kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জামদানির ওস্তাদ

তিনপুরুষ ধরে জামদানি বোনেন সোনারগাঁর বড়গাঁওয়ের জামাল হোসেনরা। জামাল নিজেই কাজ করছেন প্রায় তিন দশক। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম পাখি জামদানি উইভিং ফ্যাক্টরি। কাজ করেন ৫০ জন তাঁতি। জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত জামদানি ফেস্টিভালে ‘শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী’ পুরস্কার পেয়েছেন জামাল হোসেন। তাঁর পথ চলার গল্প বলেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জামদানির ওস্তাদ

আমার বাবা মাহমদ আলী, মা হুলচেহারুন। ছোটবেলা থেকে দেখছি এই কাজ করতাছে হেরা। আমি হেগো লগে জোগাল দিছি। একটু সুতা ভইরা দিছি। সুতা শর্ট পড়লে বাবা কইত, এই সুতাটা আইনা দেও তো। বাজারতে (থেকে) আইনা দিছি। আবার কইত এই সুতাটা মাড়ে (ফেন ভাতের কাই) দিয়া আইয়ো। কোনো সময় আবার মাকুতে ভইরা দিছি। তাদের কাজে হেল (হেল্প) করছি আরকি। তবে বাবা চাইছিল আমি যেন স্কুলে যাই। পড়ালেহা কইরা বড় চারকিবারকি করি। কিন্তুক লেখাপড়া তেমন একটা ভালা লাগত না। স্কুল কামাই করতাম। পাড়া ঘুরতাম। একটু দরিদ্র পরিবার তো। খরচ জোগানও কষ্ট হইত। তাই বাবা-মাও বেশি জোরাজুরি করে নাই। ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ছি। আমরা দুই ভাই, চার বোন। আমি হইছি দ্বিতীয় নম্বর। লেখাপড়ায় যাই না দেইখ্যা পরে কাজে দিয়া দিছে। কইছে তাইলে কাজ করো। আমাদের পাশের গ্রাম কাজীপাড়ায় মামার বাড়ি। মামা বাবারে কইল, ভাগিনারে আমার কাছে দিয়া দেও। হেরে আমি শিখাই। মামা নিয়া কাজে বসাই দিছে। তারপরে কাজে আইসাও প্রথম প্রথম মনডারে পোষ মানাইতে পারতাম না।

প্রথম শিখাইছে বাইতের শানা (তাঁতযন্ত্রের চিরুনির মতো অংশ)। হিয়ার পরে বসাইয়া মুরো ভরা (পাটসোলায় সুতা ভরা) শিখাইত। মুরো ভরতে ভরতে পরে বসাইছে মাকু (তাঁত বোনার কাজে ব্যবহৃত এক ধরনের লোহার যন্ত্র) মারা শিখাইতে। মাকু মারা শিখাইলে পরে একটা-দু্ইডা করে বুটি শিখাইছে। বুটি শিখানোর পরে ঘাটান-মারান শিখাইছে। হের পরে কিলিয়ার হইছি। সব আমার ব্রেন্টে (মাথায়) ঢুকে গেছে।

যেসমকা কাজে বইছি সে সময় অনেক খারাপ লাগত। পাও ব্যথা করত। একসময় ভাবছি, না কাজই করতাম না। পালাইয়া বেড়ামু। পালাইয়া বেড়াছিলাম একসময় (হাসি)। পাড়াটা ঘুইরা বাসাত গেছিলাম। পরে সকালে আবার মামা ধইরা নিয়া আইছে। আবার কাজে বসানোর পর কান্নাকাটিও করছি। মনে বিরক্ত ভাব আইছে। কিন্তু বিরক্ত অইলেও পরে চিন্তাভাবনা করছি, না কাজটা করুম। ফাঁকি দিয়া তো লাভ নাই। কারণ কয়েকবার দেখলাম পালাইয়া গেলেও আবার ধইরা নিয়া আসে।

জামদানি কারিগরদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ মাকু মারা। (টানা সুতা দ্বারা ঝাঁপের সাহায্যে শেড তৈরি হওয়ার পর মাকুর মাধ্যমে পড়েন সুতাকে শেডের মধ্য দিয়ে তাঁতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নেওয়াকে পিকিং বা মাকু মারা বলে)। প্রথম প্রথম মাকু মারা পারতাম না। মাকু মারলে মাকু পইড়া যাইত। পইড়া গিয়া আবার পাও কানা (ছিদ্র) অইয়া যাইত। রক্ত বাইর হইত। মামা দুই-চাইরবার দেখাই দিত। পরে না পারলে থাবড়া (থাপ্পড়) দিত। একসময় বুঝলাম, শানাটার মইধ্যে বহাইয়া মাকুটা মাইরা দিলে মাকু ঠিকমতন হয়। জালা ধইরা ধইরা মামা কইত ‘মাকু মারো’। মারছি। মাকু ঠিকমতন মারা হইলে শাড়িটা আগাইত। এভাবে একসময় মাকু মারা শিখলাম। আগে একটা শাড়িতে তিন হাত মাকু মারত। একটু দামি শাড়ি হইলে দুই হাত। আরো বেশি দামি হইলে আধ হাত। কারণ দামি শাড়িতে ডিজাইন বেশি আর কম দামি শাড়িতে ফাঁকি বেশি। জামদানির কাজ শিখতে মোটামুটি দুই বছর লাগে। কিন্তু আমার ছয় মাসের বেশি লাগে নাই। ছয় মাস পরেই আমি ডাইনে বইসা গেছি। মানে কারিগর হইয়া গেছি। মামার ওইহানো চাইর বছর যাবৎ কাজ করছি। শাগরেদ হওয়ার পর মামা আমারে সাপ্তাহে ১২০ টাকা দিত। দুই বছর ধইরা ১২০ টাকা করে পাইছি। আমি ডাইনে বসার (কারিগর হওয়ার পর) পরে মামা অর্ধাঅর্ধি টাকা দিত। ধরেন একটা শাড়ি পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হইল। এখানে পাঁচ শ টাকার খরচা আছে। এর বাইরে বাকি টাকার অর্ধেক আমি পাইতাম। মনে করেন দুই হাজার, এক হাজার ৫০০, এক হাজার ৩০০, এক হাজার ৪০০, যেসুমে যা বিক্রি অইত আরকি। আমাগো ভাষায় এইটারে শরকি (ভাগাভাগি) বলে। মানে কাপড় যা বেচবা তার অর্ধেকটা কারিগরের। এই টাকা নিয়া নিজেও খরচ করতাম। সংসারেও জোগান দিতাম।

চাইর বছর পর বাড়ি চইল্যা আসছি। নিজে তাঁত বসাইছি। একজন তাঁঁতি নিছি। তারে সপ্তাহে দুই হাজার করে টাকা দিতে অইত। হেসুমকা দাম কম আছিল। তা-ও তাঁত বসাইতে পরায় পনরো-ষোলো হাজার টাকা খরচ হইছে। আমার ইনকাম করা টাকা আছিল আর মার কাছ থেইক্যা কিছু টাকা নিছি। কিছুদিন পরে ছোড ভাইরে শিখাইছি। পরে দুই ভাই একলগে কাজ করছি।

প্রথম প্রথম হাটে বিক্রি করতাম। ডেমরায় প্রতি শুক্কুরবারে ভোর রাইতে জামদানি হাট মিলত। সেখানে নিয়া যাইতাম। তখন একেকটা শাড়ি তিন হাজার, চাইর হাজার, পাঁচ হাজার টাকা বেচতাম। কিছুদিন পর ঢাকায় আসার চিন্তাভাবনা করি। আমার পাশে ফায়জুর নামে এক তাঁতি ছিল। হে টুকটাক ঢাকায় আসা-যাওয়া করত। একদিন হেরে কইলাম, ‘ভাই, আমারে একটু নিয়া যাইবা।’ একদিন হের লগে ঢাকায় আইলাম। হে আমারে বনানীতে রুবী গজনবী আপার অফিসে নিয়া গেল। উনারে বলছি, আমি তাঁতি । দুই-চাইরটা কাপড় দেখাইছি। উনি পছন্দ করছেন। পরে আমারে কইল—তুমি সুতা নিয়ে আইসো। আরেক দিন বাসা থেকে ভেজিটেবল ডাই কইরা সুতা নিয়া আইছি। সেগুলো দেখছেন। পরে ভিউ কার্ড দিয়া বলছেন, এই এই জিনিসগুলো দিয়া তুমি এই শাড়িটা কইরা লইয়া আইয়ো। দুই মাস পরে শাড়িটা বানাইয়া আইছি। দেইখ্যা রুবী আপা পছন্দ করছেন। বলছেন, ঠিক আছে, তুমি কাজ করো। এরপর থেকে নিয়মিত অর্ডার দেওয়া শুরু করছেন। এভাবে অরণ্যর সঙ্গে কাজ শুরু করলাম। প্রথমে সাতটা শাড়ি অর্ডার দিছিল। এগুলো কইরা দেওনের পর আরো বেশি অর্ডার পাইলাম। একসময় গুলশানে চীন ম্যাডাম নামে এক ম্যাডামের সঙ্গে পরিচয় অইল। সে-ও স্যাম্পল দিত। আমরা বানাইয়া দিতাম। একসময় তাঁর ব্যবসা বন্ধ অইয়া গেল। পরে টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের মুনিরা এমদাদ ম্যাডামের সঙ্গে যোগাযোগ হইল। আস্তে আস্তে টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির, অরণ্য, বি ক্রাফট, কুমুদিনী ও এনসিসিবিরে শাড়ি দেওয়া শুরু করলাম। এহন আমার ২৫টা তাঁত। ৫০ জন তাঁতি কাজ করে আমার লগে। একেকটা তাঁতিরে সপ্তাহে চার হাজার টাকা কইরা দিতে অয়। আমার জামদানির অবস্থাও এখন ভালা। কারণ আমি বুঝি, কোনটা করলে ভালা অইব, কোন ডিজাইনটা কাস্টমার পছন্দ করব। ওই জিনিসটা এহন মাথায় ঢুইক্যা গেছে।

আমরা প্রথমে সুতা কিনি। ডিজাইনটা দেখে বইলা দিতে পারি এই ডিজাইনে কত মোড়া (বান্ডিল) সুতা লাগবে। যদি দামি শাড়ি হয়, তাইলে চিকন সুতা কিনি। আর কম দামি হইলে মোডা সুতা। আগে ৪০ কাউন্টের সুতা দিয়া কাজ করতাম। এহন ২০০ কাউন্টের সুতা দিয়া কাম করি। অফহোয়াইট সুতারে ডাইং কইরা কালার করি। আগে সুতার মোড়া ছিল ৪০-৫০ টাকা। এখন সেটা ১২০ টাকা। সুতা নিয়া আইসা প্রথমে মাড় দিই। চরকির মইধ্যে চড়াইয়া মুরো ভইরতে হয়। এরপর মাকুর মাইধ্যে দিই। তারপর মাকু মারি। এভাবে শাড়ি বানানো শুরু হয়। জামদানিটা পুরোটা নিজের মেধা দিয়া বানাইতে হয়। এতে মেশিনের কোনো কাম নাই। হাতের, পায়ের আর চক্ষের কাম। আর স্মরণ শক্তিটা ঠিক রাখতে হয়। কারণ স্মরণশক্তি ঠিক না থাকলে ডিজাইন তোলা সম্ভব না। টানা বইসা বইসা কাজ করতে হয়। মাঝেমধ্যে পাও ব্যথা করে, পিঠ ব্যথা করে। ঝুঁকে থাকতে হয় বলে ঘাড় ব্যথা করে। কাজের ফাঁকে একটু ঘুইরা আসি। আবার বসি। একেকটা শাড়ি এক সপ্তাহে তো ধইরা এক বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। ডিজাইনের ওপর নির্ভর করে। টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের জন্য একটা শাড়ি করছি সেটা পরাই ৩২ সপ্তাহ লাগছে। এটা পরাই চার লাখ টাকার মতো দাম আইছে।

জামদানি কারিগররা ১০ ঘণ্টার নিচে কেউ কাজ করতে পারে না। আমি দিনে সর্বোচ্চ ১৬ ঘণ্টাও কাজ করছি। এটা আমার ধ্যান-জ্ঞান। আমার বানানো শাড়ি পইড়া প্রধানমন্ত্রী যখন দেশ-বিদেশে যান, সেমিনার করেন, তহন দেইখ্যা পরানডা জুরাইয়া যায়। এবার জাতীয় পাট দিবসে প্রধানমন্ত্রী আমার বোনা জামদানি পড়েছিলেন। পাটের সুতা দিয়া সেই শাড়ি বানাইছি। এক লাখ ২০ হাজার টাকা পাইছি দাম। বিদেশিরাও আমার বাড়ি গেছে, দেখছে। প্রশংসা করছে। শাড়ি কিনছে।

আমি আজীবন জামদানির কাজই কইরা যাইতে চাই। যে কেউ জামদানি দেখলে যেন বলতে পারে এইডা জামালের শাড়ি—আমি শুধু এই জিনিসটা চাই, আর কিছু না।                                ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা