kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

খুঁজে ফেরা

রডোডেনড্রন যেভাবে বিলাত গেল

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রডোডেনড্রন যেভাবে বিলাত গেল

জোসেফ ডাল্টন হুকার

ইংল্যান্ডে বসন্তজুড়ে যে রঙের দাপাদাপি, তার অনেকটাই রডোডেনড্রনেরই দৌলতে। উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোসেফ হুকার দার্জিলিং থেকেই রডোডেনড্রন নিয়ে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। তারপর সেই পাহাড়ি ফুলের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। কখনো জেমস জয়েসের উপন্যাসে, কখনো বা রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’য়। লিখেছেন শ্রাবণী বসু

 

১৮৪৭ সালের একদিন

ইংল্যান্ডের তরুণ উদ্ভিদবিজ্ঞানী জাহাজে পাড়ি দিলেন ‘ইন্ডিয়া’র উদ্দেশে। নাম জোসেফ ডাল্টন হুকার, বয়স ৩০। তিনি চান ভারতের পাহাড়-পর্বত ঘুরে ঘুরে তার জীববৈচিত্র্যের সন্ধান করতে। গন্তব্য উত্তরবঙ্গ, আসাম, সিকিম, নেপাল আর তিব্বতে ছড়িয়ে থাকা হিমালয়। ছোটবেলা থেকেই হুকারের অনুপ্রেরণা ক্যাপ্টেন জেমস কুক। আর তাঁর বন্ধু ছিলেন বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় পৌঁছেই হুকার বেরিয়ে পড়লেন দার্জিলিংয়ের উদ্দেশে।

 

১৮৪৮ সালের ১৬ এপ্রিল

সেই সময় কলকাতা থেকে দার্জিলিং যাওয়া এক রকম অ্যাডভেঞ্চার। কলকাতা থেকে চুনারের কাছে মির্জাপুর পর্যন্ত গেলেন হাতির পিঠে। সেখান থেকে জলপথে শিলিগুড়ি। বাকি রাস্তা ঘোড়ায়। ১৮৪৮ সালের ১৬ এপ্রিল যখন দার্জিলিং পৌঁছলেন, ঝুপঝুপ বৃষ্টি পড়ছে। পাহাড় ঢেকে আছে ঘন সাদা কুয়াশায়, কয়েক হাত দূরের কিছুও দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে বাইরে তাকাতেই মুগ্ধ হলেন হুকার—ঝকঝক করছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। ডায়েরিতে লিখলেন, ‘হিমালয়ের অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে কত কিছুই না শুনেছি আর পড়েছি। কিন্তু সামনে থেকে দেখা এই অভিজ্ঞতা আমার সমস্ত প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে!’

মন কেড়েছে রডোডেনড্রন

হিমালয়ের অপূর্ব প্রকৃতির কোলে বিশেষ এক প্রজাতির ফুল খুব ভালো লেগেছিল হুকারের। নাম রডোডেনড্রন। পাহাড়ি পথের পাশে চারদিক আলো করে ফুটে থাকে। হুকার পরে বলেছিলেন, এক গোলাপ ছাড়া আর রডোডেনড্রনই একমাত্র ফুল, যা ইউরোপে সাড়া ফেলেছিল। এক জায়গায় লিখছেন, ‘নিচের পাহাড়ের জায়গায় জায়গায় আটকে থাকা বাতাস দ্রুত গরম হয়ে উঠল। ঘন, ভারী, সাদা বাষ্প এখানকার-ওখানকার ফাঁকা জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে ক্রমে উঠে পড়ল পাহাড়ের চূড়ায়; আটকে রইল চূড়ার ওপরে বনের মাথায়; পুরু হয়ে ছড়িয়ে পড়ে উঠল আরো আরো ওপরে। এমনই আকস্মিক এই ঘটনা, এমনই অবিস্মরণীয় সেই নিসর্গ, যা দেখে কেউই চোখ সরিয়ে নিতে পারে না, মনে হয় যেন জাদু। এই হলো ভারতীয় রডোডেনড্রনের বাসভূমি।’

 

সাহিত্যে রডোডেনড্রন

রডোডেনড্রন! সেই ফুল, রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ যাকে বাঙালির মনে অমরত্ব দিয়েছে! শিলং পাহাড়ে সন্ধ্যায় গাড়ি নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছে অমিত রায়, পাহাড়ি পথে আচমকা তার গাড়ি ধাক্কা দিল আরেকটি গাড়িকে। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল একটি মেয়ে। সেদিন লাবণ্যকে তার বাড়ি নামিয়ে দিয়ে ঘরে ফিরে কবিতার খাতা খুলতেই বেরিয়ে এসেছিল নিবারণ চক্রবর্তীর বকলমে অমিত রায়ের উচ্ছ্বাস, ‘...অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ,/ উদ্ধত যত শাখার শিখরে/ রডোডেনড্রনগুচ্ছ।’ বুদ্ধদেব বসুও পরে এই ‘রডোডেনড্রনগুচ্ছ’ নামেই লিখেছিলেন এক উপন্যাস। শুধু বাংলা নয়, ইংরেজি সাহিত্যেও প্রেমের এক অমোঘ দৃশ্যে রডোডেনড্রনের উপস্থিতি আজও উজ্জ্বল। জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসে ডাবলিন উপসাগরের ধারে এক এলাকায় ঝরে পড়া রডোডেনড্রনের মাঝে লিওপোল্ড ব্লুম বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে নায়িকা মলি ব্লুমকে।

 

হুকার এসেছিলেন বলে

উনিশ শতকের ইউরোপীয়রা রডোডেনড্রনের হাতে গোনা কয়েকটি প্রজাতি সম্পর্কেই জানতেন। হুকার যোগ করলেন আরো ২৫ রকমের প্রজাতি। তিনি এগুলো আবিষ্কার, শ্রেণিবিভাগ ও নামকরণ করলেন। অনেকগুলোর নাম রেখেছিলেন নিজের বন্ধুদের নামে। তত্কালীন গভর্নর জেনারেল ডালহৌসির নামে একটি রডোডেনড্রনের নাম রেখেছিলেন। হুকারের রডোডেনড্রন নোটে লেখা আছে, ‘তার চিরসবুজ পাতার কথাই বলি বা তার থোকায় থোকায় ফুটে থাকা ফুলের বাহারের কথাই বলি, প্রাচ্যের এই প্রজাতিটির মতো আর কোনো ফুলের গাছই এত বিস্তৃত ও ব্যাপকভাবে জন্মায় না।’ সমগ্র দার্জিলিং, সিকিম ও ভুটান ঘুরে হুকার রডোডেনড্রনের নানা প্রজাতি সংগ্রহ করে সেগুলো পাঠাতেন ব্রিটেনে। পরে ইংল্যান্ডের ‘কিউ গার্ডেনস’-এর উদ্ভিদ সংগ্রহালয়েও সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আজ যে ইংল্যান্ডজুড়ে রডোডেনড্রনের শোভা, তার কারণ হুকার আর তাঁর হিমালয় ভ্রমণ। আজকের ইংল্যান্ডে বসন্তজুড়ে যে রঙের দাপাদাপি, তার অনেকটাই তো রডোডেনড্রনেরই দৌলতে। রানির খাসতালুকের অংশ যে উইন্ডসর গ্রেট পার্ক, তার মূল আকর্ষণ রডোডেনড্রনই। রডোডেনড্রন বিক্রি হয় নার্সারি আর বাগানগুলোয়, ঘর আলো করে থাকে ইংরেজদের। কয়জনই বা জানেন, হুকারই একদিন এদের পূর্বপুরুষদের নিয়ে গিয়েছিলেন ভারতবর্ষ থেকে!

 

জেলও খাটতে হয়েছিল

দার্জিলিং থেকে আনা চমত্কার কিছু প্রজাতির রডোডেনড্রন একবার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেই সব রডোডেনড্রন হুকারকে অনেক কষ্টে ফের সংগ্রহ করতে হয়েছিল। ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘১০ হাজার থেকে ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায় জন্মানো রডোডেনড্রন ঝোপ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে গিয়ে পা আর হাঁটু কেটে-ছিঁড়ে গিয়ে ভয়ানক ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। উনিশ শতকের দুর্গম হিমালয়ে কাজ করার পরিবেশও আদৌ সুবিধার ছিল না।’ হুকার লিখছেন, ‘গাছের ডাল থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া একটা কম্বল দিয়েই আমার তাঁবুটা তৈরি। সেটার সঙ্গে আবার অন্য একটা কম্বল সাঁটা, আর এভাবেই কোনোমতে একটা ঘরের মতো ঠেকনা দেওয়ার চেষ্টা। তাঁবুর অর্ধেকটাজুড়ে আমার খাট, তার তলায় জামাকাপড়ের বাক্স। আর আমার বইপত্র, লেখালেখির সরঞ্জাম সব রাখা টেবিলের তলায়। বাইরের দিকে এক কোনায় ব্যারোমিটারটা ঝোলানো থাকত, অন্য সব যন্ত্রপাতি চারপাশে ছড়ানো-ছিটানো।’ চার বছর ধরে হুকার একা বা কখনো সঙ্গী গবেষক ও ব্রিটিশ কূটনীতিকদের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন এসব বিপত্সংকুল জায়গায়। সিকিমে বন্দি হয়েছিলেন রাজার হাতে, জেলেও থাকতে হয়েছিল, কারণ তিনি সিকিম থেকে তিব্বতে ঢুকতে চেয়েছিলেন। না ছাড়লে পরিণাম ভয়ংকর হবে, ব্রিটিশ সেনার এই হুমকিতে রাজা শেষমেশ তাঁকে মুক্তি দেন। এক সিকিম থেকেই হুকার সংগ্রহ করেছিলেন রডোডেনড্রনের ২৫টি প্রজাতি।

 

অক্লান্ত ঘুরেছিলেন

পূর্ব আসাম থেকে নেপালের পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অক্লান্ত ঘুরেছিলেন হুকার। খেয়াল করেছিলেন, পূর্ব আসামে রডোডেনড্রন মেলে পাঁচ হাজার ৪০০ ফুট থেকে ১২ হাজার ফুট উচ্চতায়ও। নেপাল সীমান্তে টোংলু পর্বতে ওঠার সময় দেখেছিলেন সারা জায়গায় রডোডেনড্রনে ছেয়ে আছে। সাত হাজার ফুট উচ্চতায় দেখেছেন, লিলির মতো দেখতে বড় বড় ডালহৌসি রডোডেনড্রনে ভরে আছে ঘনজঙ্গল। হুকারের আঁকা এসব রডোডেনড্রনের অজস্র ‘ফিল্ড স্কেচ’-এর লিথোগ্রাফ কপি নিয়ে পরে প্রকাশিত হয়েছিল ওয়াল্টার হুড ফিচের বিখ্যাত বই ‘দ্য রডোডেনড্রনস অব সিকিম-হিমালয়াজ’ (১৮৪৯)।

১৮৫১ সালে হুকার ভারত থেকে ফিরে যান স্বদেশে রডোডেনড্রনের প্রায় সাত হাজার প্রজাতির নমুনা সঙ্গে নিয়ে। ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত হয় ভারতীয় গাছপালা নিয়ে লেখা তাঁর বই ‘ফ্লোরা ইন্ডিকা’। হুকারের স্মরণে দার্জিলিংয়েও আছে ‘হুকার রোড’।

উল্লেখ্য, এ বছর জোসেফ হুকারের জন্মের ২০০ বছর পূর্তি।

(সূত্র : আনন্দবাজার, সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা