kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

হয়ে ওঠার গান

বিপ্লবের গল্প বলি

জাতীয় দলে আমিনুল ইসলাম বিপ্লবের অভিষেক সদ্য সমাপ্ত ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজে। প্রথম ম্যাচেই নজর কেড়েছেন। বাবা আবদুল কুদ্দুস ও মা মাহমুদা বেগমের কাছে বিপ্লবের বেড়ে ওঠার গল্প শুনে এসেছেন পাঠান সোহাগ

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিপ্লবের গল্প বলি

ডান থেকে আব্দুল কুদ্দুস, বড় ছেলে বাবলু, মাহমুদা বেগম ও বিপ্লব

কিশোর বেলায় আবদুল কুদ্দুস ফুটবল খেলতেন, ভলিবলও। স্বপ্ন দেখতেন, ছেলে সন্তান হলে তাকে বড় খেলোয়াড় বানাবেন। ১৮ বছর বয়সে কুদ্দুস বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। দুটি মেয়ে হওয়ার পর কুদ্দুস ও মাহমুদার দুটি ছেলে হয়। তারপর আরো একটি মেয়ে। বিপ্লব তাঁদের মধ্যে চতুর্থ। ২০০১ সালে জন্ম। কুদ্দুস পেশায় অটোরিকশা চালক। পরিবার নিয়ে ঢাকাতেই বসবাস করেন। তবে তাঁর একার আয়ের সংসারের অভাব মিটছিল না। তাই বিপ্লবের মায়ের জামা-কাপড় সেলাই করে কিছু বাড়তি আয়ের চেষ্টা ছিল।

 

বাবার ইচ্ছা, ছেলের নেশা

আব্দুল কুদ্দুস বড় ছেলেকে ভর্তি করিয়ে দেন একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসায়। আর ছোট ছেলে বিপ্লব ছোটবেলা থেকেই পাড়ার অলিতে গলিতে, খেলার মাঠে টেনিস বল ও ব্যাট নিয়ে ছুটত। খেলতে খেলতে খাওয়াদাওয়ার কথাও ভুলে যেত। কোনো কোনো দিন সন্ধ্যার পরে তাঁকে খুঁজে আনতে হতো। আব্দুল কুদ্দুস স্বপ্ন দেখতেন, বিপ্লব একদিন জাতীয় দলে খেলবে।

 

যেভাবে এগিয়ে গেলেন

সাত বছর বয়সে বিপ্লবকে আব্দুল কুদ্দুস ভর্তি করিয়ে দেন ঢাকা ক্রিকেট একাডেমিতে। সেখানে এক বছর প্রশিক্ষণ নেয়। পরে  খিলগাঁও পল্লীমা ক্রীড়া সংসদে শেখেন দুই বছর। এরপর চলে যান ধানমণ্ডিতে কোচ ওয়াহিদুল হক গণির কাছে। এভাবে একসময় বিকেএসপিতে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যান। ২০১২ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়া বিপ্লব ধীরে ধীরে বয়সভিত্তিক নানা ধাপ পেরিয়ে সুযোগ পান বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একসময় বাংলাদেশ ‘এ’ দলেও জায়গা মেলে তাঁর। ‘এ’ দলের হয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর ভারত যাওয়ার কথা ছিল বিপ্লবের। কিন্তু ১৫ তারিখ রাতেই জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার সুখবরটা পেয়ে যান। এই খুশির খবরে বিপ্লবের বাবা-মায়ের চোখে জল চলে আসে। ১৮ তারিখে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেকও হয়ে যায়। সেদিন চার ওভারে ১৮ রান দিয়ে দুই উইকেট তুলে নেন বিপ্লব।

 

বিপ্লবের পড়াশোনা

মেরাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন। এরপর ঢাকা মডার্ন পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। তারপরের ঠিকানা বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)। এখান থেকেই ২০১৬ সালে এসএসসি এবং ২০১৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। বর্তমানে বিকেএসপিতে অনার্স পড়ছেন।

 

বাবার যত আক্ষেপ, তত আনন্দ

সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা; তবু আব্দুল কুদ্দুসের শখ ছিল ছেলেকে বড় খেলোয়াড় বানাবেন। এ নিয়ে করতে হয়েছে কত যুদ্ধ। আব্দুল কুদ্দুস বললেন, যেদিন বিকেএসপির বাছাই পর্ব শুরু হবে সেদিন আবার বিশ্ব ইস্তেমার আখেরি মোনাজাত ছিল। আগে থেকে জানতাম, ওই দিন সকালে রাস্তা বন্ধ থাকবে। তাই রাত ১টার দিকে বাসা থেকে রওনা দিলাম। বিকেএসপিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভোর ৪টার মতো বেজে গেল। বিপ্লব আর তার একবন্ধু ছিল গাড়িতে। তারা গাড়িতে ঘুমিয়েছে, আমি পাহারা দিয়েছি। যা হোক, প্রথমবারেই বিকেএসপিতে চান্স পেল বিপ্লব। কিছুদিন পর ভর্তির জন্য নিয়ে গেলাম। আমি অশিক্ষিত লোক, সিএনজি চালাই। তেমন কিছু বুুঝি না। কাগজপত্র সব জোগাড় করতে পারিনি। দুশ্চিন্তায় একসময় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম। সেবার বিকেএসপির লোকজন অনেক সহযোগিতা করেছে। ভর্তির পর বিপ্লবকে বরিশালে পাঠানো হলো দুই মাসের জন্য। সেখানে থাকতে হবে। যে টাকা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম, সব শেষ। আসার সময় খাবার কেনার মতো টাকা ছিল না। লঞ্চের ডেকে পেপার বিছিয়ে ঘুমিয়েছি। আরেকবার ওকে নিয়ে দিনাজপুর যেতে হয়েছে। সেখানেও একই অবস্থা। ফেরার পথে বাস ভাড়া নেই। পরে ট্রেনে সারা পথ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঢাকা এলাম। এখন ওর খেলা যখন টিভিতে দেখি, তখন সব কষ্ট ভুলে যাই।

 

মায়ের কথা

‘খেলাধুলার জন্য বাড়ি ফিরতে দেরি করত। মাঝেমধ্যে ওকে খুঁজে আনতে যেতাম। সময়মতো নাওয়া-খাওয়ার বালাই ছিল না। একদিন রাগে ভাতের চামচ দিয়েও মেরেছি। এসব ক্ষেত্রে ও কোনো কথা বলত না। বিপ্লব খুব শান্ত ছেলে। আমাদের অভাবের সংসার। প্রতিদিন ভালো খাবার জুটত না। এ নিয়েও কোনো অভিযোগ ছিল না তার। অবশ্য আমার হাতের কাচ্চি বিরিয়ানি খেতে খুব পছন্দ করে বিপ্লব।

বিকেএসপিতে পড়ার সময় মাঝেমধ্যে টাকার জন্য ফোন করত—ব্যাট লাগবে, প্যাড কিনতে পাঁচ হাজার টাকা লাগবে ইত্যাদি। তখন আসলে আমার কাছে কোনো টাকা থাকত না। ছেলেটাকে তো আর না করতে পারি না। ধার-দেনা করে দিতাম। এই টাকা ধার চেয়ে অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কেউ দিতে চাইত না। পরে সুদের ওপর নিয়েছি। এখনো ধার-দেনা আছে। ও দেশের জন্য খেলবে, ভালো কিছু করবে—এটাই আমাদের চাওয়া। এখন আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায়।’ বলছিলেন মাহমুদা বেগম।

 

ছবি :

মীর ফরিদ ও সংগ্রহ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা