kalerkantho

বড় মাঠের এপার-ওপার

এপারে কৌশিকের দাদাবাড়ি, ওপারে নানাবাড়ি। মাঝখানে বড় মাঠ। কৌশিককে আমরা মাশরাফি নামে চিনি। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বড় মাঠের এপার-ওপার ঘুরে বেড়িয়েছেন সাইফুল ইসলাম তুহিন। খুঁজেছেন মাশরাফির আপনজনদের

২২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বড় মাঠের এপার-ওপার

কৌশিকের জন্ম নানাবাড়িতে। নড়াইল শহরের আলাদাতপুরে। নানা ছিলেন স্বনামধন্য আইনজীবী। নাম অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান। নানি নাজমুন আরা খালেদার কাছেই বেড়ে উঠেছেন কৌশিক। নানি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। নানির কোলে চড়ে কৌশিক যেতেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বড় মাঠের পাশেই ছিল স্কুলটি। হাই স্কুলটিও কাছেই। প্রাইমারি শেষে কৌশিক গেলেন হাই স্কুলে।

 

কৌশিকের ইউসুফ ভাই

মাশরাফির নজরুল ভাই  

নানাবাড়ির পাশেই ইউসুফ ভাইয়ের চায়ের দোকান। কৌশিক ইউসুফ ভাইয়ের সঙ্গে বেলা পার করেছেন। এখনো মাশরাফি বাড়ি গেলে ইউসুফ ভাইয়ের দোকানে বসে আড্ডা দেন বলতে গেলে সারা দিন। ইউসুফ ভাই বললেন, ‘প্রাইমারিতে পড়ার সময় কিছু খাবার দরকার পড়লে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যেত। কলেজে পড়ার সময় পর্যন্তই এমনটা চালু ছিল। বড় হয়েও  আমার এখানেই যত আড্ডা। তবে এমপি হওয়ার পরে এতে কিছু ছেদ পড়েছে। পুলিশের একটা দল তাঁর সঙ্গে থাকে সব সময়। তাই আড্ডা সে রকম হয় না।’  নানাবাড়ি থেকে পূর্বদিকে হেঁটে গেলে সরকারি বালক বিদ্যালয়। সেটি পার হলে নজরুল বয়াতির দোকান। নড়াইলে এলে মাশরাফির নজরুল ভাইয়ের দোকানে এক কাপ চা খাওয়া চাই। নজরুল বললেন, ‘আমার দোকানে এসে বন্ধুদের নিয়ে চেয়ারে বসে। চা খায়, গল্প করে। বিশ্বকাপ খেলতে ইংল্যান্ড যাওয়ার পর এই সেদিন বন্ধু সাজুর সঙ্গে ভিডিওকলে কথা বলল। সাজু তখন আমার দোকানেই ছিল। আমার সঙ্গেও একটু কথা বলল। আমি বললাম, আমার ছেলেকে একটা চাকরি দিতে হবে। তিনি হাসিমুখে বললেন, আমি দেশে ফিরে চেষ্টা করব।’

 

বন্ধু রবি

নানাবাড়ির পাশেই ঋষিপল্লী। রবি এই পাড়ার ছেলে। মাশরাফির বাল্যকালের বন্ধু। সে এখন চৌরাস্তায় মেহগনিগাছের তলায় জুতা-স্যান্ডেল সেলাই করে। কিছুদিন হলো শহীদ মিজান সড়কে একটি ঘর নিয়েছে। রবির বোনের বিয়ে থেকে শুরু করে জুতার দোকান—সবখানেই কৌশিক সহায়তা দিয়েছে। রবি বলছিলেন, ‘ছোটবেলায় আমরা চরের ঘাটে গোসল করতে যেতাম। প্রতিদিনই ছয়-সাতবার নদী এপার-ওপার করতাম। আমি এক দিন মাঝনদীতে ডুবে যাচ্ছিলাম, পানি খাওয়া শুরু করেছি, এমন সময় কৌশিক এসে টেনে তোলে। পাড়ে নিয়ে যায়। আমাকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে ফাইভ স্টার হোটেলে রেখেছিল। হোটেলের সবাই আমাকে স্যার স্যার বলত। খুব লজ্জা পেতাম। এমপি হওয়ার পরদিনই ঢাকায় রওনা হয়েছিল। বিশাল বহর তাঁকে ঘাটে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল। সে এসে কি না থামল আমার এই মেহগনি তলায়। আমি আরেক জায়গায় ছিলাম। দৌড়ে কাছে এলাম। আমাকে বকুনি দিয়ে বলল, কোথায় থাকিস রবি? আমি ঢাকায় যাচ্ছি। ভালো থাকিস। আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল।’ 

 

মোল্লা মামা

মন্নু মোল্লা। নড়াইল কাঁচাবাজারের ফল ব্যবসায়ী। নজরুল বয়াতির চায়ের দোকান থেকে ১০০ গজ সামনে তাঁর ফলের দোকান। নির্বাচনে মাশরাফির জন্য ভোট চেয়ে লোকদের বিনে পয়সায় ফল খাইয়েছেন। বললেন, ‘নির্বাচনে জেতার পরদিন সকালে আমি একটি ফুলের মালা নিয়ে গেছি পরানোর জন্য। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাছে পৌঁছাতে পারিনি। মালা নিয়ে হতাশ মনে ফিরে যাচ্ছিলাম। বয়েজ স্কুলের সামনে যেতেই দেখি পেছন থেকে গাড়ি থামিয়েছে কৌশিক। আমাকে বলছে, মামা ভিড়ে মালা দিতে না পেরে রাগ করে চলে যাচ্ছেন? দ্যান বলে আমার কাছ থেকে মালা নিল, পাশে তাঁর বউ বসা, সে-ও বলল, খালি ভাগ্নেরে দোয়া করলে হবে? আমি আর ছেলে-মেয়েরা কি দোষ করলাম? তখন আমি সবার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করলাম। আল্লাহ যেন আমাদের কৌশিককে সারা জীবন শান্তিতে রাখে।’

 

শিক্ষক আঞ্জুমান আরা

বড় মাঠের পাশে শিল্পকলা একাডেমি। তারপর নিলয় সরণি। মাশরাফির ছেলেবেলার শিক্ষক আঞ্জুমান আরা থাকেন সেখানে। নানির সহকর্মী। বয়স প্রায় ৬৫। অঙ্ক পড়াতেন আঞ্জুমান আরা। শান্ত স্বভাবের ছিল মাশরাফি। বললেন, ‘দুষ্টুমি তেমন একটা করত না, এক দিন ক্লাসে আমি যখন  অঙ্ক করাচ্ছি, তখনো অন্যমনস্ক হয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, কৌশিক তুমি বাইরে তাকিয়ে কী দিখছ? সে উত্তর দিল, আপা বাইরে ছেলেরা বল খেলছে, তা-ই দেখছি। আমার নাতি নিলয় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে খবর পায় কৌশিক। নড়াইলে এসেই বাড়িতে ছুটে আসে। আমাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। নিলয়ের ছবি দেখে কেঁদে ফেলে। এত নরম মনের ছেলে, ওর জন্য দোয়া করি।’

 

মায়ের সঙ্গে মাশরাফি

মায়ের নাম হামিদা

হামিদা মোর্তজা মাশরাফি বিন মোর্তজার মা। লেখাপড়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। শাসনও কম করেননি। কিন্তু যখন থেকে ছেলে খেলাধুলায় মন দিয়েছে, তখন থেকে নিজের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। ছেলে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছে, ঢাকায় থাকতে হবে। তাই ছেলের যেন কোনো অযত্ন না হয় সে জন্যই চাকরি ছাড়া। পরে অবশ্য আবার নড়াইলে ফিরে আসেন। এখন মাশরাফির করে দেওয়া বাড়িতে দিন কাটে তাঁর। বললেন, ‘এমনিতেই ছোটবেলা থেকে একটু বেশি বন্ধুপাগল। ঈদে নড়াইলে এলে আমার বাবার বাড়িতেই সময় কাটায়। সারা দিন আড্ডা মেরে যত রাতই হোক বাড়িতে আসবে আমার হাতের সেমাই খেতে।’

 

ওস্তাদ শরীফ মোহাম্মদ

মাঠের পশ্চিম পাশে কবরস্থান সড়ক, পূর্বপাশে শহীদ মিজান সড়ক, আর উত্তরে মুন্সী ওয়ালিউর রহমান সড়ক। ওয়ালিউর রহমান সড়কেই মাশরাফির দাদাবাড়ি। দক্ষিণে নড়াইল-যশোর রোডে নানাবাড়ি। বড় মাঠের সঙ্গে ব্যায়ামাগার, তার পাশে হ্যান্ডবল মাঠ। বড় মাঠেই ক্রিকেটে হাতেখড়ি।  কৌশিক তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বড় মাঠে কৌশিকের ওস্তাদ শরীফ মোহাম্মদ  বলছিলেন, ‘সিক্স থেকেই কৌশিক স্কুল ক্রিকেট দলের সদস্য হয়। নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটে আমরা বিভিন্ন জায়গায় খেলতে গেছি। একবার নড়াইল ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে একটি খেলায় পাঁচটি উইকেট নেয় কৌশিক। আবার ৫০ রানও করে। সেই খেলায় ও ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিল। ওর হাত থেকে কখনোই ক্যাচ ছোটেনি। আগের  মতোই এখনো আমাকে ওস্তাদ মনে করে কৌশিক। ওর জন্য আমার গর্ব হয়।’

মন্তব্য