kalerkantho

রবিবার। ১০ নভেম্বর ২০১৯। ২৫ কার্তিক ১৪২৬। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সাপের জন্য ভালোবাসা

সাপ শুনলেই কেউ লাঠি নিয়ে মারতে যান, কেউ বা দৌড়ে পালান। তবে মাহফুজ ব্যতিক্রম। সাপের জন্য তাঁর অনেক মায়া। এ পর্যন্ত ১০০ সাপ উদ্ধার করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে পড়েন মাহফুজুর রহমান। তাঁর সঙ্গে গল্প করে এসেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাপের জন্য ভালোবাসা

তখন মাহফুজ চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। একদিন প্রাইভেট পড়ে ফিরছিলেন। পথে ড্রেনের ওপর একটি সাপ পড়ে থাকতে দেখে বোতলে ভরে বাসায় নিয়ে এলেন। মা-বাবা দেখে অবাক। তাঁরা মাহফুজকে বোঝাতে চাইলেন, সাপ পোষা যায় না। একপর্যায়ে বাবা তাঁকে মারধরও করলেন। এ ঘটনার ১৫ দিন পর আরেকটি সাপ বাসায় নিয়ে আসেন মাহফুজ। বাবা অবশ্য সে সময় কিছু বলেননি। তারপর সাপুড়েদের সঙ্গে থেকে মাহফুজ প্রাথমিকভাবে সাপ ধরা শেখেন। পড়াশোনাও করেন সাপ নিয়ে।

 

প্রথম উদ্ধার

২০১৫ সাল। মাহফুজ পড়তেন সরকারি মাগুরা কলেজে। আড্ডা দিতেন গ্রন্থাগারের সামনে। একদিন দেখলেন, কোঁচ (এক ধরনের বর্শা) দিয়ে এক লোক একটা সাপকে আঘাত করল। ভাগ্য ভালো ছিল, সাপটি কোঁচের দুই লোহার মাঝে পড়ে। আহত সাপটিকে নিয়ে এসে চিকিৎসা করে ছেড়ে দেন মাহফুজ। এটিই ছিল তাঁর প্রথম সাপ উদ্ধার। আরেকবার প্রায় ৩০টি কোবরার বাচ্চা উদ্ধার করেন মাহফুজ। বলছিলেন, ‘আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মানুষ সাপ পিটিয়ে মেরে ফেলত। আমি উদ্ধারকাজ শুরু করার পর এখন আর মারে না; বরং আমাকে খবর দেয়। আমি সাপ ধরে এনে প্রকৃতিতে ছেড়ে দিই।’

 

দংশনও সয়েছেন

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের রুমে সাপ ঢুকেছে। মাহফুজকে খবর দেওয়া হলো। তিনি এসে সাপটি ধরলেন। যাওয়ার সময় একজন মোবাইল নাম্বার চাইল। নাম্বার দেওয়ার সময় হঠাৎ বুড়ো আঙুলে সাপ দাঁত বসিয়ে দেয়। সাপটি বিষধর ছিল না। মাহফুজ বলছিলেন, ‘২০১৯ সাল শুরু হয়েছিল কাল নাগিনীর ছোবল খেয়ে। সাপটা ধরেছিলাম মাগুরা থেকে। ছাড়ার সময় ছোবল বসিয়ে দেয়।’ আরেকবার একটা ছোট কুয়ায় একটি সাপ পড়ে থাকতে দেখে হাত দিয়ে তুলে আনেন মাহফুজ। ভেবেছিলেন নির্বিষ সাপ। কিন্তু পরে দেখেন বিষাক্ত কেউটে। কামড় দিলে বাঁচা সহজ ছিল না। তবে কামড় না খেয়ে সাপ উদ্ধার করতে পারাটাই একজন উদ্ধারকারীর সফলতা বলে মনে করেন মাহফুজ।

কথার শেষ নেই

মাহফুজ বলছিলেন, ‘সাপ নিয়ে অনেক কথা চালু আছে। যেমন—সাপ দুধ খায়। আসলে সাপের পরিপাকতন্ত্র দুধ হজম করতে পারে না। তাই সাপের দুধ খাওয়ার ব্যাপারটি অলীক কল্পনা। তারপর ফুলের গন্ধে সাপ আসে। ব্যথা দিলে বাসায় এসে কামড় দিয়ে যায় সাপ। সবই বানানো গল্প। তবে বশে আনতে সাপুড়েরা অনেক দিন সাপকে পানি না খাইয়ে রাখে। তারপর দুধে পানি দিয়ে খেতে দেয়। জীবন বাঁচাতে সাপ তা খেয়ে থাকে। আর মানুষকে চিনে রাখা সাপের পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। তাই ব্যথা দিলে ঘরে এসে কামড়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ফুলের গন্ধে আসলে মাছি, পোকা, টিকটিকি আসে। এগুলো খেতে ব্যাঙ আসে। ব্যাঙ খেতে সাপ আসতে পারে।’

 

দুঃখের কথা

সাপ খেলা আমাদের ঐতিহ্য বলে মনে করা হয়। অথচ এর নেপথ্যে বেদনা লুকিয়ে আছে। মাহফুজ জানালেন, বন্য গোখরা খুবই বদমেজাজি। বিষধর তো বটেই। সাপ খেলায় এই সাপটাকে সাদামাটা দেখায়, মানে এর মেজাজ দেখা যায় না। কারণ হলো সাপুড়েরা সাপের বিষদাঁত ভেঙে ফেলে। কিছুদিন পর আবার বিষদাঁত গজায় বলে ব্লেড দিয়ে বিষথলিই কেটে ফেলে দেওয়া হয়। অনেক সময় এতে সাপের ক্ষতস্থানে ঘা হয়। সাপ মারা যায়।

 

প্রয়োজন সচেতনতা

বাংলাদেশে প্রতিবছর ছয় থেকে সাত হাজার মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায়। অথচ বাংলাদেশে যে পরিমাণ সাপ আছে তার মাত্র ৩০ শতাংশের মতো বিষধর সাপ। আবার এর মধ্যে সাধারণত মানুষকে কামড়ায় পদ্ম গোখরা, খরিশ গোখরা, চন্দ্রবোড়ার মতো পাঁচ থেকে ছয় প্রকারের সাপ। মাহফুজ বললেন, ‘আমাদের দেশে দেখা যায় এমন সাপের মধ্যে ৭০ শতাংশই ক্ষতিকর নয়। মানুষ মারা যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো অ্যান্টিভেনমের অপ্রতুলতা। তার ওপর সাপে কামড়ালে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে মানুষ যায় ওঝার কাছে।’

 

সাপ পোষ মানে

ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই অবিষধর কিছু সাপ পোষার চল দেখা যায়। বল পাইথন যেমন দেখতে খুব সুন্দর। তারপর সবুজ পাইথন মানুষের অনেক ঘনিষ্ঠ হতে পারে। ম্যাক্সিকান ব্ল্যাক কিংও পুষতে দেখা যায়। স্যান্ড বোয়া সুন্দর ও নির্বিষ সাপ।

 

সেবার সহজ ছিল না

একবার একটি সাপ বর্জ্যের ট্যাংকের মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছিল। সবাই ছি ছি করছিল। কেউ এগোচ্ছিল না। কিন্তু মাহফুজের তো বুক ভরা মায়া। তিনি এগিয়ে গেলেন। হাতে পলিথিন পেঁচিয়ে সাপটিকে ধরে এনে প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলেন।

 

একটি সংগঠন গড়েছেন

ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ নামের একটি সংগঠন করেছেন মাহফুজ। এর সদস্যরা সাপ রেসকিউ করেন। সেই সঙ্গে পরিবেশ প্রকৃতি সুরক্ষার কথাও বলেন। সংগঠনটির ফেসবুক পেজে সদস্য সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সাপের জন্য একটি সুন্দর পার্ক চান মাহফুজ। যেখানে অ্যালবিনো পদ্ম গোখরাও থাকবে। অসম্ভব সুন্দর এই সাপটি খুব ভালো লাগে মাহফুজের।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা