kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মহাস্থানের চাল

প্রত্ননগরী মহাস্থানগড়ে মিজানুর রহমান জামি গিয়েছিলেন শিক্ষার্থীদের নিয়ে। খুব সাধারণভাবে শুরু হয়েছিল কাজটা। কিন্তু পেয়েছেন এমন কিছু, যা এ অঞ্চলের সভ্যতার ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। মাসুম সায়ীদ শুনে এসেছেন অনেকটা

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মহাস্থানের চাল

প্রথম থেকে ষষ্ঠ প্রতিটি স্তরেই পাওয়া গেছে প্রাচীন শস্যদানা। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে যা বরাবরই স্বর্ণের সঙ্গে তুলনীয়। প্রাথমিক গবেষণায় জামির ধারণা, এখানে প্রাপ্ত চালগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘অরাইজা স্যাটিভা আউশ’ ধরনের চাল। ধানবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি ধানের এই নতুন জেনেটিক প্রকরণটি আবিষ্কার করেছেন, যা এশিয়ার প্রাচীন তিনটি জেনেটিক বৈচিত্র্যের একটি। এর আগে অরাইজা স্যাটিভা জাপোনিকা আর অরাইজা স্যাটিভা ইন্ডিকা এশিয়ার বিভিন্ন প্রত্নস্থানে পাওয়া গেলেও ‘অরাইজা স্যাটিভা আউশ’ এই প্রথম কোনো প্রত্নস্থানে সন্ধান মিলল। এগুলো এ অঞ্চলের সভ্যতার বয়স মাপার নতুন মাপকাঠি যেমন, হাজার বছর আগেকার জীবনধারা বোঝারও পথ খুলে দেবে

 

শিক্ষার্থীদের প্রত্নস্থান খোঁড়াখুঁড়ির কায়দাটা সরেজমিনে দেখিয়ে দেওয়াটাই ছিল উদ্দেশ্য। বেছে নেওয়া হয় বগুড়ার মহাস্থানগড়কে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নির্ধারণ করে দিয়েছিল দুর্গনগরের উত্তরের প্রধান ফটকের ধারে জাহাজঘাটার পাঁচ বর্গমিটার জায়গা। খনন কার্যক্রম চলে ৩ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি। মোট ২০ দিন। একজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ২৯ জন ছাত্র-ছাত্রী ছিল দলে। পুরো জায়গায় ৪.৩ মিটার গভীর একটি গর্ত খোঁড়া হয়। বস্তা বস্তা মাটি সংগ্রহ করা হয় গর্ত থেকে। নমুনা পরীক্ষা করতে গিয়েই বেরিয়ে আসে এমন মূল্যবান নিদর্শন, যা তাক লাগিয়ে দিল তাবড় তাবড় সব প্রত্নতাত্ত্বিককে। 

কী সেই মহার্ঘ্য?

খননকারী দল ধূলি-মাটি ঘেঁটে খুঁজে পায় শস্যদানা। এর মধ্যে আছে চাল, মটরশুঁটি, শিম, ছোলা, মুগডাল, মসুর, তুলার বীজ ইত্যাদি। সংখ্যায় এক-দুইটি নয়, ১০ হাজার! প্রাথমিক গবেষণায় ধারণা করা হচ্ছে, এদের বয়স কম করে হলেও আড়াই হাজার বছর। এই খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়াটা ঠিক সোনার খনি থেকে স্বর্ণ তুলে আনার মতোই। খননে পাওয়া বিভিন্ন স্তরের মাটি বস্তায় ভরে নিয়ে আসা হয় গবেষণাগারে। তারপর সেই মাটি বালতির পানিতে গুলিয়ে ফেলা হয়। মাটি পানিতে গলে গেলেও মাটির সঙ্গে মিশে থাকা বীজ বা শস্যদানা পানিতে ভাসতে থাকে। ভাসমান সেই দানাগুলো হাত দিয়ে স্পর্শ না করে বিশেষ কায়দায় তুলে আনা  হয় পানি থেকে। তারপর শুকানো হয় রোদহীন স্থানে। নমুনা সংগ্রহের এই কায়দাকে বলে ফ্লোটেশন টেকনিক বা ভাসমান পদ্ধতি।

এবার স্যারের নাম বলি

মিজানুর রহমান জামি। জাহঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। বয়স বেশি না হলেও অভিজ্ঞতা তাঁর কম নয়। শিক্ষার্থীদের দলটাকে তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর গবেষণার গুরুভারটাও বহন করছেন নিজের কাঁধেই। জামি পরিবেশ প্রত্নতত্ত্বে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজি থেকে। উল্লেখ্য, প্রত্নতত্ত্বের একটি বিভাগ হলো পরিবেশ প্রত্নতত্ত্ব। প্রত্ন উদ্ভিদবিদ্যা, প্রত্ন প্রাণিবিদ্য আর প্রত্ন ভূবিদ্যার সমন্বয়ে এই পরিবেশ প্রত্নতত্ত্ব। গোটা উপমহাদেশে এ বিষয়ে পণ্ডিত আর মাত্র তিনজন। তাঁরা সবাই ভারতীয়। একজন আবার চলে গেছেন অবসরে। এখন বাংলাদেশের প্রত্ন উদ্ভিদবিজ্ঞানী একমাত্র তিনিই।

 

স্যারের স্যার

জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্র থাকার সময় গবেষণা শুরু করেন অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরে। ছাত্রজীবন শেষেও তিনি সুফি স্যারের সহযোগী হিসেবে উয়ারী-বটেশ্বরেই কাজ করতে থাকেন। সেটা ২০০৭ সালের কথা। তখন ওখানে খুঁজে পাওয়া যায় গর্তবসতি। গর্তের ভেতরে মানুষের বসবাসের ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে মাথায় আসে তখনকার প্রকৃতি আর পরিবেশের কথা। শুরু হয় এ বিষয়ে পড়ালেখা। এ ক্ষেত্রে বিশেষ প্রেরণা ছিলেন প্রাণী প্রত্নবিদ অধ্যাপক সীমা হক। পড়ালেখা আর নিজস্ব ধ্যান-ধারণা মিলিয়ে শুরু করেন মাটির নমুনা সংগ্রহ। ২০১১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তাঁর পথ আরো প্রশস্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে আড়াই লাখ টাকার ফেলোশিপ পেয়ে যান। এটা পেয়েই চেষ্টা শুরু করেন বিদেশে যাওয়ার। পেয়েও যান পছন্দের গুরু প্রফেসর ডরিয়ান ফুলারকে। তিনি দক্ষিণ এশীয় প্রত্নতত্ত্বের একজন বিশেষজ্ঞ। প্রথমে এক মাসের একটি প্রশিক্ষণ। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি। ওই প্রশিক্ষণেই বীজ চিহ্নিতকরণের জটিল পদ্ধতিটি তাঁর শেখা হয়ে যায়। ২০১৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে আরেকটি প্রশিক্ষণ। এটা ফাইটোলিথের ওপর। মরে যাওয়ার পর উদ্ভিদের কোষ মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েও অক্ষত থেকে যায় লাখ লাখ বছর। মাটি থেকে এই উদ্ভিদ কোষগুলোকে (ফাইটোলিথ) আলাদা করা যায়, জানা যায়, কোন ধরনের ফসল চাষাবাদ হতো সে সময়। কাজটা সম্পন্ন করতে দরকার হয় ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি, উন্নত প্রযুক্তি ও জটিল প্রক্রিয়া আর প্রচুর পরিশ্রম। এর পর ২০১৭ সালে লন্ডনে এমএসসি শেষ করেন।

 

আউশ মিলল এই প্রথম

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সমন্বয়ে পরিচালিত ওই খননকাজে দলটি ২০ দিনে ৪.৩ মিটার গভীরে যেতে সমর্থ হয়। এর মধ্যে ছয়টি বসতি স্তরের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের বসতি সেন, পাল আর গুপ্ত আমলের। চতুর্থ স্তরে মেলে নর্দান ব্ল্যাক পলিশড ওয়ার (এনবিপিডাব্লিউ) বা ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ। এগুলো সাধারণত অভিজাত লোকেরা ব্যবহার করত। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ অব্দ থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। পঞ্চম আর ষষ্ঠ স্তরেও পাওয়া যায় এনবিপিডাব্লিউ মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ। প্রথম থেকে ষষ্ঠ প্রতিটি স্তরেই পাওয়া গেছে প্রাচীন শস্যদানা। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে যা বরাবরই স্বর্ণের সঙ্গে তুলনীয়। প্রাথমিক গবেষণায় জামির ধারণা, এখানে প্রাপ্ত চালগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘অরাইজা স্যাটিভা আউশ’ ধরনের চাল। ধানবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি ধানের এই নতুন জেনেটিক প্রকরণটি আবিষ্কার করেছেন, যা এশিয়ার প্রাচীন তিনটি জেনেটিক বৈচিত্র্যের একটি। এর আগে অরাইজা স্যাটিভা জাপোনিকা আর অরাইজা স্যাটিভা ইন্ডিকা এশিয়ার বিভিন্ন প্রত্নস্থানে পাওয়া গেলেও ‘অরাইজা স্যাটিভা আউশ’ এই প্রথম কোনো প্রত্নস্থানে মিলল। এগুলো এ অঞ্চলের সভ্যতার ইতিহাসে যেমন নতুন মাত্রা যোগ করবে তেমনি হাজার বছর আগেকার জীবনধারা বোঝারও পথ খুলে দেবে।  জামি চীন, ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রত্ন গবেষকদলের সহযোগী হয়েও গবেষণার কাজ করেন। তাঁর ইচ্ছা শস্যদানাগুলো নিয়ে বিদেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার।

 

বন্য নয়, চাষের

প্রাপ্ত বীজগুলোর ধরন আর আকার-আকৃতি থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, এগুলো প্রাকৃতিকভাবে বা আপনি বেড়ে ওঠা কোনো ফসল নয়। এগুলো চাষ করা শস্যদানা। আর শস্যগুলোর আদি বাসস্থান মধ্যপ্রাচ্য, ভারতের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চল এবং সিন্ধু অববাহিকা। ওখান থেকে এতটা দীর্ঘ পথ কেউ না কেউ বয়ে এনেছে। মানুষ বিচরণশীল প্রাণী। কোথাও গেলে ঘরবাড়ি সঙ্গে করে নেয় না, নেয় খাদ্যসামগ্রী। তা-ও আবার যেগুলো প্রধান সেগুলোই। কারা, কবে, কোথা থেকে, কেমন করে এখানে এসেছিল? কেন এসেছিল? তা এখনো অজানা। আর সেটাই গবেষণার বিষয়।

বিচরণশীল মানুষ

মানুষের বিচরণশীলতা বা অভিবাসনের প্রসঙ্গ নিয়ে মিজানুর রহমান যখন চেয়ারে হেলান দিয়ে কথা বলছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল তিনি যেন কোনো এক মহাকাব্য আবৃত্তি করে যাচ্ছেন। বলছিলেন, ‘মানুষ বহুকাল ছিল প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতির ভাঙাগড়ায় তখন তার কিছুই করার ছিল না। অন্যদিকে বসতি, সভ্যতা মানুষ গড়তে পেরেছে বহু বছরের সাধনায়। মহাস্থান একটি দুর্গনগর। আর নগর গড়ে ওঠে নানা ঘটনা, আবিষ্কার আর রাজনৈতিক কর্মকোলাহলের এক মহাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। উপমহাদেশের প্রথম গ্রামটার দেখা মেলে পাকিস্তানের মেহেরগড়ে। সেটা সাত হাজার খ্রিস্টপূর্বের। আর নগর পাওয়া যায় তিন হাজার খ্রিস্টপূর্বের—হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো। অনেক বছর ধরে নানা ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল পুণ্ড্রের এই দুর্গনগরী।’

 

সেসব মানুষ

মহাকাব্যের পাঠ চলতেই থাকল ‘কেউ কৃষক, কেউ কামার, কেউ কুমার, কেউ তাঁতি, কেউ জেলে—এই তো আবহমানকালের সমাজ। খেটে খাওয়া পরিশ্রমী মানুষ। হয় হালচাষ, না হয় লগি-বৈঠা। গায়ে-গতরে খেটেই বেঁচে থাকা। তাই তাদের দেহ ছিল শক্তপোক্ত। রোদে পুড়ে কালো। চাষিদের সেই ভোরবেলায় লাঙল-গরু নিয়ে বের হয়ে যাওয়া, কাঁধে কিংবা মাথায় বোঝা বাওয়া—জীবন তো এমনই ছিল। মহাস্থানও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এখনো উত্তরবঙ্গের একটি বড় শস্যবাজার মহাস্থান। প্রতিদিন ট্রাকের পর ট্রাক বোঝাই পণ্য চালান হয়ে যায় দেশের বড় বড় শহরে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা