kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

মহাবিশ্ব

সিনাই ট্রেইল

সাথিদের নিয়ে মুসা নবীর নিল নদ পার হওয়ার কথা ছেলে-বুড়ো সবারই জানা। কিন্তু এর পরের অংশ—বনি ইসরাইলরা যে পথে ফিলিস্তিন পৌঁছেছিলেন, সে পথের কথা জানেন না অনেকেই। ৫৫০ কিলোমিটার সে পথের দৈর্ঘ্য। পথের নাম সিনাই ট্রেইল। হেঁটেছিলেন বিবিসির ক্লোডাঘ কিনসালা। খবর দিচ্ছেন সৈয়দ আশফাকুল হাসান

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



সিনাই ট্রেইল

সিনাইয়ের কথা জানে ইহুদিরা, জানে খ্রিস্টানরা, জানে মুসলমানরা। মাউন্ট সিনাই বা তুর সিনিনের কথা এসেছে তিন ধর্মগ্রন্থেই। হজরত মুসা (আ.) পর্বতের ওপর আরোহণ করে তাওরাতপ্রাপ্ত হন। এই পাহাড়ের নামেই পুরো এলাকার নাম সিনাই।

মিসর আফ্রিকার দেশ হলেও সিনাই মরুর জায়গাটুকু এশিয়ায়। ভূমধ্যসাগর উত্তরে আর দক্ষিণে লোহিত সাগর। মাঝে এই মরুভূমি। আফ্রিকা আর এশিয়ার ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটারের সেতুবন্ধন। জনসংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। উত্তর ও দক্ষিণ সিনাই ছাড়া কিছু জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে সুয়েজ, ইসমাইলিয়া আর পোর্ট সাইদ কর্তৃপক্ষ।

সিনাই ট্রেইলের ৫৫০ কিলোমিটার পথ হেঁটে চলতে প্রায় ৪২ দিন সময় লাগে। গাড়ি নিয়েও ঘোরা যায় এ ট্রেইলে। তবে হেঁটে হেঁটে ঘুরতেই বেশি আনন্দ। সবচেয়ে ভালো ট্রেইলটি হলো নুয়েইবা থেকে শুরু করে ওয়াদিয়ে ওয়াতির মধ্য দিয়ে জাবাল মেলহিস দাহাব পেরিয়ে জাবাল-ই-সাবাহ হয়ে তুর বা সিনাইয়ের চূড়া পর্যন্ত। ২০১৫ সালে ১৪৩ কিলোমিটারের এই ট্রেইল উন্মুক্ত করা হয়।

সাধারণত ১৫-২০ জন নিয়ে একেকটি অভিযাত্রী দল তৈরি হয়। বেদুইনরা গাইড হিসেবে কাজ করে। গাইডের সংখ্যা নির্ভর করে দলের সদস্যসংখ্যার ওপর। সাধারণত ২০ জনের দলে তিন-চারজন গাইড থাকে।

এই পর্যটনশিল্পের সঙ্গে কমবেশি সব বেদুইন দল যুক্ত। মূল যাত্রাপথে তিনটি গোষ্ঠী নেতৃত্ব দেয়। সব মিলিয়ে আটটি গোষ্ঠী আছে এখানে—তারাবিন, মুযেইনা, জাবালিয়া, আউলাদ সাইদ, গারাশা, সোয়ালহা, হামাদা আর আলিগাত।

লোহিত সাগরের নিকটবর্তী শহর বিরসেইর থেকে উপকূলীয় পাহাড়ি রুক্ষ পথ ধরে ট্রেইলটি শুরু হয়। খোলা আকাশের নিচে চাঁদের আলোয় রাত যাপন করাটাই এখানকার বিশেষ আকর্ষণ। তবে সিনাইয়ের বড় আকর্ষণ নিশ্চয়ই এখানকার মানুষজন। বেদুইনের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি তারাবিনরা। তারপর আছে মুযেইনা ও জাবালিয়া গোত্র। যারা যে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে তাদের সেই গোত্রের গাইড নেওয়াটা বাধ্যতামূলক।

 

আমার এ পথ

সিনাইয়ে সকাল হয় আকাশে তারা থাকতেই। প্রথম রাত যাপন করেছিলাম প্রায় পাঁচ হাজার ২৪৮ ফুট উঁচুতে। পরদিন আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটা শুরু করেছিলাম। চার ঘণ্টা হাঁটার পর একটু ছায়া পেয়ে দুপুরের খাবার সারি। পনির, সালাদ, রুটি, তেল আর শরবত ছিল খাবারে। তারপর অল্প একটু ঘুমিয়ে নিয়েছিলাম। সূর্যটা একটু হেলে পড়লে আবার হাঁটা শুরু করি। সূর্য ডুবতে শুরু করলে সুবিধামতো এক জায়গায় উটের ওপর বয়ে নিয়ে আসা সরঞ্জাম দিয়ে তাঁবু খাটিয়েছিলাম। এর মধ্যে খাবারের ব্যবস্থাও হয়ে গিয়েছিল। খেয়েদেয়ে কিছু গল্পগুজব করে চলে গিয়েছিলাম ঘুমের দেশে। পরদিন ভোরের আলো তখন উঁকি মারছে। গাইডদের একজন জলদি চলো বলে তাড়া দিচ্ছিল। নাশতা পেলাম এলাচ-সুবাসিত কফি আর রুটি। তারপর পথ চলা। চলতে চলতে গল্প বলা। নানা রকমের গল্প। যেমন এক মানুষের নেকড়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল ইত্যাদি। কোন পাহাড়ের নাম কেমন করে এলো সে বিষয়েও গল্প জমেছিল। এ পথে চলতে চলতে বেদুইন মেয়েদের পশু চড়াতে দেখা যায়। একা বা দলেবলে। তাদের পা থেকে মাথা সবটাই কালো বোরকায় ঢাকা থাকে। পাহাড়ের গায়ের পেট্রোগ্লিফ (খোদাই চিত্র) দেখেও সময় পার হয় অনেকটা। এসব চিত্রকর্মে যদিও দিন-তারিখ উল্লেখ থাকে না, তবে গবেষকরা জানিয়েছেন ৬০০০ বছরের পুরনো পেট্রোগ্লিফও আছে। তাই যাঁরা ইতিহাসে আগ্রহী, সিনাই প্রান্তর তাঁদের জন্য দারুণ গবেষণাক্ষেত্র।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা