kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

যশোরের রস পাটালি

খেজুরের রস যশোরের যশ। এই রস থেকে যে রস পাটালি হয় তা স্বাদে, ঘ্রাণে অনন্য। বাঙালির এক অমূল্য সম্পদ। ফখরে আলম জানতে চেয়েছিলেন কিভাবে তৈরি হয় এই রস পাটালি

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




যশোরের রস পাটালি

‘বউ ঠিলা ধুয়ে দে, গাছ কাটতি যাবো

সন্ধ্যি রস পাড়ে আইনে জাউ রান্দে খাবো।’

—এমন গান যশোরের গ্রামে গ্রামে এখনো শোনা যায়। যশোরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে খেজুরের রস, গুড় আর পাটালি জড়িয়ে আছে খুব করে। শীত মৌসুমে এখনো নলেন পাটালির খুশবুতে মাতোয়ারা হয় গৃহস্থবাড়ির উঠান। কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে গাছি খেজুর গাছ থেকে রস নামিয়ে আনেন। গাছিবউ সেই রস তাতালে ঢেলে জ্বাল দেন। তৈরি করেন পাটালি গুড়। আর সেই পাটালিতে তৈরি হয় পিঠা বা পায়েস। যশোরের অনেক গ্রামে মণকে মণ গুড় পাটালি তৈরি হয়। এর মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের পাটালি হলো রস পাটালি। ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই যায় এই পাটালি।

 

খাজুরার রস পাটালি

শুধু যশোর সদর উপজেলার কয়েকটি গ্রামে (তেজরোল, মনোহরপুর, বৃত্তিকা, লেবুতলা, এনায়েতপুর, আগ্রাইল) আর বাঘারপাড়া উপজেলার কিছু গ্রামে (মির্জাপুর, চণ্ডিপুর, খলিয়া, সেকেন্দারপুর, পান্তাপাড়া, মথুরাপুর, তেলিধান্যখোলা আর খাজুরা বাজারের আশপাশে) রস পাটালি তৈরি হয়। এর ওপরটা শক্ত হলেও ভেতরটা রসে টলমল। এটি তৈরিতে বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন। আগে খাজুরা অঞ্চলের মেয়েদের এই পাটালি তৈরি শেখানো হতো না। বাইরের লোকদের কাছে এর কলাকৌশল ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়েই এই ব্যবস্থা। আজও কোনো কোনো গাছি পরিবারে এটা চালু আছে। অভিজ্ঞ প্রবীণ গাছিরা বলতে চান না ভেতরের রহস্য। ওই গ্রামগুলোর ৫০ জন গাছি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করছেন রস পাটালি।

 

প্রস্তুত প্রণালী

অগ্রহায়ণ মাসে খেজুরগাছ ছিলা হয় (একদিকে কয়েকটি পাতা ছাল-বাকলসহ ধারালো দা দিয়ে কেটে ফেলা হয়)। এর এক সপ্তাহ বা ১০ দিন পর ওই একই স্থানে আবার ছিলা হয়। তারপর রস নামানোর জন্য পোঁতা হয় নলি। এর সাত দিন পর আবার ছিলা হয়। এর দুই-চার দিন পর গাছ কাটা হয় (গাছ কাটার ফলে রস নামতে শুরু করে)। দুপুরের দিকে মাটির ঠিলা পরিষ্কার করে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে এরপর ধানের নাড়া দিয়ে আগুনে সেই ঠিলা পোড়ানো হয়। বিকেলে গাছ কেটে রসের জন্য ঠিলা ঝোলানো হয়। পরদিন সূর্য ওঠার আগে আগেই গাছ থেকে রস নামানো হয়। এই রস গাছিরা বাড়ির উঠানে নিয়ে যান। সেখানে তাতালে (এক ধরনের লোহার তৈরি চার কোনা কড়াই) রস জ্বাল দেওয়া হয়। রস গুড়ের মতো হলে কোনো মাটির গর্ত, কুলা, প্লেটে ঢালা হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে নরম গুড় শক্ত হয়ে পাটালিতে রূপান্তরিত হয়। সরুইডাঙ্গা গ্রামের প্রবীণ গাছি আবুল খায়ের বিশ্বাস (৬১) ৪১ বছর ধরে গাছ কেটে রস নামাচ্ছেন। বললেন, ‘সাধারণত জিরেন রস (প্রথম দিনের রস) দিয়ে রস পাটালি তৈরি হয়। পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন এই তিন মাস ভালো রস পাটালি হয়। কিন্তু গরম পড়লে পাটালি জমে না।’ ওই গ্রামেরই গৃহবধূ পলি খাতুন ও শিলা বেগম বললেন, ‘প্রথমে ফাতড়া (খেজুর গাছের আঁশজাতীয় পর্দা) দিয়ে রস ছাঁকা হয়। এরপর ধীরে ধীরে জ্বাল দেওয়া হয়। সাধারণত নাড়া ও খেজুরপাতা দিয়েই আমরা রস জ্বাল দিই। রস পাটালি বানানোর অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। জিরেন রস না হলে রস পাটালি হবে না। আর এই পাটালি তৈরির জন্য অনেক ধৈর্য লাগে।’ এনায়েতপুর গ্রামের গাছি শরিফুল বললেন, ‘গাছের পাঁচ-ছয় বছর বয়স হলেই আমরা গাছ কাটা শুরু করি। এখন রস পাটালি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২০০ টাকায়। এই দামে পাটালি বিক্রি করলে লোকসান হয়ে যায়; কিন্তু আমাদের নেশা ধরে গেছে। গাছ কেটে রস নামাতে না পারলে মন খারাপ হয়।’ 

 

যশোরের যশ খেজুরের রস

ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯০০-১৯০১ সালে পূর্ববঙ্গে খেজুরের গুড় তৈরি হয়েছে ২১ লাখ ৮০ হাজার ৫৫০ মণ। এর মধ্যে শুধু যশোরেই তৈরি হয়েছে ১৭ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ মণ গুড়। ১৮৬১ সালে চৌগাছা উপজেলার কপোতাক্ষ নদের পারে তাহিরপুরে প্রথম খেজুরের গুড় উত্পাদনের যান্ত্রিক কারখানা গড়ে ওঠে। ওই কারখানার উত্পাদিত গুড় সে সময় ইউরোপে রপ্তানি হয়েছে। পরে যশোরের বিভিন্ন গ্রামে ১১৭টি কারখানা গড়ে ওঠে।’

গুড় পাটালি দুধ-ভাত দিয়ে খাওয়া যায়। এ ছাড়া পিঠা-পায়েসে শত শত বছর ধরে এর ব্যবহার হচ্ছে। ১৯০০ সালের দিকে এই গুড় দিয়ে কলকাতার বিখ্যাত মিষ্টির দোকান ভীমনাগ সন্দেশ তৈরি করা শুরু করে। তবে এখন ইটভাটা, গাছি সংকট, ধান-সবজি চাষ ইত্যাদি কারণে যশোরের খেজুরের গুড় হারিয়ে যেতে বসেছে। পাশাপাশি অসত্ ব্যবসায়ীরা খেজুর গুড়ে চিনি মেশানোর কারণে চিরচেনা সেই স্বাদও আর থাকছে না।

বন বিভাগ থেকে যশোরাঞ্চলে ২২ লাখ খেজুর গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, যশোরে সাত লাখ ৯১ হাজার ৫১৪টি খেজুরগাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে প্রতিবছর চার হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন গুড় ও ৪০ মেট্রিক টন রস উত্পন্ন হয়। এখন যশোরের খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য রক্ষায় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ছাড়াও জেলা প্রশাসন এগিয়ে এসেছে।

     ছবি : ফিরোজ গাজী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা