kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

মোয়াজ্জেমের উপহার

গ্রামবাসীর দুরবস্থা দেখে মন খারাপ হয়ে যেত। অবসরের পর পাওয়া সব টাকা দিয়ে তাদের জন্য একটি অনন্য উদ্যোগ নিয়েছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। দেখে এসেছেন অরণ্য ইমতিয়াজ

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মোয়াজ্জেমের উপহার

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের কদিম হামজানী গ্রামে বাড়ি মোয়াজ্জেম হোসেনের। দুই ছেলে, এক মেয়ের জনক তিনি। ছেলে-মেয়েরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত। বড় ছেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক চিকিৎসক। ছোট ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। মেয়েরও বিয়ে দিয়েছেন। মোয়াজ্জেম চাকরি করতেন সড়ক ও জনপথ বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে। চাকরিসূত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। ফলে গ্রামের বাড়িতে খুব একটা থাকা হয়নি। ২০০৮ সালে অবসরে যান। এরপর ফিরে যান গ্রামে। ভাবলেন শেষ বয়সে গ্রামেই কাটাবেন। গাঁয়ের মানুষের জন্য কিছু একটা করবেন।

 

দাওয়াত খেতে গিয়ে

একদিন এক প্রতিবেশীর বাড়িতে গেলেন বিয়ের দাওয়াতে। গিয়ে দেখলেন, উঠানের একপাশে গোয়ালঘর। তার পাশেই লোকজনের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ রকম আরেক বাড়িতে দাওয়াত খেতে  গিয়ে দেখেন, ছোট ছোট কয়েকটি ঘরের মাঝখানে অল্প একটু খোলা জায়গা। সেই জায়গায় প্যান্ডেল করে খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ঘটনা দুটি মোয়াজ্জেমকে ভাবিয়ে তোলে। ভাবলেন, কী করা যায়। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তা ছাড়া আশপাশে কোনো কমিউনিটি সেন্টারও নেই। ঠিক করলেন গ্রামবাসীর জন্য কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করবেন। যেখানে গ্রামবাসী সুন্দর পরিবেশে বিয়ে থেকে শুরু করে সব ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারবে এবং সেটা একেবারেই বিনা মূল্যে। কদিম হামজানী গ্রামে মোয়াজ্জেমদের একটি টিনের ঘর ছিল। সেটি ভাঙলেন। অবসরের পর ১০ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পেয়েছিলেন, আর জিপি ফান্ডের প্রায় আট লাখ টাকা দিয়ে নির্মাণ করেন তিনতলা ভবন। ২০১১ সালের দিকে প্রথমে পুকুর খনন শুরু করেন। পুকুর খনন শেষ হলে শুরু করেন ভবন নির্মাণকাজ। মোট ১৪০ শতাংশ জমিজুড়ে মোয়াজ্জেমের কমিউনিটি সেন্টার। ভবনের পাশাপাশি গ্রামবাসীর গোসলের জন্য পুকুর খনন করেন। শানবাঁধানো ঘাটও আছে সেখানে। 

 

নাম দিলেন বৈশাখী

২০১৮ সালে ভবন নির্মাণকাজ শেষ হয়। ভবনের নাম দেন বৈশাখী। ভবনটির নিচতলায় চালু করা হয় কমিউনিটি সেন্টার। বৈশাখ মাসে এখানে বিশাল পরিসরে মেলার আয়োজন করা হয়। গ্রামবাসী অংশ নেয় তাতে। ভবনের সামনে দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান। নানা জাতের ফুল সুবাস ছড়াচ্ছে সেখানে।

তিন হাজার ৩০০ বর্গফুট কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে খোলা জায়গা রয়েছে। এক পাশে স্থায়ী মঞ্চ করা হয়েছে। সেখানে সাংস্কৃতিক অনুুষ্ঠানের ব্যবস্থাও আছে। মঞ্চের এক পাশে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও ওয়াশরুম। কমিউনিটি সেন্টারে লাইট, ফ্যান এবং পানির ব্যবস্থা রয়েছে। ভবনে প্রবেশের পথে প্রধান ফটকের আগেও খোলা জায়গা। সেখানেই মেলার আয়োজন করা হয়। তার পাশে আছে উন্মুক্ত মঞ্চ এবং শহীদ মিনার। সেখানে নাটকসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শিশুদের খেলাধুলার স্লিপার, দোলনার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। গ্রামের যে কেউ বিনা মূল্যে এসব ব্যবহার করতে পারে। এসব করতে গিয়ে স্ত্রীর আড়াই ভরি গয়না বিক্রি করা হয়েছে বলে জানালেন মোয়াজ্জেম হোসেন। তাঁর স্ত্রী আফরোজা আজিজ বললেন, ‘আমি হাসিমুখেই গয়না দিয়েছি। তিনি (মোয়াজ্জেম) উদ্যোগ নিয়েছেন গ্রামবাসীর জন্য কিছু করতে। আমি তাতে খুশিই হয়েছি।’ বৈশাখী কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পর্কে মোয়াজ্জেম হোসেন একটি ঘটনার কথা বলেন, ‘বছর দুই আগে গ্রামের এক দরিদ্র হিন্দু লোকের মেয়ের বিয়েতে অনেক দূর থেকে বরপক্ষ আসে। কিন্তু অতগুলো মানুষের বসার জায়গা ছিল না তাঁর বাড়িতে। মাত্র কয়েক দিন আগে কমিউনিটি সেন্টারের কাজ শেষ করেছি। তখন ওই লোককে ডেকে বললাম, তোমার মেহমানদের আমার এখানে নিয়ে এসো। আমার এই কমিউনিটি সেন্টারে তোমার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করো। ওরা এলো। দুদিন ধরে চলল সেই বিয়ের অনুষ্ঠান। ঢাক আর বাজনার শব্দে গ্রামের অনেক মানুষ সেখানে ভিড় জমিয়েছিল। তাদের সেই আনন্দ দেখে আমার হৃদয়টা ভরে গিয়েছিল।’

 

হাসপাতালও করতে চান

গ্রামবাসীর সুচিকিৎসার জন্য মোয়াজ্জেম হোসেনের বড় ছেলে ডা. এইচ এম তারেক প্রতি শুক্রবার সকাল ১১টা পর্যন্ত বৈশাখী ভবনে বসেন। প্রথম দিকে ৮০ থেকে ৯০ জন রোগী আসত চিকিৎসা নিতে। একসময় দেখা যায় ফ্রি চিকিৎসা পেয়ে রোগী না হয়েও অনেকে ভিড় করেন। পরে বাধ্য হয়ে ১০০ টাকার টোকেন ফি নির্ধারণ করা হয়। এখন প্রতি শুক্রবার গড়ে ৪০ জন রোগী দেখেন।

এখন বৈশাখী ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় হাসপাতাল করার স্বপ্ন মোয়াজ্জেম হোসেনের। সে জন্য এই দুটি তলায় মোট ২০টি ছোট-বড় কক্ষও করা হয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল চালু করতে যে পরিমাণ অর্থের দরকার তা নেই মোয়াজ্জেমের। তিনি বলেন, আমার কাছে যে অর্থ ছিল তা দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করেছি। এখন হাসপাতালের জোগান দেওয়া আমার একার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ছেলেদের সঙ্গে কথা হয়েছে। বড় ছেলে বলেছে, হাসপাতালের জন্য যন্ত্রপাতি কিনতেই প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা লাগবে। আমার বাড়িসহ অবশিষ্ট সম্পদ বিক্রি করলেও ওই পরিমাণ টাকা হবে না। ভবিষ্যতে ছেলেরা মিলে অথবা সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো অনুদান পেলেই স্বপ্নটা পূরণ হবে।

 

গ্রামবাসীও খুশি

গ্রামের মানুষও খুশি মোয়াজ্জেম হোসেনের কাজে। গ্রামবাসীর কাছে মোয়াজ্জেম হোসেন একজন উপকারী মানুষ হিসেবে পরিচিত। মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, যা করেছি পৈতৃক এবং নিজের জমি বিক্রি করে করেছি। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? জমি দিয়ে কী করব? মারা গেলে তো এসব সঙ্গে নিয়ে যেতে পারব না। পৃথিবীতে এসেছি খালি হাতে, যেতেও হবে খালি হাতে। তিনি আরো বলেন, আমি গ্রাম ভালোবাসি। যে কয়টা দিন বাঁচব গ্রামের মানুষের সঙ্গে থেকে তাদের খেদমত করে যাব। নিজের জন্য চাওয়ার আর কিছু নেই। আমার ছেলে-মেয়েরা প্রতিষ্ঠিত। তাদেরও বলেছি, চাকরি জীবন শেষে গ্রামে ফিরে আসতে। অবসর জীবনে গ্রামে থেকে গ্রামবাসীদের জন্য কাজ করতে।

ছবি : লেখক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা