kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

তোমায় দিলাম

এই নাও একাত্তর

মুক্তিযোদ্ধা স ম বাবর আলী। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা বইগুলোয় দেখলেন অনেক ভুল। তাই তিনি নিজেই কলম ধরলেন। লিখলেন খুলনা অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। বই হয়ে সেটি প্রকাশিত হলো। নাম ‘স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান’। নতুন প্রজন্মের জন্য এটা তাঁর উপহার। গৌরাঙ্গ নন্দী শুনে এসেছেন তাঁর যুদ্ধদিনের গল্প

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এই নাও একাত্তর

মুক্তিযোদ্ধা স ম বাবর আলী (এখন ও একাত্তরে)

একাত্তরে বাবর আলী তেইশ বছরের যুবক। ব্রজলাল (বিএল) কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি (সহসভাপতি)। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, খুলনা জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক। সত্তরের নির্বাচনের ফল মেনে না নেওয়ার টালবাহানা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়, যুদ্ধ ছাড়া পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না।

২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাকিস্তানি সেনারা রাজধানী ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়ার্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশেষ বিশেষ জায়গায় আক্রমণ করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে। এ খবর খুলনায় এসে পৌঁছলে ছাত্রনেতারা কিছু একটা করার জন্য ভাবতে থাকেন। প্রথমে তাঁরা একটি দোকান ভেঙে কয়েকটি বন্দুক সংগ্রহ করেন। কিন্তু যুদ্ধের জন্য চাই আরো অনেক অস্ত্র। শেষে কামরুজ্জামান টুকুর পরামর্শ নিয়ে স ম বাবর আলীসহ তিনজন ভারতে যান। কলকাতায় পৌঁছার পর ভারতীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে ধরা পড়েন। অবশ্য একপর্যায়ে তাঁদের নেতৃস্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়। তবে জানিয়ে দেওয়া হয়, অস্ত্র দেওয়া হবে না। বাবর আলীরা ফিরে আসেন।

 

যোদ্ধা ও যুদ্ধের জীবন

দেশে ফিরে দেখেন পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে চলেছে। মুসলিম লীগের সমর্থক আর বিহারিরাও এ হত্যাযজ্ঞে শামিল হয়েছে। দিকে দিকে লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ আর মানুষের ওপর অত্যাচার, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ ছিল ভয়াবহ। তারা দলে দলে ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে পাড়ি দিচ্ছিল। পাল্টা আক্রমণ ছাড়া এ থেকে মুক্তির রাস্তা নেই। ছাত্রনেতারা সিদ্ধান্ত নেন, একটি অংশ ভারতে যাবে। যুদ্ধের জন্য অস্ত্র জোগাড় করবে, প্রশিক্ষণ নেবে। বাবর আলীসহ আরো কয়েকজন দেশেই থেকে যান; কিন্তু হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা তো যায় না। তাই নানাজনের কাছ থেকে অস্ত্র জোগাড়ে নেমে পড়েন। প্রায় আড়াই শ বন্দুক জোগাড় হয়। ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) কমান্ডারদের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণও শুরু হয়। অস্ত্রচালনার প্রাথমিক জ্ঞান, পালানোর কৌশল, আক্রমণের কৌশল ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল। প্রশিক্ষণ খুব কঠিন ছিল। ৫১ জন শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত স ম বাবর আলীসহ মাত্র ১৪ জন টিকেছিলেন। এর মধ্যে সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকা ভোমরায় স ম বাবর আলীরা পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) যোদ্ধারাও ওই যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। খুলনা জেলার পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ ও আশাশুনি নিয়ে গঠিত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা ২৩টি ক্যাম্প গড়ে তোলেন। এরই মাঝে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকে চলে আসেন, আবার অনেকে প্রশিক্ষণ নিতে যান। পাশাপাশি শত্রুদের ওপর অতর্কিত আক্রমণও চালাতে থাকেন।

আগস্ট মাসের দিকে ভারত থেকে প্রশিক্ষিত বড় একটি মুক্তিযোদ্ধার দল দেশে আসে। তার পরই শুরু হয় পরিকল্পিত যুদ্ধ। অবশ্য খুলনা অঞ্চলে সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর যুদ্ধটি ছিল কপিলমুনিতে রাজাকার বাহিনীর ঘাঁটি ধ্বংসের যুদ্ধ। ডিসেম্বরের শুরুর দিকের ওই যুদ্ধের পর খুলনার রাজাকাররা দিশাহারা হয়ে যায়।

 

যুদ্ধ শেষ হলে

১৯৭২ সালে বাবর আলী ছাত্রলীগের খুলনা জেলার সভাপতি নির্বাচিত হন। তিয়াত্তরে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি পাইকগাছা আসনে নির্বাচন করেন। তিনি তখন সবচেয়ে কম বয়সী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। চুয়াত্তরে যুবলীগ খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছিয়াত্তরে ২১ মাস এবং আটাশিতে পাঁচ মাস কারাভোগ করেন। এখন তিনি পাইকগাছা উপজেলার চেয়ারম্যান।

 

লিখলেন যুদ্ধের কথা

স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩২০। খুলনা অঞ্চলের ছোট-বড় সব যুদ্ধের কথা আছে বইটিতে। জায়গাগুলোয় ঘুরে ঘুরে তিনি তথ্য সংগ্রহ করেছেন। স্ত্রী ফিরোজা সুলতানা ডরোথি তাঁকে এ কাজে উৎসাহ ও সহযোগিতা দিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত বইটি তিনি দেখে যেতে পারেননি। বাবর আলী নিজেই বইটি প্রকাশ করেছিলেন। প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালের বিজয় দিবসে। আর এর মাত্র ছয় দিন আগে ১০ ডিসেম্বর তাঁর স্ত্রী ফিরোজা খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান।

বইটিতে যুদ্ধদিনের বর্ণনা যেমন আছে, তেমনি অনেক যোদ্ধার যুদ্ধদিনের ছবিও ছাপা হয়েছে। তবে বইটি থেকে তাঁর কোনো আয় হয়নি। বলতে গেলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছেন। পরে বন্ধু খায়রুল বাশার বইটি আবারও প্রকাশ করেন ২০১০ ও ২০১৬ সালে। খায়রুল বাশার তাঁকে ৩০ হাজার টাকা সম্মানী দিয়েছেন আর ২০০টি সৌজন্য কপি দিয়েছেন। বাবর আলীর কাছে বই লেখা ছিল দ্বিতীয় যুদ্ধের মতো ব্যাপারে। নতুন প্রজন্মের জন্য এটি তাঁর উপহার।

 

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা