kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আজও আছে

হ্যাজাক জ্বলে যাক

তখন বিদ্যুৎ ছিল না। তাহলে রাতের আসরে আলো দিত কে? হ্যাজাকের কথাই মনে পড়বে অনেকের। এখন কী দশা বাতিটির? কোথাও কি জ্বলে? মাসুম সায়ীদ খুঁজতে গিয়েছিলেন

৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হ্যাজাক জ্বলে যাক

১৯৮৬ কি ৮৭ সালের কথা। দেশের বেশির ভাগ গ্রামের মতো তখন বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামেও। সরকারবাড়ির মোয়াজ্জেম সরকারের বাহির বাড়ির আঙিনার ঠিক মাঝখানে হ্যাজাক বাতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তাঁর ছোট ছেলে ইদ্রিস। তাঁকে ঘিরে আছে বাড়ির ছোট ছেলে-মেয়েরা। একটু দূরে মোয়াজ্জেম সরকার আরো দুই-একজন মান্যগণ্য লোক নিয়ে বসে আছেন হাতলওয়ালা চেয়ারে। খানিক বাদেই খেপে যাওয়া অজগরের মতো ফোঁস ফোঁস শব্দে জ্বলে ওঠে জার্মানির তৈরি ডাবল বিচ্ছু হ্যাজাক লাইটটি। সঙ্গে সঙ্গে দিনের মতো ফরসা হয়ে ওঠে মস্ত বড় আঙিনার চার ধারের কিনার পর্যন্ত। আগুনের আঁচ থেকে মুখ বাঁচিয়ে ইদ্রিস আলী হ্যাজাকটি রেখে দেন একটি টুলের ওপর। এমনিতে এটা সারা বছর ঝুলানো থাকে বড় ঘরের থামের সঙ্গে। বাড়িতে বা পাড়ায় রাতের বেলায় কোনো উৎসব থাকলে এটা নামানো হয়। তারপর ঝেড়ে-মুছে নতুন মেন্টল (সলতে) লাগিয়ে তেল ভরে হাওয়া পাম্প করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এই খুঁটিনাটি কাজ ইদ্রিস আলী করেন খুব যত্ন আর আগ্রহের সঙ্গেই। এটা তাঁর কাছে শুধু একটা বাতি নয়, গর্বেরও বিষয়। গ্রামে আর কারো বাড়িতে নেই। কারো দরকার পড়লে ছুটে আসতে হয় তাঁর কাছে। না হলে ভাড়া করে আনতে হয় থানা সদর থেকে। ভাড়াও কম নয়—প্রতি রাত ৬০ থেকে ৭০ টাকা। আজ একটু পরেই শুরু হবে বাউলগানের আসর। ইদ্রিস আলীর বড় বোনের ননাশের (স্বামীর বড় বোন) ১৭-১৮ বছরের ছেলে রফিকুল নতুন বাউল হয়েছে। দোতারা বাজিয়ে রাতভর একটানা গান করে যায় সে। নিজেদের একটা ছেলে বাউল! তার গান না শুনলেই নয়। এ উপলক্ষেই আজকের আয়োজন। এ ছাড়া গ্রামে প্রতিবছর ২৬ মার্চ উপলক্ষে মেলা বসে তিন দিনের। রাতের বেলায় হয় মঞ্চনাটক। গ্রামের শিক্ষিত, অশিক্ষিত ছেলেরা সেখানকার পাত্র-পাত্রী। স্কুল ঘরটাকে বানানো হয় সাজঘর। আর তার সামনে চৌকি ফেলে মঞ্চ। মঞ্চের চার কোনার খুঁটিতে বাঁধা থাকত চারটি হ্যাজাক লাইট। এখানেও হ্যাজাক জ্বালানোর দায়িত্ব ইদ্রিসের। সঙ্গে থাকে হায়দর আর সাঈদ।

 

দিন বদলে গেছে

১৯৯২ সালের পর বিদ্যুৎ চলে আসে গ্রামে। তার পর থেকে ফুরিয়েছে হ্যাজাকের কদর। যে কাঠের থামের সঙ্গে বাতিটি ঝুলত, সেটায় ঘুণ ধরতে থাকে। মোয়াজ্জেম সরকার পাড়ি জমান পরপারে। পুরনো ঘরটি ভেঙে নতুন করে দেওয়ার দরকার পড়ে। ভাঙা ঘরের পরিত্যক্ত জিনিসের সঙ্গে এখানে-ওখানে পড়ে থাকে হ্যাজাকটি। নতুন ঘরও দাঁড়িয়ে যায় কিছুদিন পর। কিন্তু সে ঘরে আর স্থান হয় না তার। কোনো দিন যে এটা কাজে লাগতে পারে সে কথাটা মাথায় আসে না কারো। বছর ১৫ পরে ইদ্রিসও অনুসরণ করেন পিতাকে। ইদ্রিস আলীর গর্বের হ্যাজাকটি কবে কখন চলে যায় ভাঙ্গারির দোকানে। একমাত্র ছেলে শামীম সেটা টেরও পায় না। সে হয়তো জানেও না এই জিনিসটিই একসময় ছিল তাদের গর্বের বস্তু। কারণ সেই বাউলগানের আসরের সময় তার জন্মই হয়নি।

 

লাইট হাউসের হ্যাজাক

বংশী নদীর তীরে সাভার নামাবাজার। কয়েক শ বছরের পুরনো এ বাজার। এরই ঠিক প্রাণকেন্দ্রে একটি দোকান। নাম—সাভার লাইট হাউস। দোকানের স্বত্বাধিকারী এখন রিপন সাহা। এক পড়ন্ত বিকেলে তাঁর দোকানের সামনে পাওয়া গেল পুরনো একটি হ্যাজাক বাতি। খানিক আগেই জ্বালানো হয়েছিল। দেখেই বোঝা গেল পুরনো জিনিসটিকে ঠিকঠাক করা হয়েছে। আর তা পরীক্ষার জন্যই জ্বালানো হয়েছিল। রিপন সাহা দোকানেই ছিলেন। ‘আর হ্যাজাক লাইট’—প্রসঙ্গ তুলতেই কিছুটা আফসোসের সঙ্গেই বললেন কথাটা। ‘আগের দিন হলে এমন সময় নামাবাজারের সব কয়টি বড় দোকানে জ্বলে উঠত হ্যাজাক বাতি। বিদ্যুৎ আর চার্জার লাইটে গেছে হ্যাজাক বাতির দিন।’ তারপর তুললেন তাঁদের পুরনো দিনের কথা।

 

তিন পুরুষের ব্যবসা

রিপন সাহা নিজে একজন ইঞ্জিনিয়ার। কলকাতা থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর ডিপ্লোমা করেছেন। দেশে ফিরে চাকরিও করেছেন কিছুদিন।  ১৯৯৮ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে হাল ধরেন পারিবারিক ব্যবসার। হ্যাজাক লাইট বিক্রি আর ভাড়া দেওয়ার ব্যবসাটা শুরু করেছিলেন তাঁর দাদা—কালিচন্দ্র সাহা। বিয়ে-শাদি, পূজা-পার্বণ, যাত্রাপালা, এমনকি ধর্ম সভায়ও ভাড়া দেওয়া হতো হ্যাজাক লাইট। দাদার পর ব্যবসা চালাত তাঁর বাবা শান্তিগোপাল সাহা। নতুন হ্যাজাক বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে চলত পুরনো হ্যাজাক সারাই করার কাজ। বাবা আর দাদা দুজনই ছিলেন ওস্তাদ কারিগর। তাঁদের কাছ থেকে রিপন সাহা শিখেছেন মেরামতির কাজ। নিজে বানিয়েছেন বেশ কয়েকজন শিষ্য। তাদের একজন রামপ্রসাদ আছে এখনো। আজকের হ্যাজাকটি সারিয়ে তুলেছে সে-ই।

হ্যাজাক বাতির অঙ্গ

দেখতে হ্যাজাক বাতি হারিকেনের মতোই। তবে আকারে বেশ বড়। আর প্রযুক্তিও ভিন্ন। জ্বলে পাম্প করে চালানো কেরোসিনের কুকারের মতো একই প্রযুক্তিতে। চুলার বার্নারের বদলে এতে আছে ঝুলন্ত একটা সলতে। যেটা দেখতে ১০০ ওয়াটের সাদা টাংস্টেন বাল্বের মতো। অ্যাজবেস্টরে তৈরি। এটা পুড়ে ছাই হয়ে যায় না। পাম্প করা তেল একটা নলের ভেতর দিয়ে গিয়ে স্প্রে করে ভিজিয়ে দেয় সলতেটা। এটা জ্বলতে থাকে চেম্বারে যতক্ষণ তেল আর হাওয়ার চাপ থাকে ততক্ষণ। তেলের চেম্বারের চারদিকে থাকে চারটি বোতাম। একটি পাম্পার। একটি অ্যাকশন রড। একটা হাওয়ার চাবি। আর একটি অটো লাইটার বা ম্যাচ। অ্যাকশন রডের কাজ হচ্ছে তেল বের হওয়ার মুখটা পরিষ্কার রাখা। হাওয়ার চাবি দিয়ে পাম্পারে পাম্প করা বাতাসের চাপ কমানো-বাড়ানো হয়। অটো ম্যাচ করে দিয়াশলাইয়ের কাজ। একবার হাওয়া দিলে জ্বলতে থাকে বেশ কয়েক ঘণ্টা। আর এক লিটার তেল জ্বলে সারা রাত ধরে।

 

হ্যাজাকের রকমফের

কথায় কথায় হ্যাজাকের আরো অনেক তথ্যই জানালেন রিপন সাহা। সবচেয়ে ভালো হ্যাজাক ছিল ডাবল বিচ্ছু। তৈরি হতো জার্মানিতে। অ্যাংকর-অ্যাংকর চায়নার তৈরি। এমনিতেই সব হ্যাজাক ডিজেলেই জ্বলে। তবে গ্যাসে জ্বালানোর হ্যাজাকও ছিল। আসত সুইডেন থেকে। আর এক প্রকার হ্যাজাক ছিল খুবই মূল্যবান। সেটার নাম ডে-লাইট হ্যাজাক।

 

হ্যাজাকের এ-কাল

নিয়মিত ব্যবহার না থাকলেও একবারেই বিলীন হয়ে যায়নি হ্যাজাক। এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেউ কেউ মুরগি আর মাছের খামারে হ্যাজাক বাতি ব্যবহার করে, বিশেষ করে একদিনের বাচ্চা যখন শেডে তোলা হয়, তখন তাদের ৪০ ঘণ্টাই উজ্জ্বল আলোর দরকার হয়। সাধারণ বৈদ্যুতিক বাতিতে সেটা সম্ভব হয় না বলে খামারিরা হ্যাজাক ব্যবহার করেন। আবার বর্ষার পর শীতের শুরুতে যখন নদী-নালায় পানি কমতে থাকে, তখন রাতের বেলায় হ্যাজাক জ্বালিয়ে মাছ শিকার করে কেউ কেউ। হ্যাজাকের তীব্র আলোতে ছুটে আসে মাছ। তবে এটা চলে বছরে মাত্র মাস দুয়েক।                                                   ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা