kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভবঘুরে কুয়াশা

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভবঘুরে কুয়াশা

নাম তাঁর সত্যরঞ্জন রক্ষিত, তবে সবাই চেনে কুয়াশা মূর্খ নামে। মলিন তাঁর কাপড়, লম্বা তাঁর চুল-দাড়ি, কাঁধে দোতারা আর ঝোলা। সব মিলিয়ে ভবঘুরে এক মানুষ। তাঁকে খুঁজে পেয়েছেন নাঈম সিনহা

নামের শেষে মূর্খ কেন?

‘আমি জগত্টাকে জানতে চাই। নিজেকে সবজান্তা ভাবলে নতুন কিছু জানা দুরূহ। এ কারণেই আমি মূর্খ।’ বলছিলেন কুয়াশা। তাঁর অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীও নিজের নামের সঙ্গে মূর্খ জুড়ে নিয়েছেন। সংখ্যাটা একেবারে কমও নয়।

 

বাড়ি থেকে পালিয়ে

কুয়াশা প্রথম ভবঘুরে হন ক্লাস ফাইভের পরীক্ষার পর। বাড়ি থেকে পালানোর সময় সঙ্গে নিয়েছিলেন সমাজ বই। বইয়ের পেছনে থাকা ম্যাপ ধরে গাজীপুর চলে আসেন পটুয়াখালী থেকে।

গাজীপুরে এসেও একটি রেস্টুরেন্টে প্রথম কাজ নেন কুয়াশা। সেখানে এক মাস কাজ করে আবার লাপাত্তা। এরপর একটা গাড়ির গ্যারেজে ১৫ দিন। তারপর আর মন মানেনি। ফিরে আসেন পটুয়াখালীর নিজ বাড়িতে।

কুয়াশার প্রত্যাবর্তন

বাড়ি ফিরে কুয়াশা ফের স্কুলে ভর্তি হলেন। ওই দফায় দেড়-দুই বছর বাড়ি ছিলেন কুয়াশা। তারপর আবার পালালেন। চলে গেলেন পটুয়াখালী শহরে। একটা ছাপাখানায় কাজ নিলেন। সরকারি জুবলি স্কুলেও ভর্তি হলেন। নিজের খরচ নিজেই চালান। বাবা ছেলের খোঁজ পেয়ে খুশিই হলেন।

 

এবার ঢাকা

ম্যাট্রিক পাস করেই চলে আসেন ঢাকায়। তবে ভর্তি হন পটুয়াখালী কলেজে। ঢাকায় এসে কী করবেন, কই থাকবেন—কিছু ঠিক ছিল না। ফার্মগেটের একটি ইউনানি চিকিত্সালয়ে চাকরি পান। তাদের লিফলেট বিলিসহ নানা কাজ করতেন। পাশাপাশি একটি কোচিং সেন্টারে রিসিপশনিস্ট ও পিয়নের কাজও চালিয়ে যান। তারপর আজিজ মার্কেটের মুক্তচিন্তা প্রকাশনীতেও কাজ করেছেন। এই সঙ্গে পড়াশোনাটাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পটুয়াখালী শহরে পড়ার সময় থেকেই মঞ্চনাটকে আগ্রহ তৈরি হয়। প্রথম নাটকের দলের নাম ছিল সুন্দরম। ঢাকায় এসেও নাটকের দলের সঙ্গে যুক্ত হন। কিছুদিন বেসরকারি সংস্থার সামাজিক সচেতনতামূলক নাটকও করেছেন।

 

কুষ্টিয়ার রওশন ফকির

জীবনের মানে কী, কেন বেঁচে থাকা—এই ভাবনা তো সবার মনেই উঁকি দেয় সময় সময়। কুয়াশা উত্তর খুঁজতে ২০১০-১১ সালের দিকে চলে গেলেন কুষ্টিয়া। সেখানে গুরু হিসেবে পেলেন রওশন ফকিরকে। তাঁর কাছে জীবনদর্শন শিখলেন। পাশাপাশি দোতারা, হারমোনিয়ামসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রও আরো ভালো করে বাজানো শিখলেন। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের মহেষখণ্ডি এলাকায় একটা ঘরও ছিল কুয়াশার।

ছিল বন্ধু এক আমার

মুক্তচিন্তা প্রকাশনীতে অনেকেই আসত, যাদের আড্ডা ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। তাদের সঙ্গে সখ্যের সুবাদেই উদ্যানে বেশ যাওয়া-আসা ছিল। সেখানে গাছের ওপর একটা ঘরও বানিয়েছিলেন। ২০০৯ সালের দিকে পরিচয় সুন্দরীর সঙ্গে। সুন্দরী কুকুর হলেও তার আচার-আচরণ ছিল ভিন্ন। সে মানুষের সব কথা বুঝত। কুয়াশা বলল, ‘আমাদের সঙ্গে মঞ্চে পারফরমার হিসেবেও থেকেছে সুন্দরী। তাকে নিয়ে বাংলাদেশের নানা জায়গায় ঘুরেছি। তবে আমি যখন ভারত চলে যাই, সেখানে সুন্দরীকে নেওয়া সম্ভব হয়নি। আমার অনুপস্থিতে ২০১৭ সালের দিকে কেউ বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে তাকে। তবে তার সব অস্থি সংগ্রহ করেছি। আমার সঙ্গেই আছে সেগুলো।’

 

ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় গান গেয়ে বেড়িয়েছেন কুয়াশা। সেই গল্প বললেন, ‘শীতকালে ময়মনসিংহ এলাকায় বেশ কিছু ওরস হয়। সেখানে রাতভর গান-বাজনা হয়। সারা রাত গান করলে পাঁচ শ, এক হাজার করে টাকা পেতাম। গানের সময় বকশিশ হিসেবে খুচরা টাকাও আসত। সকাল হতে হতে মোটামুটি আরো দুই-তিন শ টাকা। আর আপ্যায়ন ছিল অন্য রকম। দেখা যেত বাড়ির সবচেয়ে বড় মোরগটাই আমাদের রান্না করে খাওয়াচ্ছে। টানা ছয় মাস এভাবে গান গেয়ে বেড়ালাম। মূলত সেই টাকা জমিয়ে ভারত যাই, আর ওখান থেকেই মূলত ঘুরে ঘুরে গান করার চিন্তা।’ প্রথমবার ভারত সফরে কুয়াশারা ছিলেন তিনজন। পরিকল্পনামাফিক গান গেয়ে বেড়িয়েছেন কলকাতা, দার্জিলিং, বিহার, তামিলনাড়ু, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কেরালায়। বাসে, ট্রেনে, স্টেশনে সবখানেই গান গাইতেন।

 

ওগো বিদেশিনী

ওলগা জেহাফ স্লোভেনিয়ার চিত্রশিল্পী। ২০১১-১২ সালের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়। কুয়াশা প্রথমবার ভারতে থাকার সময় ২০১৫ সালে ওলগাও সেখানে আসেন। তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে রয়েছে একটা বিশেষ গল্প। কুয়াশা বললেন, ‘আমরা তখন কোচিনের এন্দ্রাকুলামে। ট্রেনে করে এয়ারপোর্ট গিয়ে ওলগাকে আনতে হবে। কিন্তু ট্রেন রাত ২টায় যেখানে নামিয়ে দিল, সেখান থেকে এয়ারপোর্ট আরো ২৬ কিলোমিটার। মাঝরাতে হাঁটা শুরু করলাম। ভোরে ভোরে এয়ারপোর্ট পৌঁছাতে হবে। হঠাৎ রাস্তায় তিনটা বাইক এসে থামল। মনে হলো ডাকাত। কথা না বাড়িয়ে বাইকে চড়িয়ে নিল। কিছুদূর গিয়ে একটা বাজারে গাড়ি থামাল। দেখে বুঝল আমরা নিতান্তই অসহায়। শেষে পেটপুরে খাইয়ে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দিয়েছিল। এরপর দেখা হলো ওলগার সঙ্গে। বাঙালি দুই বন্ধু দেশে ফিরে গেল। আমি রয়ে গেলাম ওলগার সঙ্গে।’

ওলগাকে নিয়ে কোচিন থেকে কুয়াশা গেলেন সমুদ্র শহর গোয়ায়। এরপর ওলগা ফিরে গেলেন তাঁর দেশে। কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারলেন না। প্রেমের টানে চলে এলেন আবার। গোয়ায় এক বছরের জন্য একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করলেন তাঁরা।

পরে টাকায় টান পড়ায় গোয়া থেকে চলে এলেন পশ্চিমবঙ্গে। বারাসাতের একটা স্কুলে কাজ পেলেন। সেখানে কুয়াশা গান আর নাটকের প্রশিক্ষণ দিতে থাকলেন। কিন্তু একটানা তিন মাসের বেশি ভারতে অবস্থান করা যায় না। তাই গত তিন বছর আসা-যাওয়ার মাঝেই ছিলেন কুয়াশা।

 

এখন দেশে

এখন ওলগা আর কুয়াশা দুজনেই বাংলাদেশে। দুজনেই থাকছেন খুলনায়। একটা বুটিক শপে ছবি এঁকে চলছেন। সামনে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে একটা খামারবাড়ি করার কথা ভাবছেন। তারপর স্লোভেনিয়া আর বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকবেন। স্থায়ী হওয়ার ইচ্ছা নেই কারোরই। ঘোরাঘুরি চলবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা