kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাঙালির বিশ্বদর্শন

প্রাচ্যের পম্পেই

ফাতিমা জাহান    

৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রাচ্যের পম্পেই

জেরাশ শহরের নাম জর্দান আসার আগে একবার শুনেছিলাম, তবে বেশি গুরুত্ব দিইনি। শহরটি যে এত ঐতিহ্যবাহী, কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস ধরে আছে—না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ অব্দে সম্রাট আলেকজান্ডার মিসর থেকে সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় এ নগরীর গোড়াপত্তন করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ অব্দে জেরাশ রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিছু ইহুদি পরিবারেরও বসবাস ছিল তখন জেরাশ নগরীতে। বলা হয়ে থাকে, ইতালির বাইরে সবচেয়ে পরিকল্পিত ও আধুনিক শহর ছিল জেরাশ। এ কারণে জেরাশকে প্রাচ্যের পম্পেই বলা হতো।

৬১৪ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের সম্রাট নগরটি দখল করার পরে এটি ধ্বংসের মুখে পড়ে। তবে উমাইয়া খলিফাদের শাসনামলে আবার পুনরুজ্জীবিত হয়। এ সময় জেরাশে মুসলমান ও খ্রিস্টানরা সংখ্যায় প্রায় সমান ছিল।

দ্বাদশ শতাব্দীতে জেরুজালেমের রাজা বল্ডউইন জেরাশ দখল করে অনেক স্থাপনা ধ্বংস করে ফেলেন। এর পরও জেরাশের জনপদ মুখরিত ছিল মামলুক শাসকদের সময় পর্যন্ত। তারপর অটোম্যান সাম্রাজ্য বিস্তারের পর ষোড়শ শতাব্দীতে জেরাশ শহর ধীরে ধীরে কালের গর্ভে মিলিয়ে যায়।

জর্দানের রাজধানী আম্মান থেকে জেরাশের দূরত্ব প্রায় ৪৮ কিলোমিটার। জর্দানে প্রায় প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব গাড়ি আছে। গণপরিবহনের স্বল্পতায় এখানে বেশ ভুগতে হয়। মাঝে মাঝে দূরপাল্লার যাত্রায়ও ট্যাক্সিতে চড়তে হয়েছে।

আম্মান থেকে ট্যাক্সি চেপে ৪০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম জেরাশ। মরুভূমির দেশ, জনসংখ্যা কম, মূল শহরেও ট্রাফিক জ্যাম নেই আর হাইওয়েতে গাড়ি হয়ে ওঠে পক্ষীরাজ। টিকিট কেটে জেরাশ নগরীতে প্রবেশ করার পর প্রথমেই সামনে পড়ল ‘হেড্রিয়ানস গেট’। রোমান সম্রাট হেড্রিয়ানের নামে এই গেট। দাঁড়িয়ে আছে ১২৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে। এখানকার সব ভবন আর তোরণ হোয়াইট স্টোন দিয়ে নির্মিত। সে কারণে দেখলে মনে হবে একটি শ্বেতশুভ্র রূপকথার রাজ্য।

 হেড্রিয়ানস গেট পার হয়ে হিপ্পোড্রাম বা তখনকার নগরীর প্রধান স্টেডিয়াম ধরে খানিক হাঁটলাম। অল্প বাদে হেঁটে পৌঁছলাম আরেকটি তোরণের সামনে। তোরণ পেরোলে ‘ফোরাম’ বা ওভাল আকৃতির ময়দান। ওভাল আকৃতি তৈরি করা হয়েছে ১৬০টি স্তম্ভকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে। ফোরাম পার হয়ে দেখা মিলবে কলাম স্ট্রিটের। কোরিনথিয়ান বা গ্রিক স্থাপত্যকলায় নির্মিত এই কলাম স্ট্রিটের দুই ধারের স্তম্ভের সংখ্যা হাজারের অধিক। কলাম স্ট্রিটের প্রথমে নগরীর বাজার ‘আগোরা’। একসময়কার মানুষজনের মিলনস্থল। কাপড়, গয়না, সুগন্ধি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব দ্রব্য মিলত এই বাজারে। বাজার পার হলে নিমফিয়াম বা জলের ফোয়ারা। প্রতিটি গ্রিক শহরের স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম আকর্ষণ এই জলের ফোয়ারা। বলা হয়ে থাকে, গ্রিক ও রোমান শাসনামলে ফোয়ারাটি পবিত্র জলে পরিপূর্ণ থাকত। বাজার পেরোলে ‘টেম্পল অব আর্টেমিস’ বা দেবী আর্টেমিসের মন্দির। তবে খানকয়েক পাথুরে দেয়াল ছাড়া তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। দেবী আর্টেমিস ছিলেন দেবতা জিউসের কুমারী কন্যা, যিনি রোগবালাই, বিপদাপদ থেকে জনসাধারণকে রক্ষা করতেন। আর্টেমিসের মন্দির পেরিয়ে খানিক এগোলেই রাজপ্রাসাদ। প্রাসাদটিরও কয়েকটি ভগ্নপ্রায় দেয়াল ছাড়া আর কিছু নেই। রাজপ্রাসাদ থেকে ফেরার পথ একটাই কলাম স্ট্রিট। কলাম স্ট্রিট পেরিয়ে হিপ্পোড্রোমের পথ মাড়িয়ে খানিক এগোলে চোখে পড়বে এমফিথিয়েটার। জেরাশ নগরীতে জনসাধারণের মনোরঞ্জনের জন্য তিনটি এমফিথিয়েটার ছিল। একটি এখনো বহাল তবিয়তে আছে। তিন হাজার দর্শক ধরতে পারে এই এমফিথিয়েটার।

একে তো মরুভূমির দেশ, তার ওপর সূর্য এখন মধ্যগগনে। জেরাশ শহর দেখতে দেখতে কখন আধা বেলা পার হয়ে গেল টের পাইনি। এর মাঝে দুই লিটারের ওপরে পানিও সাবাড় করেছি। আরো খানিকক্ষণ জেরাশ শহরের রূপ দুই চোখ ভরে দেখে পা বাড়ালাম আম্মানের দিকে।

গ্রিক ও রোমানদের বহু শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখেছি। তবে জেরাশ শহর ভোলার মতো নয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা