kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পুষ্টির ফেরিওয়ালা

মফস্বলের মেয়ে তামান্না চুলে বেণি করে মা-বাবার হাত ধরে স্কুলে গিয়েছে। সেই তামান্না এখন যুদ্ধক্ষেত্রে লিকলিকে নারী ও শিশুদের পুষ্টির জোগানদাতা। পুষ্টিবিজ্ঞানী ড. তামান্না ফেরদৌসের গল্প বলছেন ফখরে আলম

৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পুষ্টির ফেরিওয়ালা

গুলি, বন্দুক, কামান, মেশিনগান অগ্রাহ্য করে বোকো হারাম, তালেবান অধ্যুষিত এলাকার বুভুক্ষু যুদ্ধপীড়িত নারী ও শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তামান্না। জীবন বাজি রেখে নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া আর আফগানিস্তানে কাজ করার পর এখন তিনি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, তাজিকিস্তান, মিয়ানমার, উত্তর কোরিয়ায় পুষ্টি নিরাপত্তাভিত্তিক কৃষি নিয়ে কাজ করছেন।

 

যেভাবে শুরু 

যশোর শহরের লোন অফিসপাড়ার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র সড়কে বাড়ি। বাবা শেখ গোলাম ফারুক ব্যবসায়ী। মা নীরু শামছুন্নাহার গৃহিণী। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তামান্না বড়। স্থানীয় বড় মিশন স্কুলে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। এরপর বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি। মা-বাবার খুবই আদরের মেয়েটি জেদ করে ঢাকায় গিয়ে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে ভর্তি হলেন খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগে। ২০০০ সালে সেখান থেকে স্নাতকোত্তর হন। পড়া চলাকালেই তামান্না অভিজ্ঞতা নিতে আদ্-দ্বীনের প্রধান কার্যালয়ে বেশ কিছুদিন চাকরি করেছেন। ২০০০ সালেই তিনি ফিলিপাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন। পুষ্টিবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি তিনি এমপিএইচ (মাস্টার ইন পাবলিক হেলথ) ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল—বাংলাদেশের প্রবীণদের পুষ্টিমান। তামান্না বললেন, ‘আমি কুমিল্লার মতলবে ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ ব্যক্তিদের পুষ্টি নিয়ে গবেষণা করি। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৭০ শতাংশ প্রবীণ ব্যক্তি পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। তাঁদের স্মৃতিশক্তি খুবই কম, ওজন কম, কর্মক্ষমতা কম এবং নানা রোগে আক্রান্ত। দেশে এর আগে প্রবীণ ব্যক্তিদের পুষ্টিমান নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি।’

 

কর্মবীর তামান্না

পিএইচডি শেষ করার পর ২০১০ সালে তামান্না আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গার’-এ যোগদান করেন। তিনি খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের উপপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করতে আসেন। লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল ছিল তাঁর কর্মস্থল। তিনি চরের মানুষের জীবনচিত্র দেখেছেন। যে নদীতে মলমূত্র ত্যাগ করছে, সেই নদীর পানিই মানুষকে পান করতে দেখেছেন।

 

রণাঙ্গনে তামান্না

২০১২ সালে তামান্নাকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গার’ নাইজেরিয়ায় বদলি করে। বোকো হারাম অধ্যুষিত এলাকাই ছিল তাঁর কর্মস্থল। তামান্না বলছিলেন, ‘এখানকার বেশির ভাগ নারী ও শিশু লিকলিকে। তাদের চোখ গর্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। বোকো হারাম অধ্যুষিত এলাকা বলে খাদ্য সংকটের পাশাপাশি তারা নির্ঘুম থাকে। মানুষদের দেখলে মনে হবে জীবন্ত কঙ্কাল। গম আর ভুট্টার এক ধরনের গোল দলা ছাড়া কোনো খাবার নেই। গাড়িতে করেই আবুজা থেকে ইয়োবে (আমার কর্মস্থল) যেতে হতো। বিমানে ওঠা নিষেধ। কেননা বিমান সব সময়ই জঙ্গিদের  টার্গেট। ৩০টি চেকপোস্ট পেরিয়ে আমাকে কর্মস্থলে যেতে হতো। প্রতিটি চেকপোস্টে কড়া তল্লাশি। চেকপোস্টগুলোতেও ভয়ে ভয়ে থাকতে হতো। কারণ সরকারি এই চেকপোস্টগুলোও জঙ্গিদের টার্গেট। আমি ভয়কে অগ্রাহ্য করে গর্ভবতী মায়েদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। তাঁদের পুষ্টির ওষুধ খাইয়েছি। এক দিনের কথা মনে হলে এখনো গা শিউরে ওঠে। আমার গাড়ি ছুটছে। হঠাৎই ড্রাইভার সালেহ এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে আরেক হাতে আমার মাথা নিচু করে চেপে ধরল। শুনতে পেলাম মেশিনগানের গুলি। সালেহ বিমান চলার গতিতে গাড়ি ব্যাক করা শুরু করল। অনেকক্ষণ পর সে আমাকে বলল, ‘আপনি মাথা উঁচু করেন, আপনি এখন সেইফ।’

এরপর তামান্নার কর্মস্থল হয় তালেবান অধ্যুষিত আফগানিস্তানে। সেখানে তিনি হেড অব মিশন হিসেবে কাজ করেছেন। এক বছরের মধ্যে ১১ মাসই তাঁকে শক্তপোক্ত দেয়ালঘেরা ঘর আর বাংকারে থাকতে হয়েছে।  বাড়ির পাশে বোমা পড়েছে, কিন্তু তামান্না কাজ চালিয়ে গেছেন। ২০১৫ সালে আইরিশ উন্নয়ন সংস্থা ‘গোল’-এ যোগ দেন। তাঁর কর্মস্থল ছিল সিরিয়ার সীমান্তবর্তী তুরস্কের গাজিয়ান্টাপ। সেখান থেকে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় খাদ্যসামগ্রী পাঠানোর কাজ সমন্বয় করতেন। ২০১৮ সালে তামান্না ইথিওপিয়ায় কাজ করেছেন। সাদা পতাকা উড়িয়ে বুভুক্ষু মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাইয়ে শক্তসামর্থ্য করেছেন। এখানেও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে তাঁকে অচেনা-অজানা গ্রামে রাত কাটাতে হয়েছে।

 

তামান্না এখন এশিয়া অঞ্চলের প্রধান

চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে তামান্না এশিয়া অঞ্চলের ‘রিজিওনাল অ্যাডভাইজার’ হিসেবে জার্মান সংস্থা ‘ভেলথহুঙ্কার হিলফে’তে যোগদান করেন। তিনি বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমার, ভারত, উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান ও তাজিকিস্তানে সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন। এখন তাজিকিস্তানের পাহাড়ি অঞ্চলে পুষ্টিসমৃদ্ধ শস্য আবাদ করছেন। তামান্না বললেন, ‘সমতল থেকে সাড়ে সাত হাজার ফুট ওপরে আমরা নতুন কৃষি বিপ্লব শুরু করেছি। এখানে এতকাল ধরে আলু আর পেঁয়াজ ছাড়া কোনো শস্য ফলেনি। আমরা সহস্রাধিক মানুষকে শসা, টমেটো, সবুজ শাকসবজির বীজ দিয়েছি। পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায় এসব ফসল আবাদ করা শিখিয়েছি।’

তামান্না আরো বললেন, ‘এসব অসহায় মানুষের সেবা করার জন্যই আমি বিয়ে করিনি। আমার স্বপ্ন আছে, বাংলাদেশে এসে পুষ্টিসমৃদ্ধ কৃষি নিয়ে কাজ করার। এ বিষয়ে দেশে কোনো কাজ হচ্ছে না। এক বিভাগের সঙ্গে আরেক বিভাগের কোনো সমন্বয় নেই। আমি বিশ্বাস করি, এই কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশ বদলে যেতে পারে। মানুষ নীরোগ হতে পারে, মানুষের আয়ু বেড়ে যেতে পারে।’ তামান্নার বাবা গোলাম ফারুক একজন ব্যবসায়ী। সমাজসেবাও করেন। তিনি বললেন, ‘আমার মেয়েটি এখন যুদ্ধক্ষেত্রে আর্তমানবতার কাজে অংশ নিচ্ছে। তাতে আমার বুক ভরে যায়।’ তামান্নার মা বললেন, ‘মেয়ে বাড়ি ফিরলে আমি ওকে পাশে বসিয়ে শুধু গল্প শুনি। আমাদের গল্প শেষ হয় না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা