kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

আজ আমরাও

একটি হোটেল ও একটি সংসার

স্বামী অসুস্থই থাকতেন বেশি। হোটেলটি না হলে সংসার টিকিয়ে রাখতে পারতেন না ময়না বেগম। নরসিংদীর সাপমারা বাজারের রেলগেটের পূর্ব-দক্ষিণে ময়নার হোটেল। রায়হান রাশেদ দেখে এসেছেন

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একটি হোটেল ও একটি সংসার

টিনের চালাঘর। ছোটই বলা যায়। কাঠের দরজা নড়বড়ে। সামনের খোলা জানালায় আধা ছেঁড়া ময়লা পর্দা ঝোলানো। ভেতরে চার পায়া পাঁচটি টেবিল। টেবিলের সঙ্গে পাতানো লম্বা বেঞ্চ। কোনোটা মোটা সাদা কাগজে মোড়ানো। দু-একটি পোকায় কেটেছে। ঘরের পূর্ব কোণে ভাত-তরকারি রাখার কাঠের আলমারি। তার পাশেই থালা, জগ, গ্লাস রাখার লম্বা দুটি তাক। এই মোটামুটি ময়না বেগমের হোটেল। হোটেলের ধার ঘেঁষে পাকা রাস্তা চলে গেছে বেগমাবাদ, তুলাতুলি আর গৌরীপুরার দিকে।

 

একজন ময়না

রায়পুরার রামনগরে (বর্তমানে মতিউর নগর) তাঁর জন্ম। অভাবের সংসারে মাকে সাহায্য করেই সময় গেছে। মাঝেমধ্যে বাবার সঙ্গে ক্ষেতেও গেছেন। ১৭-১৮ বছর বয়সে পাশের গ্রামে বিয়ে হয়। সংসার টেকেনি। শ্বশুর প্রচণ্ড জ-ালাতন করত। দ্বিতীয়বার ২২ বছর বয়সে বিয়ে করেন সাপমারার সিদ্দিক মিয়াকে। সিদ্দিক মিয়ার তখন ষাটের কাছাকাছি বয়স। শরীর দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। ময়না নিয়তি বলেই মেনে নিয়েছিলেন। স্বামী তাঁকে আদর করে ডাকত ময়না। আসলে তাঁর নাম শরীফা বেগম। 

 

ময়নার সংসার

ময়না তখন নতুন বউ। অভাবের সংসার সিদ্দিক মিয়ার। সাপমারা বাজারে সিদ্দিক মিয়ার একটি টং দোকান ছিল। চা, পান, বিড়ি আর ডাব বিক্রি করতেন। রোজগার সামান্যই। বিয়ের দ্বিতীয় বছরে ময়নার কন্যাসন্তান হয়। তার বছর দুই পর হয় আরেকটি মেয়ে। সংসারের টানাটানি চরমে ওঠে। তারপর ২০০৯ সালে ময়না সংসারের বোঝা কাঁধে নিলেন। স্বামীর পাশে দাঁড়ালেন। স্বামীর দোকানেই দিলেন একটি ভাতের হোটেল। এক পাশে চা, পান আরেক দিকে। ‘তিনি (স্বামী) প্রথম রাজি ছিলেন না। আমি বললাম, উপায় নেই। দুই সন্তান আমাদের। তবে শুরুতে আমার খুব কষ্ট গেছে, বিশেষ করে মেয়েরা ছোট ছিল; কিন্তু হাল ছাড়িনি। একপর্যায়ে দুই দোকানই সামলাতাম।’

সকালে ঘুম থেকে উঠেই হোটেলে যান ময়না। বাড়ি থেকে হেঁটে যেতে ১০ মিনিট লাগে। গিয়েই বাসনকোসন মাজেন। রান্না চড়ান। সকালের জন্য ভাত, ডাল, আলুভর্তা, ভাজি তৈরি করেন। দুপুরে হয় মাছ-মাংস। মেয়েরা কখনো এখানে খেয়ে যায়, কখনো বাসায় খায়। সিদ্দিক মিয়ার প্রতি কোনো অভিযোগ ছিল না ময়নার। পাঁচ বছর আগে যেদিন তিনি মারা গেলেন, ময়নার কাছে কোনো টাকা ছিল না। বাড়িতে মাত্রই নতুন টিনের দুটি ঘর তুলেছিলেন। স্বামীর আত্মীয়রা কেউ এগিয়ে এলো না। ঋণ করে স্বামীর কাফন-দাফন সারলেন। স্বামী হারিয়ে ময়নার মাথা থেকে যেন ছায়া সরে গেল। খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। শোক সামলে স্বামীর মৃত্যুর ১১ দিন পর আবার হোটেল চালু করলেন।

 

১০ বছর তো কম নয়

‘ময়না খালা হাসিখুশি মানুষ। রান্নাও তাঁর ভালো। বাসায় যেতে না পারলে দুপুরে এখানেই খাই’—বলছিলেন আলমগীর। খেতে এসেছিলেন ময়নার হোটেলে। ১০ বছরে পা দিয়েছে হোটেলটি। হোটেলের দক্ষিণ দিকের বেড়ায় স্বামীর ছবি টাঙিয়ে রেখেছেন। বলছিলেন, ‘স্বামী ছাড়া নারীর জীবন মূল্যহীন। যেন ছাদহীন ঘর। সে যদি অসুস্থ হয়েও সারা দিন ঘরে শুয়ে থাকে, তবু  ভালো। ছবিটার দিকে তাকালে মনে হয়, সে বুঝি এখনো আছে। এই তো একটু পর চায়ের টুংটাং শব্দ শোনা যাবে।’

ময়না বাজার সদাই করেন না। লোক দিয়ে সারেন। হোটেলের ভেতরের সব কাজ তাঁর। ধীরস্থির মানুষ। মেয়েদের কথা মাথায় রাখেন সব সময়; পাছে কোনো বদনাম রটে যায়। হোটেলের জায়গাটা সরকারি। 

 

ময়নার মেয়েরা

বড় মেয়ে সাহারা। ১৬ বছর বয়স। বাবা আদর করে ‘টুক্কুনি’ ডাকতেন। ক্লাস এইটে পড়ে। ছোট মেয়ে লিমাও পড়ে এইটে। তার বয়স ১৪। দুজনই দৌলতকান্দি গার্লস স্কুলের শিক্ষার্থী। মায়ের প্রতি তাদের কোনো অভিযোগ নেই। মায়ের কষ্ট তাদের কাঁদায়। লিমা বলল, ‘আমাদের মা কষ্ট করে আমাদের পড়ান। আমাদের জন্য সংগ্রাম করছেন। মা চান, আমরা ভালো মানুষ হই। সমাজে ভালোমতো বেড়ে উঠি। মাকে নিয়ে আমাদের গর্ব। মা-ই আমাদের বাবা।’

‘আমি কষ্ট করছি। কাজ করছি। আমার ভালো লাগে। মানুষের কাছে হাত পাততে হচ্ছে না—এতেই আমি খুশি। এবং এখন আমি ভালো আছি। মেয়েরা সুনামের সঙ্গে পড়ছে। বড় মেয়েটাকে ভালো পাত্র মিললে বিয়ে দিয়ে দেব। আর ছোট মেয়েটা পড়বে। তার মাথা ভালো। আশা করি সে একটা সরকারি চাকরি করবে। আমার তখন সুদিন আসবে।’ বললেন ময়না বেগম।

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা