kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

অবাক পৃথিবী

যে নাচ ওদের ভীত করেছিল

টয়ি টয়ি একটি নাচের নাম। দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ আশির দশকে টয়ি টয়ি নেচেই শ্বেতাঙ্গ শাসকদের ভয় পাইয়ে দিয়ে ছিল। বিবিসির মেলিসা টুইগ সেসব দিনে ফিরে যেতে চেয়েছেন

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যে নাচ ওদের ভীত করেছিল

২০১৮ সালের শুরুতে যখন বারাক ওবামা দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন, তখন একটি রসিকতা করেছিলেন সিরিল রামাফোসা। বলেছিলেন, ‘ওবামা এক জায়গায় আমাদের থেকে পিছিয়ে, সেটি হলো নাচ।’ দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিবিদরা মিছিলে, সমাবেশে, এমনকি আইন পরিষদেও নাচেন।

আমার (মেলিসা টুইগ) খুব মনে আছে ছোটবেলার কথা। জোহানেসবার্গে আমার জন্ম আশির দশকে। আমাদের  সচ্ছল শ্বেতাঙ্গ পরিবার। ঘরে বসেই ড্রামের বাদন শুনতাম, যা শহরের এদিক-ওদিক বাজত। এই বাজনা পুলিশকে ভয় পাইয়ে দিত। তারা সাততাড়াতাড়ি সাজপোশাক পরে বিপদ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকত অথবা ছুটত যেখান থেকে বাজনা আসছে সেদিকে।

আশির দশকের শেষে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে আমরা লন্ডনে পাড়ি জমালাম। লন্ডনে বসে বসে আমার মা-বাবা সারাক্ষণ বিবিসির খবর দেখতেন। বিবিসির পর্দায় তখন দক্ষিণ আফ্রিকার খবরই ছিল বেশি। আর সেসব খবর মাঝেমধ্যেই দুলে উঠত টয়ি টয়ি নাচে।

পৃথিবীব্যাপী দেশে দেশে নাচ ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা বা আশা প্রকাশ করে। আফ্রিকাই বুঝি ব্যতিক্রম, যারা নাচকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে। নাচ সেখানে ক্ষমতাহীনদের একটি শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। শ্বেতাঙ্গ শাসকদের বিরুদ্ধে কিছু বলার বা করার ব্যাপার থাকলে তারা একসঙ্গে হয়ে নাচত। জ্যাজ শিল্পী হিউ মাসেকেলা বলছিলেন, ‘ওদের (পুলিশদের) শক্তির উৎস ছিল অস্ত্র আর আমাদের নাচ ও গান।’

একসঙ্গে অনেক মানুষ টয়ি টয়ি নাচে। নির্দিষ্ট ছন্দে হাঁটু ওপরে তোলে আর খুব শব্দ করে মাটিতে পা ফেলে। মাঝেমধ্যে একজন আওয়াজ তোলে, আমান্ডলা মানে ক্ষমতা; অন্যরা উত্তরে বলে, অয়েথু মানে জনগণের।

স্টেলেনবোস বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গ্যাভিন ওয়াকার বলছিলেন, বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে টয়ি টয়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এটি তখন হয়ে উঠেছিল একটি দারুণ সাংস্কৃতিক হাতিয়ার। সত্তরের দশকে দক্ষিণ আফ্রিকায় এটি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। মানুষের মনে কষ্ট জমছিল দিন দিন; কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশের পথ খোলা ছিল না। তাই টয়ি টয়ি পেয়ে মানুষ হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল। নেচে নেচে বলছিল, ‘আমাকে আমার জায়গা বুঝিয়ে দাও।’ আমার মনে পড়ছে বের্টল্ট ব্রেখটের কথা—শিল্প সমাজের আয়না নয়, বরং একটি হাতুড়ি, যা সমাজকে আকার দেয়।   

টয়ি টয়ি নতুন দক্ষিণ আফ্রিকা গড়তে সাহায্য করেছিল। তবে এর আবিষ্কার কিন্তু রোডেশিয়া মানে জিম্বাবুয়েতে। রোডেশিয়ার মুক্তিযোদ্ধারা এর আবিষ্কর্তা। অল্প দিনেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। পুলিশের সঙ্গে নিত্যযুদ্ধের হাতিয়ার বনে গিয়েছিল। গ্যাভিন ওয়াকার বলছিলেন, ‘টয়ি টয়ি সীমান্ত অতিক্রমের পরই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কৃষ্ণাঙ্গদের সংগীত ছাড়া সেভাবে আর হাতিয়ার ছিল না। অথচ দাঁড়াতে হচ্ছিল ভারী অস্ত্রের মুখে।’

টয়ি টয়ি দৃষ্টিনন্দন নাচ। ১৯৯৪ সাল ছিল সেটা। জোহানেসবার্গে নেলসন ম্যান্ডেলা বলছিলেন ভালোবাসা ও আশার কথা। লাখ লাখ মানুষ ছিল তাঁর সামনে। মানুষগুলো নাচছিল টয়ি টয়ি। মনে হচ্ছিল সমুদ্রে ঢেউ উঠেছে। প্রত্যুত্তরে তিনিও নাচলেন। প্রতিবাদের নাচ তখন উদ্যাপনের উপকরণ।

সোয়েটোর নৃত্যশিল্পী থেম্বা এমবুলি বলছিলেন, ‘আমার মনে হয় টয়ি টয়ি সাহস আর ঐক্যের নাচ। আমরা যখন ভীত ছিলাম, তখন টয়ি টয়ি আমাদের একত্র করেছিল। একসঙ্গে হওয়ার পর আমাদের মনে সাহস তৈরি হয়েছিল।’

চুরানব্বইয়ের ২৪ বছর পর, মানে গত বছর আবার টয়ি টয়িতে নেচে উঠেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। বলেছিল, ‘জুমা তুমি ঘরে যাও।’ সেইবার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার দুর্নীতির বিরুদ্ধে পথ ছিল টয়ি টয়ির দখলে। নাচিয়েরা নেতাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতে চেয়েছিল।

আমার (মেলিসা টুইগ) মা-বাবা কেপটাউনে ফিরেছেন বছর কয় হলো। টেবল মাউন্টেনের পাদদেশে কাটছে তাঁদের সুখের দিন। জুমার বিরুদ্ধে যখন নাচছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, তখন আমিও ছিলাম কেপটাউনে। আমি ফিরে গিয়েছিলাম চুরানব্বই বা তারও আগে। সময় বদলেছে, শাসক বদলেছে; কিন্তু সুদিন তো আসেনি। তাই টয়ি টয়ির গুরুত্ব কমেনি। এবার টয়ি টয়ি যত না প্রতিবাদী ছিল, তার চেয়েও বেশি আবেগঘন ও দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত। জোহানেসবার্গের নৃত্যশিল্পী জর্জিনা টমসন বলছিলেন, ‘আমরা শাসকদের জানিয়ে দিলাম হাল ছাড়ব না কিন্তু। আমরা একত্রে আছি সেদিনের মতোই, যেদিন ম্যান্ডেলা আমাদের সঙ্গে নেচেছিলেন।’

এখন টয়ি টয়ি দেখতে পাবেন বিয়ের অনুষ্ঠান আর জন্মদিনেও। ডাকঘরে লম্বা লাইন পড়লেও লোকে টয়ি টয়ি নাচে। ২০১৩ সালে ম্যান্ডেলার মৃত্যু মিছিলেও জোহানেসবার্গ টয়ি টয়ি নেচেছিল। অনুষ্ঠানভেদে টয়ি টয়ির ভাষা বদল হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে যেমন আনন্দ প্রকাশ করে আবার রাজপথে দাবি আদায় করে ছাড়ে।

অনুবাদ ও গ্রন্থনা : আহনাফ সালেহীন

মন্তব্য