kalerkantho

রবিবার। ১৮ আগস্ট ২০১৯। ৩ ভাদ্র ১৪২৬। ১৬ জিলহজ ১৪৪০

রান্নার অস্কার আনলেন আলপনা

গোরমন্ড ওয়ার্ল্ড কুকবুক অ্যাওয়ার্ডকে অনেকে বলেন, ‘অস্কার অব গ্যাস্ট্রোনমি’। আলপনা’জ কুকিং বইয়ের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো আলপনা হাবিব পেয়েছেন এ পুরস্কার। তাঁর সঙ্গে গল্প করে এসেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রান্নার অস্কার আনলেন আলপনা

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

গোরমন্ড ওয়ার্ল্ড কুকবুক অ্যাওয়ার্ডের কথা প্রথম জানতে পারেন এপ্রিলের শুরুতে। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়ে আলপনার কাছে একটা মেইল এসেছিল। তাতে লেখা ছিল—এটা খুবই গোপনীয় ব্যাপার। এ বছর গোরমন্ড অ্যাওয়ার্ডের জন্য যে কয়টি বই মনোনয়ন পেয়েছে তার মধ্যে আপনারটাও আছে। ম্যাকাওতে হবে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান।

অথচ আলপনা নিজে থেকে কোনো বই জমা দেননি। তাই পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন না। তবে ফিরতি মেইলে জানালেন, ‘একা আসতে পারব না। স্বামী-সন্তানরাও সঙ্গে আসবে।’ গোরমন্ড থেকে জানানো হলো, ‘তাদের রেজিস্ট্রেশনও আমরা ফ্রি করে দেব।’

 

ম্যাকাও পৌঁছালেন

জুলাইয়ের ৩ তারিখে সপরিবারে ম্যাকাও পৌঁছালেন আলপনা। ৪ জুলাই সকালে গেলেন ম্যাকাও ইন্টারন্যাশনাল বুক ফেয়ারে। পৃথিবীর অনেক দেশ থেকেই নামিদামি রন্ধনশিল্পীরা এসেছেন। বিকেলে এখানেই ঘোষণা করা হবে গোরমন্ড ওয়ার্ল্ড কুকবুক অ্যাওয়ার্ড। বিভিন্ন শাখায় (ক্যাটাগরি) ২১৬টি দেশ এবার লড়ছে। ‘লেখকের প্রথম বই’ শাখায় মনোনয়ন পেয়েছিলেন আলপনা। একপর্যায়ে তা জিতেও নিলেন। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রান্না সম্পর্কিত বাংলাদেশি কোনো বই পুরস্কার পেল।

আলপনা বললেন, ‘আমার স্বামী বারবারই বলছিলেন, বেশি আশা কোরো না। তাই আমি বেশি আশা করছিলাম না। তবে যখন পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা হলো, ‘আলপনা হাবিব ফ্রম বাংলাদেশ’ আমি চমকে গেলাম। পুরস্কার নিতে মঞ্চে উঠতে গিয়ে দেখি শরীর কাঁপছে। মাইক্রোফোনে কথা বলার সময় গলা ধরে আসছিল। মঞ্চে আয়োজকদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, হোয়াই মি? আর এই বই আপনারা কোথায় পেলেন? তিনি বললেন, আপনার বইটা দারুণ বৈচিত্র্যপূর্ণ। বইটা আমাদের মুগ্ধ করেছে।’

 

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গোরমন্ড ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড কয়েনট্রুর সঙ্গে আলপনা হাবিব

গোরমন্ড অ্যাওয়ার্ড

১৯৯৫ সাল থেকে প্রদান করা হচ্ছে গোরমন্ড ওয়ার্ল্ড কুকবুক অ্যাওয়ার্ড। শুরুটা হয়েছিল জার্মানির ফ্রাংকফ্রুট বইমেলা দিয়ে। এরপর থেকে একেক বছর একেক আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রদান করা হয় এই পুরস্কার। এবার ইনস্টিটিউট অব কালচার অব ম্যাকাওয়ের উদ্যোগে ম্যাকাও ইন্টারন্যাশনাল বুক ফেয়ারে দেওয়া হলো ২৪তম গোরমন্ড ওয়ার্ল্ড কুকবুক অ্যাওয়ার্ড। ‘লেখকের প্রথম বই’ শাখায় ১২টি বই মনোনয়ন পায়। এর মধ্যে প্রথম হয় আলপনার বইটি। দ্বিতীয় পুরস্কার পায় দক্ষিণ আফ্রিকা, তৃতীয় হয় পানামা, সুইডেন ও তুরস্কের তিনজন লেখকের তিনটি বই।

 

আলপনা’জ কুকিং

বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায়ই লেখা আলপনা’জ কুকিং। ২০১৮ সালে প্রকাশিত বইটিতে মোট ২৫০টি রেসিপি আছে। বইটি প্রকাশ করেছেন সৈয়দ আহসান হাবিব। সম্পাদনা ও ইংরেজি ভাষান্তর করেছেন আশফাক স্বপন। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন শিল্পী মুস্তাফা খালিদ পলাশ। ছবি তুলেছেন সোহেল রানা রিপন। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে অধ্যাপিকা সিদ্দিকা কবীর ও ডা. আফজালুননেসাকে। ৫৫০ পৃষ্ঠার চার রঙা বইটির দাম দুই হাজার ৫০০ টাকা।

 

মায়ের হাতেই হাতেখড়ি

আলপনার রান্নায় হাতেখড়ি মায়ের হাতেই। তখন সে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। সিদ্দিকা কবীরের ‘রান্না খাদ্য পুষ্টি’ বইটি একদিন কিনে আনেন তার মা। বই দেখে কিছু কিছু রান্না করতে লেগে যান আলপনা। বাড়িতে মেহমান এলে মায়ের সঙ্গে নিজেও একটা পদ রাঁধতেন। বড় হতে হতে আলপনার রান্নার গুণের কথা ছড়িয়ে পড়ে। লোকজনের প্রশংসা শুনে রান্নার নেশা যেন চেপে বসল।  স্কুলে চাকরি করার সময় সহকর্মীরা অনুরোধ করল তাঁদের রান্না শেখাতে। তখন গুলশানের বাসায়ই ছয়জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে একটি রান্নার কোর্সের আয়োজন করেন। দিন দিন তাঁর ক্লাসে ছাত্রীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। আলপনা বললেন, ‘আমি চাই রান্নাকে সহজ করে দিতে।’

 

এবার টেলিভিশনে

‘কোনো দিন ভাবিনি টিভিতে রান্না নিয়ে কথা বলব। ঘটনাক্রমে এক দিন বড় বোন কল্পনা আনাম আমার ক্লাসে আসেন। আমার ক্লাস নেওয়ার ধরন তাঁর পছন্দ হয়। তিনি সারা যাকেরকে প্রস্তাব দেন আমাকে নিয়ে একটা রান্নার শো করতে। তিনি একটা টেস্টও নিলেন। সে পরীক্ষায় ভালোভাবেই পাস করি। তারপর দেশটিভির জন্য একে একে ১৯টি রান্নার অনুষ্ঠান করি। ব্যাপক সাড়া মেলে। একসময় দেখি আমার শোয়ের পর্বসংখ্যা ৪০০ হয়ে গেছে।’ বলছিলেন আলপনা।

 

আলপনা, একটা বই লেখো

২০১২ সালে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে রান্নার অনুষ্ঠানগুলো আপলোড করেন আলপনা। ইউটিউবে তাঁর চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার ৮৩ হাজার ৩৯৬ জন (১৭ জুলাই পর্যন্ত) এবং ভিডিওগুলো দেখা হয়েছে দুই কোটিবারেরও বেশি। তাঁর রান্নার পদ্ধতি এবং উপস্থাপন ভঙ্গি দেখে দেশ-বিদেশের অনেকেই অনুরোধ করেন—আলপনা, একটা বই লিখুন। আলপনা বললেন, ‘মূলত তখন থেকেই বই লেখার ব্যাপারটা মাথায় আসে। আরেকটা ব্যাপার হলো, অনেক বিদেশিও আমাকে ফেসবুক এবং ইউটিউবে ফলো করেন। কিন্তু আমি অনুষ্ঠান করি বাংলায়। বিদেশিরা তো বাংলা বোঝে না। তাই ঠিক করলাম, ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষায়ই বই লিখব।’

 

সবার আমি ছাত্রী

বইয়ের নাম যদিও আলপনা’জ কুকিং, তার পরও বইয়ের প্রতিটি রেসিপি সম্পূর্ণ নিজের বলে দাবি করেন না আলপনা। বললেন, ‘ফুটপাতে পরোটাওয়ালা, গৃহপরিচারিকা থেকে শুরু করে ফাইভ স্টার হোটেলের শেফ—সবার কাছ থেকে কিছু না কিছু শিখতে চেষ্টা করেছি। একবার ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলাম। দেখলাম এক নারী বসে পরোটা বিক্রি করছেন। ছেঁড়া ছেঁড়া সে পরোটা। লোকজনও বেশ আয়েশ করে খাচ্ছে। একদিন বাসায় এনে তাঁর কাছ থেকে সেটা বানানো শিখলাম। নাম দিলাম, ‘ছেঁড়া পরোটা’। এভাবে যখন যা খেয়ে ভালো লাগে রপ্ত করার চেষ্টা করি। কোনো কোনো সময় সেটাকে আরো সুস্বাদু করার জন্য নিজে নতুন কিছু যোগ করি। সব সময় চেষ্টা করি খাবারকে সুখাদ্য করে তুলতে। চাই খাবার দিয়ে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে। অনেকে মনে করেন, রান্না করা আর কী এমন কষ্টের কাজ। কিন্তু ভালো রাঁধুনি মাত্রই জানেন রান্নার ভেতরে ফিজিকস, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ—সবই আছে। এখন আমার শেলফ ভর্তি বিভিন্ন দেশের রান্নার বই। ঘুরতে খুব পছন্দ করি। পৃথিবীর যে প্রান্তেই গেছি রান্নার বই পেলে কিনেছি।’ শাশুড়ি সৈয়দা নীলুফার হোসেনের থেকেও শিখেছেন আলপনা। বড় খালা শাশুড়ি সৈয়দা সেলিনা আলমের রান্নারও খুব ভক্ত তিনি। শ্বশুর সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন বলতেন, ‘আলপনা আসার পর কী যে হলো, কোনো রেস্টুরেন্টে খেয়েই আর মজা পাই না।’ অল্প সময়ের জন্য অধ্যাপিকা সিদ্দিকা কবীরের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। বললেন, ‘তাঁর সঙ্গে কিছু ওয়ার্কশপে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তিনি একদিন বললেন, ‘আলপনা, এত দিনে আমি একটা মনের মতো সঙ্গী পেলাম।’

 

আরেকটা বই লিখব

১৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে বইয়ের একটি কপি তুলে দিয়েছেন আলপনা হাবিব। গোরমন্ড অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন জেনে প্রধানমন্ত্রী খুবই খুুশি হয়েছেন, উৎসাহ জুগিয়েছেন। লেখালেখি চালিয়ে যেতে চান। আগামীতে বিদেশিদের জন্য সহজ করে বাংলাদেশি রান্নার একটা বই লিখবেন। যাঁরা বাংলাদেশি রান্না শিখতে চান, তাঁদের কাজে দেবে এটা।

 

একজন আলপনা হাবিব

জন্ম ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে। বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। ঘুরতে ভালোবাসেন। থাই এয়ারলাইনস ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসে চাকরি করেছেন। কিছুদিন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলেও কাজ করেছেন। স্বামী সৈয়দ আহসান হাবিব একজন ইলেকট্টিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। অরিত্র ও আদৃত নামে দুই ছেলে তাঁদের। দেশি পত্রপত্রিকা ছাড়াও কলকাতার হ্যাংলা হেঁশেল রন্ধন সাময়িকীতেও বহুবার তাঁর রেসিপি প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৭ সালে উইমেন ইন লিডারশিপ ও ব্র্যান্ড ফোরাম কর্তৃক ‘ইনস্পায়ারিং উইমেন ইন কুলিনারি আর্ট’ নির্বাচিত হন।

মন্তব্য