kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৪ রবিউস সানি     

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

পথ দেখিয়েছেন কোহিনূর বেগম

চৌহালি উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল। হতদরিদ্র মানুষেরা আপৎকালের জন্য তৈরি করেছে খাদ্য ব্যাংক। এর উদ্যোক্তা কোহিনূর বেগম। সিরাজগঞ্জ থেকে লিখেছেন অসীম মণ্ডল

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



পথ দেখিয়েছেন কোহিনূর বেগম

ফুড ব্যাংকের সদস্যদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করছেন কোহিনূর বেগম (মাঝে চালের সামনে বসা)

কোহিনূর বেগমের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা নেই। নেই কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতাও। শুধু বিপদের দিনের কথা চিন্তা করেই গড়ে তুলেছেন খাদ্য ব্যাংক। তারপর তাঁর দেখানো পথে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান ‘মানব মুক্তি সংস্থা’ চৌহালির বড় ঘোরজান ও আশপাশের কিছু চরে আরো কয়েকটি খাদ্য ব্যাংক গড়ে তুলেছে।

 

ভাঙন চলছিল

দেড়-দুই বছর আগের কথা। চৌহালিতে আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল যমুনা নদী। চালিয়েছিল ভাঙনের তাণ্ডব। ভাঙনে বিলীন হয়ে গিয়েছিল কাঁচা-পাকা সড়কগুলোও। কোহিনূরের রিকশাচালক স্বামী মোহাম্মদ আলী শেখের কোনো কাজ ছিল না। ঘরে বসে কাটাচ্ছিলেন দিন। সাত সন্তান নিয়ে কোহিনূর ঘোরতর বিপদে পড়েছিলেন। বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করে খেয়ে-না খেয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎই তাঁর মনে হলো সবাই মিলে সুদিনে কিছু শস্য জমিয়ে রাখলে তো দুর্দিনে এমন দুর্দশায় পড়তে হয় না। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নিজের ভাবনার কথা জানান প্রতিবেশী অভাবী পরিবারগুলোকে। প্রথম প্রথম তাঁর কথায় বেশি গুরুত্ব কেউ দেয়নি। তবে কোহিনূর চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে ৩০টি পরিবার নিয়ে গড়ে তোলেন একটি স্বেচ্ছা সমিতি। তারই ফসল এই খাদ্য ব্যাংক। কোহিনূর বেগম বলছিলেন, ‘যাদের নিয়ে এই খাদ্য ব্যাংক গড়ে তুলেছি, তাদের সবারই দিনের পর দিন অনাহারে কেটেছে। প্রতি মাসে আধা কেজি করে চাল জমানোও তাদের জন্য কষ্টসাধ্য। আমরা ৩০ জন নিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন সংখ্যাটি ৪০-এ দাঁড়িয়েছে।’

 

যেমন চলছে ফুড ব্যাংক

তুলনামূলক স্বচ্ছল যারা, তারা কেউ কেউ প্রতি মাসে এক কেজি, কেউ কেউ দুই কেজিও জমা দেয়। এরই মধ্যে জমিয়ে রাখা কিছু চাল বিক্রি করে ১৫ হাজার টাকা ব্যাংকে রাখা হয়েছে। গ্রামের দুটি হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়েতে ৫০ কেজি করে মোট ১০০ কেজি চাল উপহার দেওয়া হয়েছে। এবারের বন্যায় ২০টি পরিবারকে আট কেজি করে চাল উপহার দেওয়া হয়েছে। কোহিনূর বলছিলেন, ‘কর্তব্যক্তিরা হতদরিদ্র পরিবারকে চাল দেয় না; তারা অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারগুলোকে দেয় আর দেয় মুখ চিনে চিনে। তাই কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে মুষ্টি চাল জমিয়েই নিজেদের আমরা সাহায্য করছি।’

 

কোহিনূরের কথা

প্রথম দিকে কোহিনূর তাঁর এই উদ্যোগকে চালু রাখতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুষ্টি চাল সংগ্রহ করে নিজ বাড়িতে জমিয়ে রাখতেন। তবে রাখার বড় পাত্র ছিল না। শেষে পলিথিনে ঘরের মাচার ওপরে রাখতেন। এখন সদস্যরা নিজ থেকেই চাল এনে জমা দিয়ে যায়। কোহিনূর বললেন, ‘আমার চার মেয়ে, তিন ছেলে। জমি বলতে কিছুই নেই। যে জমিতে বসবাস করি সেটির ভাড়া দিতে হয় বছরে এক হাজার টাকা। শুরুতে খাদ্য ব্যাংকে কোনো কমিটি ছিল না। পরে ‘মানব মুক্তি সংস্থা’র সহায়তায় একটি কমিটি হয়েছে। ব্যাংকে একটি হিসাব খোলা হয়েছে। চাল রাখার জন্য কেনা হয়েছে একটি পাত্র। আমিই এর সভাপতি।’

মানব মুক্তির কর্মকর্তা সুরুত জামান বললেন, ‘আমরা এরই মধ্যে চৌহালির দুর্গম চরাঞ্চলের সাতটি ইউনিয়নে ফুড ব্যাংক চালু করেছি। এতে অভাবী মানুষেরা তাঁদের আপৎকালে নিজেরাই নিজেদের সহায়তা করতে পারেন। কোহিনূর বেগমের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।’

চৌহালি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক সরকার বললেন, ‘সীমিত সামর্থ্য দিয়েও যে মানুষের উপকার করা যায় কোহিনূর বেগম তার উদাহরণ।’

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা