kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

সুখবর বাংলাদেশ

জাহিদের মাছ আর গাছ

মাহবুবুর রহমান জাহিদ দাখিল পরীক্ষা দিয়েছিলেন ২০০২ সালে। কিন্তু আশানুরূপ ফল মেলেনি। মন খারাপ করে বেরিয়ে পড়েন হালুয়াঘাটের বাড়ি থেকে। তারপর ঘটতে থাকে অনেক ঘটনা। লিখেছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জাহিদের মাছ আর গাছ

১৮ জুলাই ২০১৯। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পুরষ্কার নিচ্ছেন তরুণ উদ্যোক্তা জাহিদ

পাহাড় তাঁকে টানত। বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই গেলেন রাঙামাটি। তারপর খাগড়াছড়িতেও কিছুদিন। এরপর গেলেন বান্দরবান। পকেটের টাকা তখন শেষ হয় হয়। এক বন্ধুকে বললেন, ‘আমাকে একটা কাজ খুঁজে দাও।’ একটা বেকারিতে কাজ মিলল। মোটে পাঁচ টাকা রোজ। সাত দিন কাজ করার পর ছেড়ে দিলেন।

তারপর লামার ৬ নম্বর রূপসীপাড়ায় গেলেন। একটা ফার্মেসিতে কাজ জুটল। ৮০০ টাকা মাইনে। এখানে কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন। তত দিনে আট মাস পেরিয়ে গেছে। বাসার লোক খোঁজ পেল জাহিদের। মা-বাবা এসে নিয়ে গেলেন বাড়ি। কলেজে ভর্তি হলেন বাড়ি গিয়ে। ২০০৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিলেন। এরপর ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে (তখন এটাই নাম ছিল)।

 

বন্ধু তিনজন

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন। ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত আর রাজনীতি করা বাদ দেননি। মাঝে একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন। ওখান থেকেই তাঁর মধ্যে ব্যবসা করার ঝোঁক তৈরি হয়। ২০১৩ সালে রাজনীতি করতে করতে হতাশ হয়ে গেলেন। চাইলেন নিজের মনমতো একটা কিছু করতে। কিন্তু অল্প পুঁজিতে কী করবেন ভাবতে লাগলেন। এ সময় এম এ মুকিত, বোরহানুল আশেকীন ও আরিফুর রহমান নামে তিন বন্ধুকে পেলেন, তাঁরাও একটা ব্যবসা করার কথা ভাবছেন। তিন বন্ধু মিলে চলে যান আবার বান্দরবানের লামায়। সেই ৬ নম্বর রূপসীপাড়ায়। গিয়ে ২০ একর জমি কেনেন। দুই পাশে দুটি পাহাড়, মাঝে সমান ঢালু জায়গা। তাঁরা চাইলেন ঢালু জমিতে মাছের খামার করবেন আর আবাদ করবেন পাহাড়। সে মতো এক হাজার আম্রপালি, ১৩০ রাঙ্গগুয়াইন (পাহাড়ি আম), ১০০ আমড়া, ছয় হাজার সেগুনগাছ, ৫০টি রেইনট্রি আর ১৫০টি গামারিগাছ লাগালেন। তবে সমস্যা হলো পাহাড়ে ফল আসতে দেরি হয়। চার-পাঁচ বছর লেগে যায়। পরিচর্যা খরচও বেশি। তাই বাকি তিন বন্ধু ফিরে আসেন শহরে। মাহবুব একাই রয়ে যান।

 

মাছ চাষ শুরু

দুই পাহাড়ের মাঝের ঢালু জমিতে ঝরনার পানি ধরে রাখার বাঁধ তৈরি করেন। মাছ চাষের শুরু সেখানেই। প্রথম বছর মানে ২০১৫ সালে ৪৫ হাজার টাকার পোনা ছাড়েন রুই, কাতলা, মৃগেল, গ্লাসকার্প, কালবাউশ ও তেলাপিয়া মাছের। পাহাড়ে মাছের খাবার আনা-নেওয়া বেশ কঠিন। মাহবুব তাই মাছের জন্য প্রাকৃতিকভাবে খাবার তৈরির উপায় বের করলেন। যেমন—কচি বাঁশ পুঁতে দিলে তাতে যে শ্যাওলা জমত সেটা হয়ে উঠল মাছের খাবার। তারপর কলাপাতা, মদের ছোবলা (পাহাড়িরা ভাত পচিয়ে যে মদ বানায়, বানানোর পর যে অবশিষ্ট ভাত থাকে), খইল, কুঁড়া ইত্যাদি দিতেন। প্রথম বছরে লাভ আসেনি। দ্বিতীয় বছরে মানে ২০১৭ সালে লক্ষাধিক টাকার মাছ বিক্রি করলেন। ওই বছর উপজেলা পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে প্রথম পুরস্কার লাভ করেন। ওই বছরই আরো কিছু পুকুর লিজ নেন। সেখানে একই ধরনের মাছ চাষ করতে শুরু করেন। পরের বছর এই পুকুরগুলো থেকে ছয় লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেন। ২০১৮ সালে জেলাপর্যায়ে সেরা উদ্যোক্তা নির্বাচিত হন। এবার সরকার তাঁকে একটি নার্সারি পুকুর করে দেয়, যেখানে পোনা চাষ করা যায়। কিন্তু বন্যা নার্সারি, পুকুর আর তার তিনটি বাঁধের দুটিকেই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তবে থেমে যাননি জাহিদ। তাঁর উদ্যমের পুরস্কার হিসেবে এ বছর জাতীয় পর্যায়ে কার্পজাতীয় মাছ চাষে রৌপ্যপদক পান। এই পুরস্কারের জন্য এলাকা, উদ্যোক্তার পড়াশোনা, কাজে উৎসাহ ইত্যাদি বিষয় দেখা হয়। জাহিদ কাজ শুরুর পর থেকেই মাছ চাষভিত্তিক প্রায় সব কার্যক্রমে জড়িত হয়েছিলেন। তাঁর দেখাদেখি অনেকেই মাছ চাষ শুরু করেছেন।

 

জাহিদের মন

মা-বাবা দুজনেই পর পর দুই বছরে মারা যাওয়ায় শুধু পুকুর নিয়েই থেকেছেন। বাগানের দিকে মন দিতে পারেননি। জাহিদ বাগানের কাজ আবার নতুন করে শুরু করতে চান। বাঁধ সংস্কারে সরকারি সহায়তা চাইবেন। আর তাঁর ইচ্ছা—একটা অর্গানিক খামারবাড়ি গড়ে তোলা এবং একটা ইকো ট্যুরিস্ট স্পট বানানো। কোলাহল থেকে দূরে একটা শান্তির নিবাস হবে সেটা, যেখানে মানুষ ইচ্ছামতো মাছ ধরে খেতে পারবে। নিজ হাতে গাছ থেকে ফল পেড়ে খাবে। একেবারে টাটকা সব। একটা কৃত্রিম ঝরনাও বানাতে চান তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা