kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিশাল বাংলা

ইতিহাস লেখেন বজলুল করিম

খুলনার দৌলতপুরের মানুষ প্রায়ই তাঁকে দেখে। বুকের সঙ্গে চামড়ার হাতব্যাগ চেপে ধরে দৃঢ় পদক্ষেপে হাঁটছেন। তিনি ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মো. বজলুল করিম। বি করিম নামেই বেশি চেনা। ৮০ বছর পেরিয়েছেন মানুষটি। তবু যেন চলার শেষ নেই। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন মো. সিরাজুল ইসলাম

৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইতিহাস লেখেন বজলুল করিম

এই বয়সেও নিয়মিত লিখতে বসেন অধ্যাপক বজলুল করিম। ছবি : লেখক

খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান আর সংগঠনের ইতিহাস নিয়ে বিশাল আকারের বই লিখেছেন অধ্যাপক মো. বজলুল করিম। তিনি ইতিহাসসন্ধানী ও গবেষক। এই বছরের শুরুতে খুলনার বিএল কলেজ অ্যালাম্নাই অ্যাসোসিয়েশন ইতিহাসবিদ প্রফেসর বি করিমকে সংবর্ধনা দিয়েছে।

 

স্কুল টিচার হতে গিয়ে হলেন কলেজ শিক্ষক

ময়মনসিংয়ের গফরগাঁও কলেজে প্রভাষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু। গফরগাঁও হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের জন্য দরখাস্ত করেছিলেন। ভালো রেজাল্ট দেখে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁর জন্য গফরগাঁও কলেজে সুপারিশ করে। সেখানে তিনি প্রভাষক পদে যোগ দেন। তারপর মাদারীপুরের নাজিমুদ্দিন কলেজে ছিলেন বছরখানেক। সেখানে প্রচুর খেলাধুলা করতেন। ছাত্রদেরও খেলতে উৎসাহ দিতেন। এরপর দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে ব্রজলাল কলেজে ১৯৬২ সালে যোগ দেন। ১৯৯৬ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৪ বছর শিক্ষকতা করেছেন। এখানেও খেলাধুলার চর্চা তাঁকে শিক্ষার্থীদের ঘনিষ্ঠ করে তোলে। ঠিক সময় মেপে ঘড়ি ধরে ক্লাসে ঢুকতেন। কখনো ক্লাসে দেরি করেননি। সময়সচেতন, সুশৃঙ্খল জীবনের অধিকারী তিনি।

 

লিখলেন ইতিহাস

বইয়ের নাম—ব্রজলাল কলেজের ইতিহাস ১৯০২ থেকে ২০১০। একটি চতুষ্পাঠী টোল থেকে কিভাবে গড়ে উঠল বিএল কলেজ, সে ইতিহাস তুলে এনেছেন এক হাজার ৩০০ পৃষ্ঠার বইয়ে। সেই সঙ্গে বলেছেন শিক্ষকদের জীবনকথা আর উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থীদের কথা। আরো লিখেছেন, ‘ইতিহাস ও ঐতিহ্যে খুলনার দৌলতপুর’। লিখেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসভিত্তিক গবেষণামূলক বই ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস’। কলেজের মন্দির-মসজিদ নিয়ে লিখেছেন, ‘শিক্ষা ও প্রশাসনে মন্দির-মসজিদের ভূমিকা’। লিখেছেন ‘কাশিয়ানী উপজেলার কালামিয়ার ঘাট এবং বরেণ্য ব্যক্তিত্ব’।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর বিএনসিসির বিগত ১০০ বছরে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা সংগ্রহ করে লিখেছেন ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর : বিবর্তনের ধারায়’।

 

ধূমপান না করে বই ছাপানো, হেঁটে চলায় আনন্দ

বি করিম ছাত্রজীবনে কোনো দিন প্রাইভেট পড়েননি, পড়ানওনি। বিএল কলেজের ক্যাডেটদের নিয়ে মাসে একদিন কলেজ প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেছেন, বৃক্ষরোপণ করেছেন। ক্যাডেটদের সততার, নৈতিকতার পরামর্শ দিয়ে পড়ালেখায় মনোযোগী হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। জনসাধারণের কাছ থেকে বাঁশ, ইট, কাঠ সংগ্রহ করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিজ গ্রামে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠায় নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন। ধূমপায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে মাসে চার টাকা সংগ্রহ করে কলেজে গাছের চারা রোপণ করেছেন। অধূমপায়ী এই মানুষটি কর্মজীবনে প্রতিদিন পাঁচ টাকা করে সঞ্চয় করতেন, যা দিয়ে বই কেনা এবং নিজের লেখা বই ছাপানোর কাজে ব্যবহার করতেন। রিকশায় চলার চেয়ে হাঁটতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

 

বৃত্তির টাকায় মসজিদে ঘড়ি দান

বি করিমের জন্ম ১৯৩৮ সালে। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর মহকুমার করিমপুর থানার চেচানিয়া গ্রামে। পিতা রফিজ উদ্দিন আহমেদ মেদিনীপুরের জমিদারি স্টেটে কাজ করতেন। মায়ের নাম বিধুজান বেগম। বাবার কর্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর স্কুলে তাঁর লেখাপড়া শুরু। এরপর মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, লাহোর ও ঢাকায় তাঁর লেখাপড়া। ম্যাট্রিকুলেশন কুষ্টিয়ার খাস মথুরাপুর হাই স্কুল থেকে ১৯৫৩ সালে। উচ্চ মাধ্যমিক কুষ্টিয়া কলেজ থেকে। রাজশাহী কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক হন ১৯৫৮ সালে। পরের বছর স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বলছিলেন, ‘ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ পাওয়ায় হাজী মহসিনের তহবিল থেকে ১৫০ টাকা বৃত্তি পেয়েছিলাম। সে টাকায় দুটি ঘড়ি কিনে একটি মসজিদে দিয়েছিলাম।’

 

আপন আলোয় উজ্জ্বল

বি করিমের কথা ও কাজে প্রাণের প্রাচুর্য। নিয়মনিষ্ঠ, সুশৃঙ্খল ও পরিশ্রমী তিনি। পুরনো ছবি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ তাঁর অভ্যাস। ২০০৮ সালে সরকারিভাবে গঠিত কমিটির সদস্যদের দৃষ্টিতে প্রফেসর বি করিম খুলনা অঞ্চলে পাঁচজন সাদা মনের মানুষের অন্যতম। বিএনসিসির আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। খুলনা বেতার ২২ আগস্ট ২০১৯ তাঁর জীবনকথাভিত্তিক সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে।

 

পারিবারিক জীবন

তাঁর বাড়ির ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই নজরে পড়বে পিতলের তৈরি বিশাল আকৃতির বিএনসিসির লোগো। তাতে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘জ্ঞান-শৃঙ্খলা-একতা’। বাড়ির প্রধান ফটকের দুই স্তম্ভে সিমেন্ট দিয়ে চারটি করে মোট আটটি ফুটবল স্থাপন করেছেন। সহধর্মিণী লায়লা আরজুমান্দ তাঁর ছায়াসঙ্গী। এক মেয়ে, দুই ছেলে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। বড় ছেলে রানা এজাজ করিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। ছোট ছেলে রুমি ঢাকা আবাহনী ক্লাবের সাবেক স্ট্রাইকার ও অধিনায়ক। বর্তমানে সপরিবারে কানাডায় থাকেন। কন্যা সুষমা স্নিগ্ধা সংগীতশিল্পী। প্রফেসর বি করিম বলেন, ‘তিনটি বিষয়ে সারা জীবন গুরুত্ব দিয়েছি। সময়, অর্থ আর মানসিক শক্তির সদ্ব্যবহার। এসবের সঙ্গে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন হলো আমার এগিয়ে যাওয়ার মূলমন্ত্র।’ আরো বলেন, ‘নিজের ওপর নির্ভরশীল হও। মানুষের বড় সম্পদ হলো মানসিক শক্তি। দেশের বড় সম্পদ হলো দেশের মানুষ। মানুষ ভালো কাজ করলে দেশ সম্পদে পরিপূর্ণ হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা