kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাঙালির বিশ্বদর্শন

ইস্তাম্বুলের গ্র্যান্ড বাজার

ফাতিমা জাহান    

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইস্তাম্বুলের গ্র্যান্ড বাজার

নাম গ্র্যান্ড বাজার বলে ভাবতাম, এখানে বুঝি রাজা-বাদশাহরা বাজার করতে যান। ঢুকে দেখলাম, ভাবনা খুব মিথ্যাও নয়। এখানকার সব জিনিসই রাজকীয়। বাজারটির ৬১টি গলিতে দোকানের সংখ্যা চার হাজার। ঢোকা যায় ২২টি পথ দিয়ে। ১৪৫৫ সালে এর প্রতিষ্ঠা। সুন্দর করে সাজানো এখানকার রং-বেরঙের সব দোকান। শুধু বাতির দোকানেই টেবিল ল্যাম্প, দেয়াল ল্যাম্প, ছাদে ঝোলানোর ল্যাম্প ইত্যাদি হরেক রকমের বাতি। ১১ শতকের তুরস্কে ছোট ছোট কাচ কেটে ল্যাম্পের গায়ে সেঁটে দেওয়ার চল শুরু হয়। সুলতানদের ঝাড়বাতি আসত ইউরোপের অভিজাত কারখানা থেকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সাধ মেটাত স্থানীয় শিল্পীরাই। মেশিনে নয়, হাতেই গড়া হয় এসব ল্যাম্প। তাই একটির সঙ্গে অন্যটির মিল পাওয়া যায় না সহজে। এখানকার ফুলদানি, ঝাড়বাতি, প্লেট, গ্লাস আর বোতলেও রঙের মেলা। তাই কাচের জিনিসপত্র দেখেও চোখ জুড়ায়। অষ্টাদশ শতাব্দী ছিল কাচশিল্পের স্বর্ণযুগ। কারণ সুলতান তৃতীয় সেলিম তখন ফ্রান্স থেকে বেশ কিছু কাচশিল্পীকে দাওয়াত দিয়ে তুরস্কে নিয়ে আসেন।

কার্পেট মার্কেট

তুরস্কের প্রায় সব বাড়িতেই কার্পেট বিছানো থাকে। সৌন্দর্যবর্ধন ছাড়াও ঠাণ্ডা থেকে বাঁচায়। আনাতোলিয়ায় কার্পেট বোনার ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। গ্র্যান্ড বাজারে কার্পেটের আলাদা গলি আছে। এর দুই পাশেই কার্পেটের দোকান। দোকানে বসে চা খেতে খেতে রঙিন কার্পেটের দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া যায়। কার্পেট তো আর হুটহাট কেনার জিনিস নয়, আর হাতে বোনা কার্পেটের দামও কম নয়। কার্পেটগুলো এমনই নরম আর মনোরম যে দেখেই পার করে দেওয়া যায় অনেকটা সময়।

 

চায়ের মার্কেট

তুরস্কে চায়ের নিমন্ত্রণ পেলে না করার নিয়ম নেই। আমি যেখানেই গেছি বা ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়েছি অথবা পথের দিশা জানতে চেয়েছি কারোর কাছে, প্রথমেই বসিয়ে এক কাপ তুর্কি চা হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। ষোড়শ শতকে ইউরোপে চায়ের চল হয় আর সতেরো শতকে চা পান এমনই জনপ্রিয় হয় যে জনসাধারণ মদ্যপান কমিয়ে চা পানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সারা পৃথিবীতে তুর্কিরাই বেশি চা পান করে। কমসে কম ১০০ রকমের চা পাওয়া যায় তুরস্কে। আপেল, কমলা, আনার বা লেবু চা যেমন আছে—গোলাপ, জেসমিন চা-ও পাবেন। হারবাল বা ভেষজ চা-ও আছে অনেক।

 

মসলার গলি

একটা গলি শুধু মসলার জন্য বরাদ্দ। গুঁড়া মরিচ, গুঁড়া ধনে, জিরা গুঁড়া, গোলমরিচ, পুদিনাপাতা গুঁড়া, দারচিনি, এলাচি, তিল, কালোজিরা, জাফরানসহ কি না পাওয়া যায় এই মসলার দোকানগুলোতে। তুরস্কের রসুইঘরে মধ্য এশীয়, মধ্যপ্রাচ্য, বলকান আর পূর্ব ইউরোপেরও ঘ্রাণ পাবেন। কাবাব, পোলাও, কোফতা এখানকার জনপ্রিয় খাবার।

 

গয়নার বাজার

এখানে হালকা গয়না পরার চল উত্সবে। সুলতানদের আমল থেকেই গ্র্যান্ড বাজার গয়নার জন্য বিখ্যাত। সুলতানের পরিবারের নারীরাও এখানকার জহুরি ডেকে পছন্দমতো গয়না তৈরি করিয়ে নিতেন। হীরা, চুনি, পান্নার হালকা নকশার গয়না দেখে মন ভরে যায়। কোনো কোনো দোকানে হুঁকা, আয়না, পকেট ঘড়ি, চামচ, টেবিলওয়্যারও দেখতে পেলাম। কিছু দোকান আছে, যেখানে ৪০০-৫০০ বছরের পুরনো গয়না সাজানো। গয়নার গলিতে হাতির দাঁতের তৈরি জিনিসপত্রও পাওয়া যায়। গ্র্যান্ড বাজারে তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী পোশাকও মেলে। হালফ্যাশনের পোশাক তেমন নেই। সিল্ক কাপড়ের ওপর হাতের কাজের নকশা দেখে আমার কাশ্মীরি নকশার কথা মনে পড়ল। বাহারি জুতার দোকানও দেখলাম অনেক। অনেক রং আর নকশার জুতা মেলে এই গ্র্যান্ড বাজারে। এখানকার তৈরি চামড়ার জুতার খ্যাতি সারা দুনিয়ায় ছড়ানো। ক্রেতারও অভাব নেই।

 

সিরামিক গলি

গ্র্যান্ড বাজারের আরেক আকর্ষণ এখানকার সিরামিকের জিনিসপত্র। নানা রং আর নকশার বাটি, ফুলদানি, প্লেট পাওয়া যাচ্ছে। কোনোটায় ফুল, কোনোটায় লতাপাতা আর কোনোটায় আরবি লিপি। সাদার ওপর গাঢ় নীল রঙের আধিক্য থাকে ফুল আর লতাপাতার নকশায়। সুলতানদের প্রাসাদের টাইলস, ফুলদানি বা তৈজসপত্রেও এমন নকশার দেখা মেলে। আমার মনে হয় গ্র্যান্ড বাজারের সারি সারি সিরামিকের দোকানে সারা দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়। আরো অনেক রকম জিনিস পাওয়া যায় এ বাজারে। বাজারের ভেতরে কোনো খাবারের দোকান নেই। নামাজ পড়ার জন্য মসজিদ আছে। বাজারে পানির কল আছে আটটি। এগুলোও দেখার মতো। সাধারণত কলটি হয় সোনালি রঙের আর পেছনের দেয়াল হয় শ্বেতপাথরের। বাজারের ভেতরের ছাদের রং হলুদ আর তার ওপর নীল রঙে নকশা করা। প্রায় চার লাখ দর্শনার্থী প্রতিদিন এ বাজার ঘুরে বেড়ান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা