িত্ববোধ তা আমাকে রীতিমতো বিমোহিত করেছে। ন্যান্সি তাদের পরিবারেরই একজন সদস্য হয়ে গেছে। ন্যান্সির খাওয়াদাওয়া, ওষুধ, রোজ নিয়ম করে বাইরে নিয়ে যাওয়া—সব কিছুই নেইল অনেক যত্নের সঙ্গে করে। ন্যান্সিও বুঝতে পারে তার জন্য কেউ আছে, তার অবহেলা হবে না। নেইল বলছিল, তোমার পরিবারের কারো এমন কিছু হলে কি তুমি তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারবে? নেইল পেশায় ইলাস্ট্রেশন আর্টিস্ট, সে তার কাজগুলো ঘরে বসেই করে নিতে পারে। তাই ন্যান্সির দেখাশোনায় কোনো অসুবিধা হয় না।

  

রিচার্ডের কুকুর হেনরি

ধরমশালা এনিম্যাল রেসকিউ ট্রাস্টের জায়গাটা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে। পরিবেশ বেশ সুন্দর আর মনোরম। অচেনা কেউ ঢুকছে বলে উচ্চৈঃস্বরে একদল কুকুরের ঘেউ ঘেউ আমাকে স্বাগত জানাল। প্রথমে পরিচয় হলো রিচার্ডের সঙ্গে, যিনি দারের ডিরেক্টর অব ফিন্যান্স অ্যান্ড অপারেশনসের সঙ্গে বোর্ড মেম্বরও। লন্ডন থেকে এসে রিচার্ড এখানে কাজ করছেন গত চার বছর ধরে। তাঁরও একটি কুকুর রয়েছে, যার নাম হেনরি। গলায় ছোট্ট করে একটি লকেটে ইংরেজিতে নামটা খোদাই করা আছে। রাস্তা থেকে হেনরিকে উদ্ধার করে এই রেসকিউ সেন্টারেই অপারেশন করা হয়। হেনরির ইউরিনও বের করে দিতে হয় ব্লাডারে চাপ দিয়ে। রিচার্ড দিনে চার থেকে পাঁচবার হেনরিকে এভাবে প্রস্রাব করায়। তার জন্য লন্ডন থেকে একটি স্পেশালাইজড হুইলচেয়ারও আনা হয়েছে। এই চেয়ারে করে হেনরি প্রতিদিন রিচার্ডের সঙ্গে রেসকিউ ট্রাস্টে আসে এবং বাসায় যায়। হেনরির চেহারায় বেশ মায়া ভাব আছে। সে আদর পেতে পছন্দ করে। ‘প্রথম দিন আমাকে দেখেই খু্ব রাগ দেখাচ্ছিল, আমি হাত বুলিয়ে আদর করতেই আমার ভক্ত হয়ে গেল।’ রিচার্ড আমাকে দারের সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। এখানে কাজ করেন ক্লিনিক ডিরেক্টর ডা. সোনিয়া, যিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে ভেটেরিনারি মেডিসিনের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আছেন ডা. নাজনিন, যিনি পাঞ্জাবে  পড়াশোনা করেছেন। দারের ফাউন্ডার হলেন দেব জারেট, বর্তমানে যুক্তরাজ্য থেকে সব কিছু পরিচালনা করেন এবং সংস্থাটি চালানোর জন্য ফান্ড সংগ্রহ করেন। একে একে পরিচিত হলাম ট্রাস্টি মেম্বার সঞ্জয়, এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার অফিসার বীনা, নিলাম, শমশের ও বিজয়ের সঙ্গে। প্রতিদিন সকাল ৯টায় এখানে অফিশিয়াল মিটিং হয়। সেখানে দিনের কাজগুলো সবার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়, পেশেন্টদের ব্যাপারে আপডেট দেওয়া হয়। প্রথম দিন আমার কাজ ছিল বিল্লুকে গ্রুমিং করা। মানে বিশেষ রকমের ব্রাশ দিয়ে তার লোমগুলো পরিষ্কার করে দেওয়া। তারপর নিয়ম করে কুকুরদের বাইরে হাঁটতে নিয়ে যাওয়ার কাজও ছিল। ধরমশালার পাহাড়ি রাস্তায় এই কুকুরগুলোকে নিয়ে সকাল-বিকাল হাইকিংয়ে গিয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি।

 

প্রাণীপ্রেমীর সংখ্যা কম নয়

ধরমশালায় তখন বেশ বৃষ্টি ছিল। এটা কুকুর-বিড়ালদের জন্য বেশ কঠিন সময়। তারা এ সময় খাঁচার ভেতর থেকে তেমন একটা বের হতে পারে না। তা ছাড়া অপারেশন হলে তাদের ক্ষত শুকাতে চায় না। চারপাশ স্যাঁতসেঁতে থাকে। প্রথম দিন সেন্টারের ক্লিনিক থেকে উটকো একটা গন্ধ নাকে এসে লাগলে  অস্বস্তি হচ্ছিল খুব। তবে কিছু সময় গেলে সব সয়ে গেল। মানুষ আসলে অভ্যাসের দাস। এখানে বেশির ভাগ কুকুরকে চিকিৎসা দিয়ে ভালো হওয়ার জন্য রাখা হয়। এরপর কেউ নিতে আগ্রহী হলে তাদের অ্যাডপশনে দেওয়া হয় অথবা নিরাপদ জায়গায় ছেড়ে আসা হয়। ধরমশালায় প্রাণীপ্রেমীদের সংখ্যাও কম নয়। এরা নিজেদের পালিত কুকুর-বিড়াল ছাড়াও রাস্তার কুকুরদেরও খাবার দেয়। যে কুকুর বা বিড়াল আহত হয়েছে, তাদের অবস্থা খারাপ হলে ধরমশালার অধিবাসীদের কেউ কেউ দারে খবর দেয়। তখন শমশের তার দল নিয়ে ছুটে যায় নির্দিষ্ট স্থানে আর আঘাতপ্রাপ্ত প্রাণীকে বেশ যত্নে খাঁচাওয়ালা গাড়িতে করে নিয়ে আসে দারে।

আমার একবার সুযোগ হয়েছিল তাদের সঙ্গে যাওয়ার। একজন ফোন করে খবর দেয় রাক্কার রোডের এক বাড়িতে দুর্ঘটনায় আহত একটি কুকুর রয়েছে। আমরা দ্রুত গাড়ি নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম। আমি, শমশের আর সঞ্জয় যখন নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছাই, তখন কুকুরটি ভয়ে এক কোণে বসেছিল। সে পায়ে বেশ বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে। সঞ্জয় কিছুটা সময় নিয়ে তার কাছাকাছি যায়। এরপর ঘাড়ে হাত রেখে আলতোভাবে দুই হাতে তাকে তুলে নিয়ে আসে। রেসকিউ সেন্টারে আনার পরে প্রথমেই তাকে র‌্যাবিসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। এরপর ওজন মেপে ব্যথানাশক ইনজেকশন দিয়ে অবজারভেশনে রাখা হয় এবং রক্ত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। তার একটা নাম দিয়ে ফাইল করা হয়। এরপর প্রয়োজন হলে অপারেশন করা হয়।

 

স্কিনি আটকা পড়েছিল

 

প্রাণীদের জন্য সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো ফাঁদে আটকা পড়া। স্থানীয়রা তাদের ফসলি জমিতে ট্র্যাপ লাগিয়ে রাখে আর তাতে আটকা পড়ে নিরীহ কুকুর। স্কিনি এমনি এক ওয়্যার (তার) ট্র্যাপে পড়ে এবং তাকে উদ্ধার করে আনা হয়েছিল। তার কোমরের অংশ এমনভাবে ফাঁদে আটকা পড়েছিল যে সব নার্ভ ও মাসল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডাক্তাররা চিকিৎসা আর ভালোবাসা দিয়ে স্কিনিকে এখন পর্যন্ত সারিয়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

 

দুই রকমের ভলান্টিয়ার

দুই ক্যাটাগরিতে ধরমশালা এনিম্যাল রেসকিউ ট্রাস্টে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা যায়। একটি মেডিক্যাল ভলান্টিয়ার, অন্যটি নন-মেডিক্যাল ভলান্টিয়ার। মেডিক্যাল ভলান্টিয়ারদের অবশ্যই ভেট স্কুল থেকে তিন বছরের ডিগ্রি থাকতে হবে। তারা মূলত ক্লিনিকে অপারেশনে সহযোগিতা করে। আর নন-মেডিক্যাল ভলান্টিয়াররা রেসকিউ ট্রাস্টের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে, কুকুরদের সময়মতো খাবার দেয়, সকাল-বিকাল হাঁটতে নিয়ে যায়, গ্রুমিং করে আর অফিশিয়াল কাজে সহযোগিতা করে। এখানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে হলে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ থাকতে হয় এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নিজ দায়িত্বে করে নিতে হয়। অবশ্য দুপুরের খাবার সবার জন্য দারে রান্না করা হয়।

 

কুকুরদের খাবার

কুকুরদের নিয়ম করে দুই বেলা খাবার দেওয়া হয়। সাধারণত ভাতের সঙ্গে  খাসি অথবা মুরগির সিদ্ধ মাংস। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে পেডিগ্রি (কুকুরের প্যাকেটজাত খাদ্য) দেওয়া হয়। এখানে অনেক কুকুর আছে, যারা একেবারেই চলতে পারে না, করো কারো দুই পা-ই অবশ। এ ধরনের কুকুরকে ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপি দিতে হয়। সুইফটের যেমন পেছনের অংশ প্যারালাইজড, সামনের একটি পা-ও ঠিকভাবে নাড়াতে পারে না। ডা. নাজনিনের  নির্দেশনায় তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে কিছু ব্যায়াম করালাম। মুখের সামনে পেডিগ্রি ধরে সামনে-পেছনে আসা-যাওয়ার জন্য চেষ্টা করালাম। সুইফটকে দেখে খুব মায়া লাগল। সে হয়তো আর কখনো নিজে থেকে দাঁড়িয়ে হাঁটতে পারবে না। তাকে কেউ হয়তো কখনো দত্তকও নেবে না।

ধরমশালায় সময়গুলো খুব দ্রুতই চলে গেল; তবে জীবনে এমন অভিজ্ঞতা খুবই মূল্যবান। এখানে কাজ করে মনে হয়েছে প্রাণীগুলো অবলা, তবে অকৃতজ্ঞ নয়।  অমূল্য তাদের ভালোবাসা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা