kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আজ আমরাও

সালমার ১৫ বছর

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সালমার ১৫ বছর

দেশের প্রথম নারী রেলচালক সালমা খাতুন। ২০০৪ সালে সহকারী লোকোমাস্টার হিসেবে রেলওয়েতে যোগ দিয়েছিলেন। তারপর কেটে গেছে ১৫ বছর। খবর নিয়েছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

 

সালমা অনার্সে ভর্তি হয়েছেন তখন। মেজো ভাই বললেন,  রেলওয়েতে লোক নিচ্ছে। তুমি আবেদন করো। আবেদন করার পর লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষায়ই উত্তীর্ণ হলেন সালমা। তবে ভাইভা বোর্ডের সবাই তাঁকে দেখে অবাক হয়েছিলেন। একজন প্রশ্নও করেছিলেন, ‘পারবে তো তুমি এই কাজ?’ সালমা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘পারব।’ ব্যতিক্রম কিছু করার ইচ্ছা তাঁর ছোটবেলা থেকেই। সহকারী লোকোমাস্টার হয়ে যোগ দেওয়ার পর ট্রেনচালক হিসেবে ট্রেনিং নিয়েছিলেন ৬৫ জন। তার মধ্যে সালমাই একমাত্র নারী। শুরুতেই তাঁকে সিগন্যাল, মেকানিক্যাল বিষয়ে দুই বছরের প্রশিক্ষণ নিতে হয়। চাকরির পাশাপাশি তিনি বিএড এবং এমএ শেষ করেছেন। তাঁর স্বামী ঢাকা জেলা দায়রা জজকোর্টের অফিস সহকারী। সালমা দুই কন্যাসন্তানের জননী। 

২০০৬ : ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম যাত্রা করেছিলেন সালমা খাতুন। রুট ছিল লাকসাম টু নোয়াখালী। একদিকে যেমন আনন্দ, অন্যদিকে কিছুটা ভয়ও ছিল। টেনশনে আগের রাতে ঘুমাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত কোনো রকম সমস্যা ছাড়াই প্রথম ট্রেনযাত্রা শেষ করেছিলেন সালমা। পরদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালী থেকে ট্রেন নিয়ে ফিরছিলেন সালমা। একজন নারী ট্রেন চালাচ্ছেন—জানাজানি হয়ে যাওয়ায় প্রতিটি স্টেশনেই অনেক মানুষ ভিড় করেছিল। এক স্টেশনে এক বয়স্ক মহিলা এগিয়ে এসে বলেছিলেন, ‘মা, জানালা খোলো। আমরা তোমাকে দেখতে চাই।’

২০০৮ : ছোট্ট একটা বিপদে পড়েছিলেন। মাথার ওপর  একটা ফ্যান ছিল। খেয়াল করেননি। কেমন করে যেন চুল বেঁধে যায়। খুব ব্যথা পেয়েছিলেন।

২০০৯ : একটি ঘটনা আজও মনে আছে সালমার। তখন ভরসন্ধ্যা। ডিউটিতে ছিলেন। চারটা ছেলে এসে তাঁকে ঘিরে ধরল। জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে কী করেন?’ তখন ধারে-কাছে অন্য কেউ ছিল না। ছেলেগুলোর হাবভাব ভালো মনে হচ্ছিল না। সালমা সাহস করে বলেন, ‘তোমরা চলে যাও এখান থেকে। আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি।’ পরে ছেলেগুলো চলে যায়।

২০১১ : আরটিভি সালমাকে পুরস্কৃত করে। 

২০১২ : সালমার স্বামীর নাম হাফিজউদ্দীন। সব সময় ছায়ার মতোই তিনি সালমাকে আগলে রাখেন। ২০১২ সালের একটি ঘটনা। কাজ শেষ করতে করতে রাত ১টা বেজে গিয়েছিল। স্বামী এসে তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। খেতে বসে জানলেন, তিনিও (স্বামী) তখনো রাতের খাবার খাননি। শেষ রাতে ডিউটি থাকলে স্বামী তাঁকে কাজের জায়গায় দিয়ে আসেন।

২০১৩ : একদিনের ঘটনা। সালমা ট্রেন থামিয়ে বসেছিলেন। হঠাৎ দেখেন, একদল অল্প বয়সী মেয়ে তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। তারা বলল, ‘আপু, উই আর প্রাউড অব ইউ।’ এ ঘটনা সালমার মনোবল বাড়িয়ে দেয়। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ তাঁকে কোমল পানীয় খাওয়ারও আমন্ত্রণ জানায়।

২০১৫ : সালমার মাথা ঘেঁষে একটি পাথর ইঞ্জিনে গিয়ে লাগে।  অল্পের জন্য বেঁচে যান সালমা। পাথর ছুড়ে মারা রীতিমতো মৃত্যুর হুমকি তৈরি করে। পাথরের ভয়ে জানালা বন্ধ করে ট্রেন চালাতে হয়। অথচ ট্রেনচালকের রুমে এসি নেই। যারা পাথর ছুড়ে মারে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলে মনে করেন সালমা।

২০১৬ : বড় মেয়ে আদিবা ইবনাত লাবণ্যকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন একদিন। পাশে বসে ট্রেন চালিয়েছেন তিনি। মেয়ে চোখে-মুখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে মাকে ট্রেন চালাতে দেখেছিল। 

২০১৭ : ‘একদিন হঠাৎ ট্রেনলাইনের ওপরে দেখি সাদা-লাল ফ্রক পরা ছোট্ট একটি শিশু হেঁটে যাচ্ছে। অনেক হুইসেল দেওয়ার পরও শিশুটি লাইন থেকে নামছিল না। তখন ট্রেনের পুরো ব্রেকই প্রয়োগ করি। ধীরে ধীরে ট্রেনটি এগিয়ে যেতে থাকে শিশুটির দিকে। ট্রেনটি যখন প্রায় শিশুটির কাছাকাছি তখন তার মা এসে তাকে সরিয়ে নেন লাইন থেকে।’ বলছিলেন সালমা।

২০১৯ : ডিউটি এখন কমলাপুর স্টেশনে। কয়েক ধাপ প্রমোশন পেয়ে পূর্ণাঙ্গ রেলচালক তিনি। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে উদ্বোধনী ট্রেন চালানোর স্বপ্ন দেখেন সালমা খাতুন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা