kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

বিশাল বাংলা

খুলে গেল রাজার বাড়ি

সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ছিলেন মুক্তাগাছার জমিদার। শশীকান্ত তাঁর দত্তক পুত্রের নাম। ময়মনসিংহ সদরে সূর্যকান্ত যে প্রাসাদ বানিয়েছিলেন পুত্রের নামে সেটির নাম রেখেছিলেন—শশীলজ। অনেক দিন জমিদারবাড়িটি তালাবদ্ধ ছিল। গেল মে মাসের শেষ দিকে সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন দর্শনার্থীরা বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারছেন। দেখতে পাচ্ছেন জমিদারদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র। দিন কয়েক আগে দেখে এসেছেন আবুল বাশার মিরাজ

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খুলে গেল রাজার বাড়ি

বুনো মহিষের শিং

মাত্র ১৫ টাকা দর্শনী। বিশাল উঁচু গেট, ভেতরে ঢুকে পড়লাম। কিছুদূর যেতেই বাড়িটি নজরে এলো। লাল রঙের। ২০টি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। লিখিত নির্দেশনামাফিক বাঁ দিকে মোড় নিলাম। প্রথম ঘরটিতে ঢোকার পর বেশ বড় জায়গাজুড়ে চেয়ার-টেবিল পাতা। একটি নামফলকও দেখতে পেলাম, তাতে লেখা, হাতির দাঁতের তৈরি সোফা। তিনজন করে বসা যাবে এমন সোফা দুটি, আর একজন করে বসতে পারে এমন চেয়ার চারটি। মাঝখানে একটি মার্বেল পাথরের টেবিল রাখা। চেয়ারের সর্বাঙ্গে ময়ূর, লতাপাতা আর ফুলের কারুকাজ। এই কাজগুলো করা হয়েছে হাতির দাঁত দিয়ে।

 

ঘুরতে ঘুরতে

বাড়িটিতে ১৮টি কক্ষ থাকলেও মোট তিনটি কক্ষে রাজাদের ব্যবহৃত জিনিসগুলো রাখা হয়েছে। শোকেসেও রাখা হয়েছে অনেক জিনিস। একটি ঘরে গিয়ে দেখতে পেলাম গণ্ডারের চামড়া। এত দিন শুধু শুনতাম গণ্ডারের চামড়া অত্যন্ত পুরু। কাছ থেকে দেখে হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম। ঘুরে ঘুরে আরো দেখলাম বন্য মহিষের শিং, হরিণের শিং, জমিদারদের শোয়ার খাট, শ্বেতপাথরের গ্লাস ও টেবিল, মহিষের শিং দিয়ে তৈরি পানপাত্র,  শ্বেতপাথরের মূর্তি, সামুদ্রিক ঝিনুক, হাতির মাথার কঙ্কাল, হাতির চোয়ালের কঙ্কাল, মাটির নলসহ হুঁকা। এখানে  গৌরিপুর জমিদারদেরও কিছু জিনিসপত্র রাখা আছে।

 

প্রাসাদের বাইরে আছে

মোট ৯ একর জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে এই শশীলজ। প্রাসাদ প্রাঙ্গণে ফুলের বাগান, বেশ কিছু মূর্তি, বিশাল কিছু কড়ইগাছ ও বকুল মঞ্চ আছে। ভবনের পেছন দিকে আছে দোতলা স্নানঘর, ঘাটসহ পুকুর। ঘাটটি মার্বেল পাথরের।

 

শশীলজের ইতিহাস

শশীলজের নিরাপত্তারক্ষী মো. আওলাদ হোসেনের কাছে জানলাম, মুক্তাগাছা জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরীর তৃতীয় উত্তরপুরুষ রঘুনন্দন আচার্য চৌধুরীর কোনো সন্তান ছিল না। তাই গৌরীকান্তকে দত্তক নিলেন রঘুনন্দন। মৃত্যুর আগে দত্তক পুত্রের হাতে জমিদারির ভার অর্পণ করে যান। জমিদার গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীরও কোনো সন্তান ছিল না। তাঁর অকালপ্রয়াণের পর বিধবা পত্নী বিমলা দেবী দত্তক নিলেন কাশীকান্তকে। দীর্ঘ রোগযন্ত্রণায় ভুগে সন্তানহীন অবস্থায় পরলোকগমন করলেন কাশীকান্তও। তাঁর বিধবা পত্নী লক্ষ্মী দেবী আচার্য চৌধুরাণী দত্তক নিলেন চন্দ্রকান্তকে। চন্দ্রকান্তও অতিদ্রুত পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তবে হাল ছাড়লেন না লক্ষ্মী দেবী। আবার দত্তক নিলেন তিনি এবং পুত্রের নাম রাখলেন সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী।

প্রায় ৪১ বছর জমিদারি পরিচালনায় অনেক জনহিতকর কাজ করলেন তিনি। ময়মনসিংহে স্থাপন করলেন একাধিক নান্দনিক স্থাপনা। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রস্থলে ৯ একর জমির ওপর একটি অসাধারণ দ্বিতল ভবন নির্মাণ করলেন সূর্যকান্ত। নিঃসন্তান সূর্যকান্তের দত্তক পুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে এই ভবনের নাম রাখা হলো শশীলজ। ভবনটি ১৮৯৭ সালের ১২ জুন গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হলে অত্যন্ত ব্যথিত হন সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। ১৯০৫ সালে ঠিক একই স্থানে নতুনভাবে শশীলজ নির্মাণ করেন শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী। ১৯১১ সালে শশীলজের সৌন্দর্য বর্ধনে আরো কিছু সংস্কারকাজ করেন। নবীন জমিদারের প্রচেষ্টায় শশীলজ হয়ে ওঠে অপরূপ।

শশীলজের কাস্টোডিয়ান সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, জমিদারি প্রথা শেষ হলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার জামিদারদের সব ভবন ও সম্পত্তি সরকারের খাসজমি ও ভবন হিসেবে ঘোষণা দেয়। সরকার এই ভবনটিতে ‘মহিলা শিক্ষিকা প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়’ স্থাপন করে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার হেরিটেজ ভবন হিসেবে মূল ভবনটিকে ‘মহিলা শিক্ষিকা প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়’ থেকে আলাদা করে প্রত্নতাত্ত্বিক ও জাদুঘর অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে।

উল্লেখ্য, শশীলজ সপ্তাহের রবিবার বন্ধ ও সোমবার আধা বেলা খোলা থাকে। প্রবেশ ফি জনপ্রতি ১৫ টাকা, তবে স্কুলছাত্রদের জন্য পাঁচ টাকা।

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা