kalerkantho

বানভাসি

বাঁধের জীবন

বাড়ি ডুবে গেছে বানের পানিতে। তাই রাস্তা নয় তো, বাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে হয়েছে বানভাসি মানুষদের। কুড়িগ্রাম সদরের শুলকুর বাজার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ আর কুড়িগ্রাম যাত্রাপুর সড়ক ঘুরে দেখে এসেছেন আব্দুল খালেক ফারুক

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাঁধের জীবন

বাঁধে সংসার। ভাতের সঙ্গে তরকারি বলতে শুকতানি

মাথার ওপর আচ্ছাদন একটি ছেঁড়া পলিথিন। মানুষ, গরু, ছাগল সবার একসঙ্গে বসবাস। চৌকি, খাট নেই। মাটিতেই বিছানা। দিন কাটে একবেলা খেয়ে।

ছেঁড়া পলিথিনের ফাঁক গলে বৃষ্টি ভিজিয়ে দিয়ে যায় বিছানা। তাই বড় বিপদেই আছেন কয়সার আলী। স্ত্রী সুরজ্জনকে নিয়ে বসে আছেন চুপচাপ। কাছে যেতেই মিনতি করে বললেন, ‘বাবারে, একটা তাম্বুর (তাঁবু) ব্যবস্থা করি দেও। খুব কষ্টে আচি।’ বিধবা জরিনার একমাত্র ছেলে জহুরুল কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। বন্যার মৌসুমে বেকার বসে আছেন। মাথার ওপর পুরনো পলিথিন দিয়েছিলেন, বাতাসে ছিঁড়ে গেছে। অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে আলেয়া বেগম উঠেছেন বাঁধে। বৃষ্টি এলে স্বামীর মাথা শাড়িতে ঢেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন।

বিশুদ্ধ পানি আর শৌচাগার

শুলকুর বাজার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে শ দুয়েক পরিবার। প্রায় হাজারখানেক লোকের অস্থায়ী নিবাস এখন এই বাঁধের রাস্তাটি। বাঁধের দুই পাশে তাদের ঘরবাড়ি পানিতে সয়লাব। নলকূপও ডুবে গেছে। তাই দূরের মসজিদের নলকূপ থেকে কেউ কেউ আনছেন খাবার পানি। কেউ বা ডুবে যাওয়া নলকূপের পানিই পান করছেন। থালা-বাসন ধোয়ার কাজ চলছে বন্যার পানি দিয়েই। তবে শৌচাগারের কষ্ট প্রকট। দুটি অস্থায়ী শৌচাগার বসিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ; কিন্তু তা পূর্ণ হয়ে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বাধ্য হয়ে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে একটি।

হাতে নেই কাজ

বন্যার পানিতে ভাসছে চারদিক। তেলিপাড়ার ৬০ বছরের বৃদ্ধ আবেদ আলী ঘোড়ার গাড়ি চালান। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় কাজের খোঁজে যেতে পারছেন না। বেকার জীবনে ধারদেনাই সম্বল। স্ত্রী ছকিনা জানালেন, এ পর্যন্ত চার হাজার টাকা ধার নিয়েছেন। হাজারে মাসে দেড় শ টাকা সুদ গুনতে হবে। রুমার স্বামী আজিজ বিদ্যুতের মিস্ত্রি। বন্যার কারণে কাজ মিলছে না। দিনমজুর রফিকুল বলেন, ‘চাইরোপাকে পানি। কাম কোটে। এ অবস্থায় কাই কামলা নেয়। এলা সুদের উপরা টাকা নিয়া চলচি।’ আটটি মুরগি ভেসে গেছে বানের পানিতে। মাত্র দুটি হাঁস টিকে আছে। তা নিয়ে বাঁধে উঠেছেন বিধবা আমেনা। হাঁস দুটিকে চোখে চোখে রাখছেন। শেষ সম্বল চলে গেলে চোখের জলই শুধু থাকবে বাকি। বললেন, পাঁচ কেজি চাল ছাড়া আর কোনো রিলিফ জোটেনি।

বাজারে আগুন

শুলকুর বাজারের পাকা রাস্তায় আশ্রয় নেওয়া স্ত্রী নেছাভানকে নিয়ে আব্দুর রহমান দুপুরের আহারে বসেছেন। ভাতের সঙ্গে আলুর তরকারি ছাড়া আর কিছু নেই। পটোল, বেগুন, পেঁপে, সবজির দাম চড়া। হাতের টাকা-পয়সা শেষ হয়ে যাওয়ায় বাজারে যেতে পারছেন না রহমান। সকালে মুড়ি, দুপুরে ভাত আর রাতে চিঁড়া দিয়ে চলছে তাঁদের দুই সপ্তাহের রাস্তার সংসার।

রাত নির্ঘুম

বাঁধে আশ্রিত আকলিমা বেগম সন্তানসম্ভাবনা। স্বামী এরশাদুল ঢাকায় দিনমজুরির কাজ করেন। বন্যার খবর শুনেও কাজ ছেড়ে আসতে পারেননি। পলিথিন টাঙিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধের ওপর। ১৫ দিনে দুই দিন মাত্র মাছ খেয়েছেন। অন্যদিন কচু, আলু আর শাকপাতা। স্বামী পাশে নেই। কখন জানি কী হয়! আতঙ্কে রাতে ঘুমাতে পারেন না আকলিমা। তাঁর পাশের ছাপড়ায় বাস করেন বানেছা। বয়স ১৮। এক বছরের বিবাহিত জীবন। তিনিও সন্তানসম্ভাবনা। তাঁর স্বামী রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। থাকেন ঢাকায়। গর্ভে সন্তান আসার পর থেকে বাবার বাড়ি আছেন। রাস্তা ভাঙার কারণে অটোরিকশাচালক বাবার আয় কমে গেছে। তাই খাওয়ার কষ্ট। জানান, চিকিৎসাও করাতে পারছেন না। কাছে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে, তবে তাতেও পানি উঠেছে।

জেলেপল্লীতেও হাহাকার

কুড়িগ্রাম ধরলা সেতু থেকে যাত্রাপুর যাওয়ার রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে ১০টি জেলে পরিবার। নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় মাছ মিলছে না। তাই সবার ঘরেই হাহাকার। শশীবালা আগে মাছ বেচতেন। পুঁজির অভাবে তা-ও বন্ধ। দুটি মুরগি ছিল সম্বল। তাই বিক্রি করে পলিথিন কিনে আস্তানা বানিয়েছেন। রাতে ঘুমান মাটির ওপর। পাশে থাকেন বিধবা বুদুবালা। বস্তায় শুকনো পাতা সংগ্রহ করে রেখেছেন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করবেন বলে। কিন্তু চাল আর সবজি না থাকায় দুপুর অবধি চুলা জ্বালাতে পারেননি।

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা