kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

স্মৃতির পাতা

আমরা যখন কোয়াই নদীতে ব্রিজ বানাচ্ছিলাম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনীর হাজার হাজার সৈন্য জাপানিদের হাতে বন্দি হয়েছিল। থাইল্যান্ড থেকে মিয়ানমার (বার্মা) পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে শ্রম দিতে তাদের বাধ্য করা হয়েছিল। এই রেলওয়ের নাম দেওয়া হয়েছিল ডেথ রেলওয়ে। কারণ এটি তৈরি করতে গিয়ে অনাহার, রোগবালাই, বৈরী আবহাওয়া আর জাপানি সৈন্যদের নৃশংস আচরণে বহু যুদ্ধবন্দি প্রাণ হারায়। এমনি একজন ব্রিটিশ যুদ্ধবন্দি ছিলেন সিরিল ডয়। বিবিসির ক্লেয়ার বোওজকে বলছিলেন যুদ্ধবন্দি হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা

৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমরা যখন কোয়াই নদীতে ব্রিজ বানাচ্ছিলাম

জাপানি শিবিরে মিত্র বাহিনীর যুদ্ধবন্দি

‘সেটা ছিল এক আদিম জীবন’, বলছেন তিনি, ‘আমরা সভ্যতা থেকে বহু দূরে চলে গিয়েছিলাম। ঢুকে পড়েছিলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে।’ জাপানিরা যখন সিরিল ডয়কে আটক করে, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১ বছর। বন্দি অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় গভীর জঙ্গলে। সেখানে তাঁর পরনের সামরিক পোশাক খুলে ফেলা হয়। তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র সব জব্দ করা হয়। পরার জন্য তাঁকে দেওয়া হয় শুধু একটি লেংটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় ১৯৪২ সালের শুরুর দিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্রিটিশদের শক্ত ঘাঁটি সিঙ্গাপুরের পতন ঘটে। সেই যুদ্ধে জাপান ছিল হিটলারের মিত্রদেশ। সে সময় যে ৬০ হাজার ব্রিটিশ সৈন্য যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক হয় সিরিল ডয় ছিলেন তাঁদের একজন। জনবসতি থেকে বহু দূরে থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে তাঁকে শ্রমদাস হিসেবে আটক রাখা হয়। থাইল্যান্ড থেকে মিয়ানমার (বার্মা) পর্যন্ত একটি রেললাইন তৈরির কাজে জাপানিরা এই যুদ্ধবন্দিদের ব্যবহার করেছিল। এই রেলপথ দিয়ে তারা সৈন্য, খাবার, গোলাবারুদ এবং অন্যান্য রসদ আনা-নেওয়া করত। এটা ছিল বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। পাহাড়-পর্বত কেটে, পাথর ভেঙে, জঙ্গল পরিষ্কার করে এই রেললাইন বসানো হয়েছিল। ‘জাপানিরা কোনোভাবে ইংরেজি শব্দ ‘স্পিড’ (গতি) ব্যবহার করতে শিখেছিল। তাই তারা সব সময় ‘স্পিডো, স্পিডো’ বলে আমাদের ধমকা-ধমকি করত। তাই আমাদের সব সময় কাজ করে যেতে হতো। সরাতে হতো টনকে টন মাটি আর পাথর। বর্ষাকালে কাজ করতে হতো কাদা আর পানির মধ্য দিয়ে।’

সিরিল ডয়ের দায়িত্ব ছিল কোয়াই নামের নদীর আশপাশে গাছ কেটে জঙ্গল পরিষ্কার করা। এখানে একটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছিল। পরে এই সেতুটিকে নিয়ে হলিউডে একটি ছায়াছবি তৈরি করা হয়। যার নাম ছিল ‘ব্রিজ অন দ্য রিভার কোয়াই’। ছবিটি জনপ্রিয় হয়েছিল।

‘আমাদের কাজ ছিল জঙ্গল পরিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে নদীর খাড়া পারের মাটি কেটে নিচে নামিয়ে দেওয়া। এ কাজ করতে গিয়ে আমরা নিয়মিতভাবে সাপের খপ্পরে পড়তাম। ওপর থেকে নেমে আসা সাপ সরিয়ে আমাদের কাজ করতে হতো।’

কাজটা ছিল খুবই কঠিন এবং ছিল না কোনো অবসর। সারা দিনে খাবার দেওয়া হতো মাত্র আধা কাপ ভাত। ফলে পুষ্টির অভাবে বন্দিদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল।

‘ক্যাম্পে যে অসুখটা সবচেয়ে বেশি ছিল তা হলো বেরিবেরি। এই রোগে মানুষের পায়ে পানি জমে এবং সেগুলো হাতির পায়ের মতো ফুলে যায়। কারণ হচ্ছে ভিটামিনের অভাব। আরো ছিল কার্ডিয়াক বেরিবেরি, হার্টের সমস্যা। আমারও এই রোগ হয়েছিল।’ জাপানিরা যুদ্ধবন্দিদের কোনো ধরনের মেডিক্যাল সেবা দিত না।

সিরিল ডয়ের পায়ে একবার একটি ক্ষত থেকে ইনফেকশন হয়েছিল। কিন্তু এ জন্য তাঁকে ভরসা করতে হয়েছিল একজন যুদ্ধবন্দি অস্ট্রেলীয় ডাক্তারের ওপর। তাঁর জীবন রক্ষার জন্য যে পদ্ধতিতে তাঁর পায়ে অপারেশন করতে হয়েছিল, সে সম্পর্কে বলছিলেন তিনি। ‘আমার পায়ে পুজ জমেছিল। ফোড়ার মুখ দেখা দিয়েছিল। আমি টিপে টিপে সেই পুজ বের করে দিতাম।’ অস্ট্রেলিয়ার মেডিক্যাল কোরের ডাক্তার মেজর আর্থার মুন আমাকে দেখে বললেন, ‘দেখে তো মনে হচ্ছে তোমার ব্যাপারে একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা আমাকে নিয়ে গেল একটি কুঁড়েঘরে। সেখানে একটি বাঁশের মাচার ওপর আমাকে শোয়ানো হলো। তারপর কোনো ধরনের অ্যানেসথেসিয়া ছাড়াই তারা আমার পায়ের মাংস কেটে ভেতর থেকে পেশির একটি টুকরা টেনে বের করল। সেই অপারেশনটাই আমার জীবন রক্ষা করেছিল।’

থাই-বার্মা রেললাইনটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল মোট ১৪ মাস। এই রেললাইনটি তৈরি করতে গিয়ে এক লাখেরও বেশি এশীয় শ্রমদাস প্রাণ হারায়। তাদের পাশাপাশি ১৬ হাজার ব্রিটিশ, আমেরিকান, অস্ট্রেলিয়ান এবং ডাচ্ যুদ্ধবন্দি মারা যায়। যুদ্ধবন্দি হিসেবে সিরিল ডয় আটক ছিলেন প্রায় চার বছর। হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর আণবিক বোমা নিক্ষেপের পর জাপানিরা আত্মসমর্পণে রাজি হয়। আর তার মধ্য দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের।

সিরিল ডয় এখন থাকেন পূর্ব ইংল্যান্ডে। স্ত্রী, দুই সন্তান, চার নাতি-নাতনি এবং ৯ জন পৌত্র-পুত্রী নিয়ে তাঁর সংসার। (সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা