kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ফেসবুক থেকে পাওয়া

৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ফেসবুক থেকে পাওয়া

বোনের জন্য ফোন

পূজা এলেই মাথায় একটি চিন্তা বারবার ঘুরপাক খায়। ভাবলাম, গত দুই বছরের মতো এবারও হয়তো ব্যাপারটা ঘটতে যাচ্ছে। ফোনটা বেজে চলছে। আমি নিশ্চিত, আমার ছোট বোনই কল করেছে। ও সাধারণত আমাকে ফোন করে না। আমিই করি; কিন্তু পূজার আগে এর ব্যতিক্রম হয়। ওর আগবাড়িয়ে ফোন করার বায়নাটা বুঝি। মায়ের ফোন থেকে কল করে আবারও ওই একই বায়না, ‘দাদা, টাকাটা জোগাড় করেছ? স্মার্টফোনটা এবার কিনে দেবে তো?’ বললাম, ‘এবার অবশ্যই দেব, তুই চিন্তা করিস না।’ গত দুই বছর ধরে জমিয়ে রাখা আবদার এবারের পূজায় পূরণ না করলে কী হয়! তাই তো এবার টিউশনির বেতন দুই মাস নিইনি, জমিয়ে রেখেছি। বড় ভাই হলে যে কত আবদার পূরণ করতে হয়! মাঝে মাঝে যখন বাড়ি যেতাম, তখন ও ফোনের কথা মনে করিয়ে দিত। বললাম, ‘এবার আর ভুল হবে না।’ বোনটি বিশ্বাস করলেও আমার মা আমার কথা বিশ্বাস করতে চাইছিল না! কারণ মা জানে আমার ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’। একমাত্র ছোট বোন। যখন বাড়ি যাই, ও সব কিছু গুছিয়ে রাখে। আবার ফেরার সময়ও ব্যাগপত্র গুছিয়ে দেয়। যা হোক এবার আর মিথ্যা আশ্বাস নয়। ওর স্বপ্ন পূরণ করবই। এবার একসঙ্গে তিন মাসের টিউশনির টাকা পেলেই হলো।

হঠাৎ এক দুঃসংবাদ পেলাম। ছাত্রীর মা-বাবা বিদেশে চিকিৎসা করাতে গেছেন। ফিরতে মাসখানেক লাগবে। আমার টিউশনির টাকাটা রেখে যেতে তাঁদের মনে নেই। মনটা খারাপ হয়ে গেল! হতবিহ্বল অবস্থায় টিউশনি থেকে বাসায় ফিরলাম। হায় রে কপালের লিখন! জমিয়ে না রেখে প্রতি মাসে টাকাটা যদি নিজের কাছে রাখতাম। যা হোক, বাড়িওয়ালাকে বুঝিয়ে ঘরভাড়ার টাকা এ মাসে দিলাম না। এর সঙ্গে বন্ধুর কাছ থেকে আরো কিছু টাকা ধার করে একটা ফোন কিনলাম। এরপর ঢাকা থেকে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। সারপ্রাইজ দেব বলে বাড়িতে আসার কথা কাউকে আর বলিনি! সারা দিনের ক্লান্তি, পূজার আনন্দ ও সর্বোপরি স্মার্টফোন কেনার আমেজে মনটা একাকার। কখন যে ট্রেনের ঝকঝক শব্দে ঘুমিয়ে পড়েছি টেরই পাইনি। নতুন প্যাকেটসহ ফোনটি ব্যাগের মধ্যেই ছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখি ব্যাগটা গায়েব!

এবারও ছোট বোনটির স্বপ্ন পূরণ করতে পারলাম না! অসহায় মন আর অবশ হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পৌঁছে দেখি বোনটি স্মার্টফোনে কী যেন ঘাঁটাঘাঁটি করছে। অবাক হয়ে বললাম, ‘এটা কার।’ ও জানাল স্থানীয় এক মেলায় গত সপ্তাহে ‘কুইজ প্রতিযোগিতায়’ প্রথম হয়ে সে এটা উপহার পেয়েছে। আমাকে সারপ্রাইজ দেবে বলে বলেনি! আমার সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

সাধন সরকার

ঢাকা

 

আমার বেকার বন্ধুরা

কয়েক দিন ধরে বন্ধুদের মেসে আছি। দেখছি তাদের দিনকাল। উপভোগ করছি তাদের সঙ্গ। বেকার থাকলেও তাদের চোখে-মুখে চিন্তার লেশটুকু নেই। সবাই হাসিখুশি। যদিও খাবার তিনবেলা ঠিকমতো জোটে না।

বন্ধুদের সকালে উঠেই খাবারের চিন্তা করতে হয়। কোনো দিন চাল থাকলে ডাল থাকে না; লবণ থাকলে থাকে না হলুদ-মরিচ। শুরু হয় চিল্লাচিল্লি। আজকে টাকা কে দেবে? শামসু বলে, ফরিইদ্দা! টেহা দে। ফরিদ কাকুতি-মিনতি করে কয়, ‘ভাই, আজকে আমার কাছে নাই। আজকে তুই দে। পরে কাজ পাইলেই তোরে দিয়া দিমু।’

কোনোমতে টাকার ব্যবস্থা হলে পাশের দোকান থেকে বাজার করা হয়। যার দায়িত্ব সে রান্না করে। বেশির ভাগ আলুভর্তা, ডাল পাকানো হয়। তার পর শুরু হয় খাওয়াদাওয়া। খাওয়ার মধ্যে কে বেশি খেল তা নিয়ে বেধে যায় তুমুল ঝগড়া। ঝগড়াটা অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।

সকালে খাওয়ার পর আর কোনো চিন্তা নেই। সবার চেহারায় রাজ্য জয়ের ভাব ফুটে ওঠে। কেউ গান গায়, কেউ মোবাইলে শোনে। কেউ আবার মোবাইলে কথা বলে। তখন বন্ধুদের দেখলে মনে হয়, পৃথিবীতে ওদের মতো সুখি বুঝি আর কেউ নেই! দুপুরে কেউ কেউ কাজ খুঁজতে বের হয়। যাওয়ার আগে খুব ভাব নিয়ে যায়। বলে, কাজ খুঁজতে যাইতাছি। আজকে কাজ ভাও (জোগাড়) হইব-ই; কিন্তু আসার পর আর সেই ভাবটা থাকে না। চোখে-মুখে হতাশার চিহ্ন ফুটে ওঠে। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘আইজও কাম ভাও হয় নাই।’

রাতে শুরু হয় মোবাইলে লুডু খেলা। চলে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত। এ সময় মোবাইলে চলে বাংলা, হিন্দি গান। গানের তালে তালে জমে ওঠে খেলা। খেলতে খেলতে কখনো রাতের খাওয়ার কথা ভুলে যায়। না খেয়েই বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।

আমার বেকার বন্ধুদের দিন খেয়ে-না খেয়ে যেভাবেই কাটুক, প্রত্যেকের স্বপ্ন কিন্তু আকাশছোঁয়া! নাজমুলের স্বপ্ন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া। দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করা। ফরিদের স্বপ্ন বড়লোকের মেয়ে বিয়ে করে বসে বসে খাওয়া। শরিফ আর শামসুর স্বপ্ন প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক হওয়া।

জুনায়েদ আহমেদ

দুর্গাপুর, নেত্রকোনা

 

একপলকে চলে গেল আহ্ কী যে তার ছলনা

১.  ‘তোর ঘর সাজানোর সেন্স বরাবরই ভালো। পর্দার রং নীল। বিছানার চাদর সবুজ। পাপোশ রেখেছিস মেটে রঙের। সমুদ্রসৈকতের ফ্লেভার পাচ্ছি! অন্য কোনো মেয়ে হলে সব রাখত ম্যাচিং করে। ম্যাচিং না করেও যে সুন্দর থাকা যায়, এটা সবাই জানে না।’ অলিন্দ সব কিছু সিআইডি পুলিশের মতো পরখ করে দেখছে। প্রায় ছয় মাস পর সে কণিকার বাসায় এসেছে। এত দিন সে কোথায় ছিল কেউ জানে না। হুটহাট উধাও হয়ে যাওয়াটা একটা শিল্পের পর্যায় নিয়ে গেছে ছেলেটি।

নতুন আনা ফুলদানির ট্যাগটা ওঠানো হয়নি। তার স্বামীর নিয়ম যেকোনো কিছু কেনার এক মাস পর ট্যাগ ওঠানো হবে। দামটা বারবার চোখে পড়লে মনে মায়া জন্মাবে। জিনিস সহজে নষ্ট হবে না, ভাঙবে না। ফুলদানিটা উল্টে দেখে মুচকি হাসল অলিন্দ। বিখ্যাত সেই হাসি! ‘বাদ দাও। জানি আমার গোছগাছ করার রুচি ভালো। তুমি কম করে হলেও অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যা সমানবার এ কথা বলে ফেলেছ। এত দিন কোথায় ছিলে বলোনি তো!’

‘ছিলাম। মাটির ওপরেই কোথাও ছিলাম।’

‘মাটির ওপরে যে ছিলে তা জানি। তুমি তো আর সাপ না, যে মাটির নিচে থাকবে। তোমার জন্য চাচি কত কাঁদে। তুমি বাসায় যাও না। বাসার বড় ছেলে তুমি। এত কষ্ট দাও কেন সবাইকে?’ অলিন্দ চোখের খেলা খেলতে ভালো জানে। চশমার মোটা ফ্রেম ছেদ করে এ খেলা সে বহু বছর যাবৎ খেলে এসেছে। সবার  সঙ্গে না, শুধু এ ঘরের জানালা আটকে দিচ্ছে যে মেয়েটি তার  সঙ্গে। কিন্তু এ কিস্তিতে সে পুরোপুরি হেরে গেছে। মেয়েটি তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।

‘ঘরে খুব বালু আসে। আশপাশেই প্রচুর বিল্ডিং হচ্ছে। সব জানালা খুলে রাখতে পারি না।’

এখন চোখে একটু বালু পড়লে সুবিধা হতো। একটি ছুতো দেখানো যেত। লুকিয়ে চোখের জল মুছতে ইচ্ছা করে না—মনে মনে বলল কণিকা।

২.  ‘বৈশাখ মাসের বাতাসের মতো এই আসো—এই চলে যাও। ১৫ মিনিটও শান্তিমতো বসলে না।’

‘আমি বিগত ১৫টি মাস শান্তিমতো কোথাও বসি না। তুই খুব ভালো করেই জানিস।’

বাক্যটা শেষ হতেই যাবতীয় নীরবতা যেন কণিকার বাসার ড্রয়িংরুমে এসে ভর করল। কণিকা নীরবতাকে দীর্ঘ হতে দিল না।

‘অলিন্দ ভাইয়া, তোমার উদ্ভ্রান্ত এক জোড়া লাল চোখ, উধাও হয়ে আবার ধরা দেওয়ার খেলা আর বখে যাওয়া কয়টা ছেলেপুলের সঙ্গে উঠবোস করার দশা কবে শেষ হবে?’ অলিন্দের ঠোঁটে আবার মুচকি হাসি।

‘যেদিন তুই আমার জন্য বালিশের কাভারের ভেতর টাকা জমানো ছেড়ে দিবি, সেদিন।’ এই বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই চলে গেল অলিন্দ।

জুয়াইরিয়া জাহরা হক

মিরপুর, ঢাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা