kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

বিশাল বাংলা

পাখি বদলে দিল

শখের পোষা পাখি জ্যোতি হাসান, রাজ মাহমুদ আর রায়হান আহমেদের জীবন কিভাবে বদলে দিয়েছে শুনুন মুহাম্মদ শফিকুর রহমানের কাছে

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাখি বদলে দিল

জ্যোতি হাসান

গর্ভে তখন তাঁর প্রথম সন্তান। পুরো পরিবার আনন্দে ভাসছে। স্বামী এটা-ওটা কিনে ঘর ভরে ফেলেছেন। হঠাৎ এক দিন জ্যোতি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সন্তান পেটের মধ্যেই মারা গেল। জ্যোতির পৃথিবী আঁধারে ভরে গেল। কোনো কিছুই আর ভালো লাগছিল না। স্বামী কত কিছুই না করেন। তার পরও জ্যোতির চাঞ্চল্য ফিরে আসে না। সন্তান হারানোর ব্যথা কুরে কুরে খায় জ্যোতিকে। ঢাকার মুগদাপাড়ায় বাসা তাঁদের। জ্যোতির স্বামী বড় পাখি পুষতেন। তিনি এক দিন এক জোড়া পাখি জ্যোতিকে উপহার দিলেন। ফুটফুটে সুন্দর পাখি। নাম তার বাজরিগার। কিচিরমিচির করে ডাকাডাকি করে। একে অপরকে খাইয়ে দেয়। জ্যোতির ভালোই লাগে। বিষণ্ন মনে একটু দোলা লাগে। তিনি পাখিগুলোর যত্ন-আত্তি শুরু করেন। নরম খাবার তৈরি করা, সময়মতো খাবার দেওয়া, খাঁচা পরিষ্কার করা ইত্যাদি কাজ। তাঁর সময় ভালোই কাটতে লাগল। জ্যোতি একসময় পাখির প্রেমে পড়ে গেলেন। এখন তাঁর সংগ্রহে বাজরিগার তো আছেই, সিলভার জাভা, লুটিনো ককাটেল, লাভবার্ডসহ বিভিন্ন প্রজাতির শতাধিক পাখি রয়েছে। টুকি নামে জ্যোতির একটি পাখি আছে। সে নিজের নাম বলতে পারে। জ্যোতি একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। বলছিলেন, ‘পোষা পাখি মন ভালো রাখে। আমার জীবনে পরিবর্তন এনেছে খাঁচার পোষা পাখি।’ জ্যোতি মনে করেন, যুবসমাজ পাখি পুষলে অপরাধ কমবে।


রাজ মাহমুদ

মেয়েটিকে প্রথম দেখায় ভালো লেগে যায় রাজের। প্রস্তাবও দিয়ে ফেললেন। মেয়েটিও সাড়া দিল। ভালোই যাচ্ছিল দিন। হঠাৎই মেয়েটি পাল্টে যায়। রাজকে আর সময় দেয় না। এড়িয়ে চলে। রাজ দুঃখ-কষ্টে ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে নেশাদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়েন। পরিবারে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। ঘরের সবচেয়ে প্রাণবন্ত আর উচ্ছল ছেলেটি কি না নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে। কেউই মেনে নিতে পারছিল না। তারপর একদিন রাজ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। কানে এলো পাখির কিচিরমিচির ডাক। খুব মিষ্টি লাগল। রাজ থমকে দাঁড়ান। এগিয়ে গিয়ে দেখলেন সুন্দর সব পাখি। খাঁচার পাখি। মুগ্ধ হয়ে রাজ জানতে চাইলেন, কী পাখি? দোকানদার বললেন, ‘বাজরিগার। খাঁচার পোষা পাখি। অস্ট্রেলিয়ায় আদি নিবাস।’ এক জোড়া কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। একসময় পাখির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। পাখিকে খাবার দেন, খাঁচা পরিষ্কার করেন, পাখির সঙ্গে কথাবার্তাও বলেন। মামা ব্যাপারটি জানতে পেরে আরো কিছু পাখি রাজকে উপহার দেন। সেই থেকে দিনের অনেকটা সময় তাঁর পাখির পেছনেই যায়। ধীরে ধীরে নেশার পথ থেকেও সরে আসতে থাকেন রাজ। এর মধ্যে পাখি ডিম দেয়; কিন্তু সমস্যা হলো বাচ্চা ফুটেই কেন জানি মারা যায়। রাজের খুব মন খারাপ হয়। সমাধান খুঁজতে থাকেন। খুঁজে খুঁজে ইন্টারনেটে পেলেন বাজরিগার সোসাইটি অব বাংলাদেশকে। সংস্থাটি বিনা মূল্যে পাখি পালকদের সাহায্য করে। এখানেই পাখির ডাক্তার সালাউদ্দিন শাকিলের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তিনি রাজকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলেন। এ ছাড়া সোসাইটির সুলতান বাবু, তানভীর আহমেদ, পিএম প্লাবনও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। পুরনো প্রেমিকাকেও তত দিনে ভুলে গেছেন রাজ। বিয়ে করেছেন। স্ত্রীও পাখি পছন্দ করেন। বাড়ির কাছের বাজারে একটি ফার্মেসি চালান রাজ। বললেন, ‘দুঃখ-কষ্ট ভুলতে পোষা পাখির তুলনাই হয় না। আমার জীবন শেষ হয়ে যচ্ছিল। নতুন করে জীবন খুঁজে পেলাম বাজরিগার পাখিতে।’


রায়হান আহমেদ

মা-বাবার পছন্দ। ছেলের আবার দেখার কী আছে? মেয়েকে না দেখেই রায়হান বিয়ে করেন। অনেক স্বপ্ন তাঁর চোখে-মুখে; কিন্তু দুদিন না পেরোতেই স্ত্রী রুঢ় আচরণ শুরু করলেন। তাঁর চাহিদা অনেক। আজ এটা তো-কাল ওটা। কারোর সঙ্গেই তাঁর বনিবনা হচ্ছিল না। রায়হান তবু মানিয়ে চলছিলেন। একসময় তাঁদের সন্তানও হয়। ভাবলেন, এবার বুঝি সব ঠিক হয়ে যাবে; কিন্তু হলো উল্টো। একদিন কাউকে না বলে স্ত্রী চলে গেলেন। ঘরে দুটি ছোট বাচ্চা। রায়হান পুরোই ভেঙে পড়লেন। কোনো কিছুই তাঁর ভালো লাগে না। একপর্যায় নেশাদ্রব্য নেওয়া শুরু করলেন। তারপর এক দিনের ঘটনা। বাজারে পাখির দোকানে রায়হানকে দেখা গেল। ওই দিনই এক হাজার ৫০০ টাকায় এক জোড়া পাখি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন; কিন্তু পাখির যত্ন-আত্তি তো কিছুই জানেন না। ইন্টারনেটে পড়াশোনা শুরু করলেন। পাখির যত্ন নিতে বেগ পেতে হলো না। এর মধ্যে রুবেল রাজ নামে এক পাখি পালকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। তাঁর কাছ থেকে কিনে নেন পাঁচ জোড়া বাজরিগার। ধীরে ধীরে রায়হানের জীবন বদলে যায়। নেশা করার যেন সময়ই পান না। হঠাৎ একটি মেয়েকে ভালো লেগে যায়। সব জেনেই মেয়েটি দুঃখী রায়হানের পাশে দাঁড়ান। তাঁর সুখ-দুঃখের সঙ্গী হন। রায়হান অফিসে গেলে নতুন স্ত্রী পাখি দেখাশোনা করেন। এখন পাঁচ বছর হতে চলল রায়হানের পাখি পালার বয়স। বাজরিগার ছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৪৫ জোড়া পাখি আছে তাঁর খামারে। কুষ্টিয়ার থানাপাড়ায় তাঁর খামার। অনেকে দেখতে আসে। রায়হান বললেন, ‘ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে বিক্রি করি। খামারের খরচ তা থেকেই মেটে। কিছু বাড়তি অর্থও থাকে।’ এলাকার অনেক তরুণই এখন রায়হানের দেখাদেখি পাখির খামার করেছেন। নতুন পাখি পালকদের শেখানোর জন্য কর্মশালারও আয়োজন করেন রায়হান। কেইজ বার্ড সোসাইটি, কুষ্টিয়া গড়েছেন রায়হান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা