kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

আলো হাতে চলেছেন প্রতিভা

প্রতিভা সাংমার বয়স ৮৭ বছর। জীবনের সবটা জুড়ে গারো সমাজে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন। মো. আমিনুল হক তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন

৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আলো হাতে চলেছেন প্রতিভা

১৯৩২ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার ইদিলপুর গ্রামে প্রতিভার জন্ম। তাঁর বাবার নাম সনাতন মৃ। মা বঙ্গবালা চাম্বুগং। মা-বাবার আদরের কন্যা ছিলেন প্রতিভা সাংমা। মা-বাবাও ছিলেন শিক্ষিত। মা-বাবার উৎসাহ-উদ্দীপনা আর প্রেরণায় এগিয়ে যান প্রতিভা। সে সময় নারীশিক্ষা সহজ ব্যাপার ছিল না। ছিল না বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। ১৯৩৮ সালে ইদিলপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিভার পড়াশোনায় হাতেখড়ি। পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন ওই স্কুল থেকেই। পরে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট গিয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী স্কুলে। সেখানে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেন। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৫১ সালে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। তারপর তাঁর মা ভাবলেন, গারো সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য মেয়ের শিক্ষাকে কাজে লাগাবেন। মায়ের ইচ্ছায় সাড়া দিয়ে প্রতিভা পড়াশোনায় ইতি টানেন।

 

তোমরা জেগে ওঠো

১৯৫২ সালে প্রথমে ময়মনসিংহ শহরের হলি ফ্যামিলি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে দুই বছর শিক্ষকতা করে চলে যান হালুয়াঘাট উপজেলার সেন্টমেরিজ মিশনারি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। পরে যান বিরিশিরি গার্লস উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে চার বছর শিক্ষকতা করেন। এরপর চলে আসেন নিজের এলাকায়। লালমাটির মধুপুরে। অরণখোলা ইউনিয়নের ভুটিয়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন বিনা বেতনে। আশপাশে আরো দুটি মিশনারি স্কুলে অতিথি শিক্ষক হিসেবেও পাঠদান করেন। পরে মধুপুর গড় এলাকার কয়েকটি মিশনারি স্কুল ও তিনটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় মেধা ও শ্রম দিয়েছেন প্রতিভা সাংমা। যেমন ১৯৭২ সালে মধুপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি ভূমিকা রাখেন। সেখানে শিক্ষকতাও করেছেন। ছেলেদের পাশপাশি যেন মেয়েরাও স্কুলে যায় সে জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র সংগ্রহ করেন। গারো পরিবারের অভিভাবকদের বলতেন, ‘তোমরা জেগে ওঠো। সন্তানদের স্কুলে পাঠাও। শিক্ষিত না হলে অভাব যাবে না। নিজেরা টিকে থাকতে পারবে না।’ এ জন্য তিনি গারো সম্প্রদায়ের হেডম্যানদের সঙ্গেও বৈঠক করতেন। তিনি অবসর নিয়েছেন ১৯৯১ সালে।

 

ঘর বাঁধা হলো না

স্কুল প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার বীজ বপন করতে গিয়ে তাঁর আর ঘর বাঁধা হয়নি। সংসার করা হয়নি। থেকে গেছেন চিরকুমারী। গারো সমাজে কুমারী থাকা খুব কঠিন। কিন্তু তাঁর মনোবল ছিল প্রচণ্ড। নিজে মা হতে পারেননি বলে তাঁর দুঃখ নেই। গ্রামের সব সন্তানকেই তিনি নিজের সন্তান মনে করেন।

 

দত্তক নিয়েছিলেন

এক ছেলে ও এক মেয়েকে দত্তক নিয়েছিলেন প্রতিভা। দত্তক ছেলের নাম অ্যালবার্ট নকরেক। ডাকনাম অন্বেষ। আইএ পাস করে আর পড়াশোনা করেননি অ্যালবার্ট। তাঁর ঘরে এখন পাঁচ ছেলে। এদের মধ্যে এক ছেলে চয়ন দ্রং প্রতিবন্ধী। অন্য চার ছেলের মধ্যে রাহুল দ্রং বিয়ে করে গারো সমাজের রীতি অনুসারে সাইনামারী গ্রামে জামাই গেছে। বাবু দ্রং ঢাকায় চাকরি করে। রবি হিউবার্ট সিলেট মেডিক্যাল কলেজে নার্সের কাজ করে। জাসেং দ্রং চাকরি করে ঢাকায়। প্রতিভার দত্তক মেয়ের নাম জেনেথ মৃ। ১৭ বছর ধরে তিনি হালুয়াঘাট সেন্টমেরিজ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

 

মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজসেবা

১৯৫৩ সালে তিনি গার্লস গাইডের নেত্রী হিসেবে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তানের পেশোয়ারে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়েছিলেন ১৯৭১ সালে, দেশকে মুক্ত করতে। ১৯৭১ সালে মার্চে কে এম সফিউল্লাহর নেতৃত্বে সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা গাজীপুর ক্যান্টমেন্ট থেকে মধুপুরে অবস্থান নিলে তাদের সহযোগিতা দেন প্রতিভা। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জলছত্র খ্রিস্টদেহ ধর্মপল্লীতে সেবা দেন।

 

সম্মাননাও পেয়েছেন

শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য প্রতিভা সাংমা অনেকবার সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস এবং ২০০২ সালে জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ তাঁকে সম্মাননা প্রদান করেছে। গত বছর বিশ্ব আদিবাসী দিবসেও তিনি সম্মাননা পেয়েছেন।

তিনি বলেন কেউ যেন নিরক্ষর না থাকে। মা-বাবা যেন ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করায়। যুবকদের বলি, তোমরা উন্নয়ন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাও। আমি আশাবাদী, আগামী প্রজন্ম শিক্ষার আলো নিয়ে দেশকে আলোকিত করবে।

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা