kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

খুঁজে ফেরা

কলকাতার স্কটিশ সিমেট্রি

ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা। অনেক দেশের অনেক রকম লোক তখন ভিড় করেছিল কলকাতায়। এসেছিল স্কটল্যান্ডের লোকেরাও। আলাদা গোরস্তানও তৈরি হয়েছিল স্কটিশদের জন্য। দেখে এসেছেন জিয়াউদ্দিন চৌধূরী

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কলকাতার স্কটিশ সিমেট্রি

ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে নানা জাতি এসে আস্তানা গেড়েছিল ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। যেমন—গোয়ায় পর্তুগিজ, শ্রীরামপুরে ড্যানিশ, পণ্ডিচেরি আর চন্দননগরে ফরাসি আর চুঁচুড়ায় ডাচরা। এসেছিল স্কটিশরাও। মূলত ইংরেজদের সহযোগী ছিল তারা। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসনামলে যেমন স্কটিশ মিশনারি আলেকজান্ডার ডাফ কলকাতায় এসেছিলেন ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে। তিনি স্কটিশ চার্চ স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। ব্রিটিশ ভারতে সেনাবাহিনীর সদস্যও ছিল অনেক স্কটিশ। ব্যবসা করতেও এসেছিল অনেকে। বেশির ভাগই হাজির হয়েছিল কলকাতায়। কারণ কলকাতা তখন রাজধানী। তাদের জন্য চার্চও তৈরি হয়েছিল। ডালহৌসির সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ যেমন স্কটিশ চার্চ। এই চার্চের অধীন স্কটিশদের জন্য আলাদা গোরস্তান তৈরি হয় ১৮২০ সালে।

 

চল্লিশের পর চুপচাপ

সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্টিকে ডান দিকে রেখে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বোস রোডের উল্টো দিকে গেছে কড়েয়া রোড। এখানেই উঁচু পাচিল ঘেরা স্কটিশ সিমেট্রি। প্রায় ছয় একর জায়গাজুড়ে এই কবরস্থান। গেট দিয়ে ঢোকার পর দেখা যায় সবুজ ঘাসের জঙ্গলের মধ্য থেকে মাথা বের করে আছে শত শত কবর ফলক। কোনো কোনো কবরের ওপরের মার্বেল বা গ্রানাইট পাথর তো স্কটল্যান্ড থেকেই আনা হয়েছিল। ১৯৪০ সালের পর থেকে কবরস্থানটি আর ব্যবহৃত হয়নি। দিন দিন আগাছার জঙ্গলে ঢাকা পড়ে যায় স্কটিশ চার্চ। তারপর ২০০৮ সালে তখনকার রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী ও সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রায় ছয় দশক পরে গোরস্তানের সংস্কার শুরু হয়। প্রতিষ্ঠা করা হয় দ্য কলকাতা স্কটিশ হেরিটেজ ট্রাস্ট। এরই মধ্যে ইউকে ইন্ডিয়া এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ এবং প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে অধ্যাপক শৌভিক মুখোপাধ্যায় ও তাঁর সহযোগীরা তৈরি করেছেন গোরস্তানের একটি ডিজিটাল আর্কাইভ। কবরস্থানটি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে স্কটল্যান্ডবাসীরও। বছর কয় আগে লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পল জায়গাটি ঘুরে গেছেন। এসেছিল এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়েরও একটি প্রতিনিধিদল। অনেকে আবার পূর্বপুরুষদের টানে জায়গাটি দেখতে এসেছেন।

১৯৩০ সালে দেখা গেছে টাটা বাদ দিয়ে ভারতের চারটি শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর সবাই স্কটিশ। এদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল চার শর বেশি। এ ছাড়া ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম, কংগ্রেসের অন্যতম সভাপতি উইলিয়াম ওয়েডারবার্ন, ডিরোজিওর শিক্ষক ডেভিড ড্রামন্ড এবং শিক্ষাবিদ ডেভিড হেয়ার প্রমুখ ছিলেন স্কটিশ। স্কটিশদের এই গোরস্তানে শায়িত আছেন কয়েকজন বাঙালিও। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—মহেন্দ্রলাল বসাক, কৈলাশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং লালবিহারী দে। আরো রয়েছেন ডাক্তার দ্বারকানাথ বসু এবং তাঁর স্ত্রী দুর্গামণি। উল্লেখ্য, এই বাঙালিদের সবাই ছিলেন ধর্মান্তরিত। স্কটিশদের ফ্রি চার্চ মিশনের মাধ্যমে তাঁরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

 

ডান্ডি থেকেই এসেছিলেন বেশি

কলকাতায় আসা স্কটিশদের অনেকেই এসেছিলেন স্কটল্যান্ডের ডান্ডি থেকে। হুগলি বা শ্রীরামপুরের জুটমিলে কাজ করতেন তাঁরা। ১৮৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনিভার্সিটি অব ডান্ডির আর্কাইভে এ খবর পাওয়া যাচ্ছে। আর সমাধি ফলক থেকে জানা যায় স্কটল্যান্ডের পেইস্লে, ব্রাউটিফেরি, মাদারল্যান্ডশায়ার, ফাইফ, ক্যামবেলটাউন থেকেও অনেক স্কটিশ এসেছিলেন। পাট ছাড়াও চা আর নীল চাষ, চীন থেকে আফিম আনা ইত্যাদি কাজে তাঁরা যুক্ত ছিলেন। দেশ থেকে স্ত্রী আর সন্তানদেরও নিয়ে এসেছিলেন কেউ কেউ। সমাধি ফলক থেকে আরো জানা যায়, এঁদের অনেকের জীবনই ছিল সংক্ষিপ্ত। মৃত্যুর কারণ হিসেবে ম্যালেরিয়া, জ্বর, পেটের অসুখ ইত্যাদি দায়ী। বেলে পাথর, গ্রানাইট, অ্যাবার্ডিন গ্রানাইট দিয়ে তৈরি সমাধি ফলকগুলো অযত্নে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ইট আর সুরকির তৈরি সমাধিগুলোও ঢাকা পড়েছিল আগাছার জঙ্গলে। ফলকের ওপর খোদাই করা হরফগুলো হারিয়ে যাচ্ছিল। এখন সংস্কারের কাজ এগোচ্ছে দ্রুত গতিতে। সংস্কারকাজে সহায়তাদানকারী গবেষকদল এসেছে স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ইউনিভার্সিটি থেকে। তাঁদের সঙ্গে আছে—যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি, লরেটো কলেজ, ওমদয়াল এবং ডেনমার্কের আরহাস স্কুল অব আর্কিটেকচারের শিক্ষার্থীরা।

 

যাঁরা এখানে শায়িত আছেন

রয়াল কমিশন অব এনশিয়েন্ট অ্যান্ড হিস্টোরিক মনুমেন্টস ফর স্কটল্যান্ড, কলকাতা স্কটিশ হেরিটেজ ট্রাস্ট এবং সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ কর্তৃপক্ষ সমাধিগুলোর পুনর্নির্মাণ ও সিমেট্রির সৌন্দর্য তৈরিতে নিয়োগ দিয়েছে স্থপতি, কনজারভেশন কন্ট্রাক্টর, আরবান ডিজাইনার, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, মেটেরিয়াল রিসার্চার এবং উদ্যান বিশেষজ্ঞ। এখন পর্যন্ত এক হাজার ৭৮৩টি কবর খুঁজে বের করে নতুন করে গড়া হয়েছে। বাকি আছে আরো দুই থেকে তিন হাজার সমাধি। এখানে যাঁরা শায়িত আছেন তাঁদের মধ্যে নাম করতে হয় ইমাস জোনসের। উত্তর-পূর্ব ভারতে মিশনারি কার্যক্রম শুরু করেছিলেন তিনি। তিনি খাসি বর্ণমালা রোমান হরফে লেখার প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। খাসি ভাষা নিয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। তাঁর নামে মেঘালয়ের শিলংয়ে রয়েছে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেমন—ইমাস জোনস স্কুল অব মিশনস ও ইমাস জোনস সিনড কলেজ। ১৮৪৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। খাসি-জয়ন্তিয়া অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তাঁর কবরটির সংস্কার করা হয়েছে।

এখানে শায়িত আছেন জেমস কিড। তিনি কলকাতা বোটানিক গার্ডেনের (এখন নাম হয়েছে আচার্য জগদীশ বসু ইন্ডিয়ান বোটানিক গার্ডেন) প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট কিডের আত্মীয়। আছেন জেন পেগ, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান কবি হেনরি পেগের মা। হেনরি পেগ ছিলেন ডিরোজিওর ভাবাদর্শে দীক্ষিত। বহু দেশাত্মবোধক কবিতা রচনা করেছেন। রয়েছেন বেশ কয়েকজন মিশনারি যেমন—জন ম্যাকডোনাল্ড, স্যামুয়েল চার্টারস ম্যাকফারসন, জন অ্যাডাম প্রমুখ। এঁদের মধ্যে জন অ্যাডাম বাংলা ভাষা শিখেছিলেন।

তিনি ভাবতেন যিশুখ্রিস্টই বাংলার গৌরাঙ্গ প্রভু। আরেকজন বিখ্যাত বাঙালিকে পাওয়া যায় স্কটিশদের ভিড়ে। যিনি স্কটিশ ফ্রি চার্চ মিশনের দ্বারা দীক্ষিত হয়ে ধর্ম পরিবর্তন করেন। তিনি রেভারেন্ড লালবিহারী দে (১৮২৪-১৮৯১)। আলেকজান্ডার ডাফের ছাত্র ও পরবর্তীকালে তাঁর সহকর্মী। লালবিহারী বাংলার উপকথার সংগ্রাহক, সংকলক ও অনুবাদক। কৃষক জীবন নিয়ে তাঁর বই গোবিন্দ সামন্ত খোদ চার্লস ডারউইনের প্রশংসা পেয়েছিল। রয়েছেন কর্তব্যরত অবস্থায় মাত্র ২৮ বছর বয়সে নিহত পুলিশ জেমস হুইটলে। এসব মানুষ এসেছিলেন সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার থেকে। কর্মব্যস্ত জীবন কাটিয়েছেন। সময়ের বুকে দাগ রেখে গেছেন। শেষে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন এই এখানে, কলকাতার স্কটিশ সিমেট্রিতে।

ছবি: লেখক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা