kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

বিড়ালের মা

পশু-পাখির জন্য তাঁর অনেক মায়া, বিশেষ করে বিড়ালের জন্য। ৫০টি লালন-পালন করেন। তিনি পাবনার আলেপা খাতুন। মুহাম্মদ শফিকুর রহমান তাঁর গল্প বলছেন

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিড়ালের মা

তখন আলেপা স্কুলে পড়েন। পথের ধারে একটি বিড়াল পড়ে থাকতে দেখেন। সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে আসেন সেটি। অসুস্থ বিড়ালটিকে সেবা-যত্ন দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। তার পর থেকে আজ প্রায় ৪০ বছর হতে চলল। কোনো কোনো সময় তিনি কুকুর, শিয়াল, বেজি, ভেড়া, মেছোবাঘও পুষেছেন। তবে বিড়ালের জন্য তাঁর বিশেষ মায়া। বললেন, বিড়ালই বেশি ভালোবাসি। ওরা আমার কথা বুঝতে পারে।

 

বিড়ালের মা

এলাকার মানুষের কাছে আলেপা খাতুন বিড়ালের মা। তিনি চাটমোহর পৌরসভার ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনে পরপর দুবার নির্বাচিত কাউন্সিলর। কাউন্সিলর হিসেবে যে কয় টাকা সম্মানী পান, তা বিড়ালের জন্যই খরচ করেন। এখন তাঁর কাছে ৪০টি বিড়াল আছে। তার মধ্যে ছোট বাচ্চা ১০টি। যতক্ষণ পর্যন্ত বিড়ালগুলোর খাওয়া শেষ না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত নিজে মুখে খাবার তোলেন না। দুই কামরার একটি টিনের ঘর তাঁর। একটিতে বিড়ালগুলো নিয়ে নিজে থাকেন, অন্যটিতে তাঁর একমাত্র ছেলে মহরম থাকে। 

 

সেসব কষ্টের দিন

পঁচিশ বছর আগে স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। তখন ছেলের বয়স মাত্র এক মাস। বিড়ালগুলোকে দিয়েই দুঃখ ভুলে থাকতেন। নাম ধরে ডাকলেই ওরা কাছে চলে আসে। তাঁর সঙ্গে দুষ্টুমি করে। মাঝেমধ্যে বিড়ালের সঙ্গে বলও খেলেন। খাবার দিতে দিতে কোনো একটিকে হয়তো বলেন, ‘বাবা, আজ সারা দিন কী কী করলে? কোথায় কোথায় গেলে? তোমার ভাইকে দেখছি না।’ আরেকটিকে হয়তো বলেন, ‘তুমি কিন্তু শরীরের দিকে নজর দিচ্ছ না। বেশি দুষ্টুমি করলে বকা খাবে।’

কোনো কোনো রাতে ওদের খাবার খাওয়াতে রাত ১২টাও বেজে যায়।

 

আলেপাই ভরসা

বিড়াল বাচ্চা দিলে ঘর নোংরা হয়। অনেকের অপছন্দ বিড়াল। তারা ওগুলোকে আলেপার বাড়ির সামনে ফেলে রেখে যায়। আর আলেপা তা পরম মমতায় কোলে তুলে নেন। দিনকয় আগেই যেমন কয়েকটি বিড়াল ছানা পেলেন ডাস্টবিনের মধ্যে। চোখও ফোটেনি সেগুলোর। বসে বসে কাঁদছিল। ধুয়ে-মুছে আলেপা তাদের ঘরে নিয়ে আসেন। আদর-যত্নে ওরা এখন বেশ তরতাজা হয়ে উঠেছে। 

 

ওদের জ্বালায় ঘুমাতেও পারেন না

ছোট বিছানা। একজন মানুষই ভালোমতো ঘুমানো মুশকিল। সেখানে আলেপা বিড়াল নিয়ে থাকেন। মশারি টানিয়ে দেন, যেন ওরা আরামে ঘুমাতে পারে। নিজের ঠিকমতো ঘুমানো হয় না। কয়েকবার বিছানা থেকে পড়েও গেছেন। তবু বিড়ালের যেন কষ্ট না হয় সেদিকেই তাঁর খেয়াল। বিড়ালগুলো মারামারি করলে শাসনও করেন। তিনি রাগ করলে ওরা বুঝতে পারে; এমনকি গালি দিলেও বোঝে। আলেপাই জানিয়েছেন।

 

খরচ অনেক

প্রতিদিন সাড়ে তিন কেজি চাল, তিন কেজি মাছ লাগে। অসুস্থ হলে ওদের যথাযথ চিকিৎসাও করান। অ্যালার্জি হলে কম করেও এক শ টাকার ওষুধ লাগে। হিমশিম খেয়ে যান। ছেলের কাছে হাত পাততে লজ্জা লাগে। বলছিলেন আলেপা খাতুন। ‘ওষুধ দিলে ওরা বুঝতে পারে এটা ওষুধ। সময়মতো খেয়ে যায়।’ অন্যের বাড়িতে আলেপার বিড়ালরা কিছু খায় না। শুধু আলেপার হাতেই তারা খায়।

 

কুকুরের জন্য

মাঝেমধ্যে হাড় খেতে গেলে কুকুরের মাড়িতে তা ঢুকে থাকে। দাঁতের সঙ্গে আটকে থাকে। ভীষণ কষ্ট পায়। অনেক সময় মাড়িতে পচন ধরে। চাটমোহরের প্রায় শতাধিক কুকুরের মাড়ি থেকে হাড় বের করেছেন আলেপা। মাড়িতে হাড় নিয়ে কুকুরগুলো আপনা থেকেই তাঁর কাছে চলে আসে। পিছু পিছু ঘুরতে থাকে। তিনি কিছু একটা আন্দাজ করে বলেন, শুয়ে পড়ো। তখন আস্তে করে হাড় তুলে দেন। ওরা একটুও নড়ে না। পরে তুলে ফেলা হাড় ফেলে দিলে তা চেয়ে চেয়ে দেখে।

 

কেউ কথা রাখেনি

বিভিন্ন সময় বিভিন্নজন এসেছেন। আলেপার প্রাণী প্রেমের প্রশংসা করেছেন। সাহায্য দেওয়ার কথাও বলেছেন; কিন্তু সেভাবে সাহায্য পাননি কারো কাছ থেকেই। তবে থানা নির্বাহী অফিসার অসীম কুমার তিনটি কম্বল আর পাঁচ কেজি চাল দিয়েছিলেন। চাটমোহর সরকারি কলেজের প্রভাষক মনজুর রশীদ জানান, আলেপা খাতুনের এমন পশুপ্রেম সবাইকে মুগ্ধ করেছে। জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব ঠিক ঠিক পালন করে এত বিড়াল দেখভাল করা সত্যিই কঠিন কাজ।

 

ছবি : লেখক

মন্তব্য