kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ছবি হয়ে যাচ্ছে

মই দেওয়া

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মই দেওয়া নামে বিখ্যাত একটি ছবি আছে। ফসল বোনার জন্য ক্ষেত প্রস্তুত করতে মই দেওয়ার চল যুগ যুগ ধরে। তবে আজ প্রযুক্তির ধাক্কায় মই দেওয়া উঠে গেছে বলেই মনে হচ্ছে মাসুম সায়ীদের

২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মই দেওয়া

হালের পর প্রতিটি জমিই হয়ে পড়ে অসমান এবড়োখেবড়ো। লাঙলের ফলার সঙ্গে উঠে আসে মাটির বড় বড় চাঙ্গর বা ডেলা। এ রকম জমিতে ফসল ভালো হয় না। ভালো ফসলের জন্য চাই সমতল জমি। এ ছাড়া সেচের পানি এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সহজে পৌঁছাতেও ক্ষেতটা সমান থাকা চাই। তাই হালের পর জমি প্রস্তুত করতে দরকার হয় মই দেওয়ার। আর ক্ষেতে সার বা বীজ ছিটানের পর সেই সার বা বীজকে মাটি চাপা দিতেও দরকার পরে মইয়ের।

 

বাঁশের মই

মই বলতে সাধারণত বাঁশ বা কাঠের তৈরি সিঁড়ি বোঝায়। কোনো কোনো অঞ্চলে মইকে বলে চঙ্গ বা চঙ।  ইদানীং লোহা, স্টিল বা অ্যালুমিনিয়াম দিয়েই মই তৈরি হচ্ছে বেশি। কিন্তু কৃষিকাজের মই তৈরি হয় বাঁশ দিয়েই। কৃষক নিজে অথবা স্থানীয় কাঠমিস্ত্রি বা ছুতার তৈরি করে এই মই। চাষের মই সাধারণত দুই ধরনের হয়। এক জোড়া গরুর জন্য আর দুই জোড়া গরুর জন্য। এক জোড়া গরু টানার মইকে আঞ্চলিক ভাষায় বলে এক হাইলা চঙ্গ বা মই। দৈর্ঘ্যে সাত-আট ফুট। আর দুই জোড়া গরুটানার মইকে বলে দো হাইলা মই। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৯ ফুট। গরুর কাঁধের জোয়ালের সঙ্গে লম্বা দড়ি দিয়ে গরু থেকে দেড়-দুই হাত পেছনে বেঁধে দেওয়া হয় মইটা। তারপর কৃষক উঠে পড়ে মইয়ের ওপরে। এক হাতে ধরে গরুর লেজ, অন্য হাতে থাকে পাচন বা হাইলা নড়ি। এই নড়ি দিয়ে মইয়ের সময় কৃষক তাড়িয়ে নিয়ে যায় গরু।

মই দেওয়া দক্ষতার কাজ

মই দেওয়া বা চঙ্গের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা বিশেষ দক্ষতার ব্যাপার। মই দেওয়ার সময় যেমন হালের বলদ যাচাই হয়ে যায়, তেমনই কৃষক বা কৃষি শ্রমিকের দক্ষতারও প্রকাশ ঘটে। আগের দিনে হালের বলদ কেনার আগে চাষিরা পরখ করে নিত ওটা মইয়ে কেমন। সেটা বুঝেই কমবেশি হতো বলদের দাম।

 

বাবার কাছে দীক্ষা

আগের দিনে লোকেরা ছোট থাকতেই খেলতে খেলতে শিখে নিত এই কাজটা। কৃষক খুব ভোরবেলায় ক্ষেতে গিয়ে শুরু করত হাল। শেষ হতে হতে বেলা উঠে যেত কপালে। সেই সময়টাকে বলা হতো নাশতার বেইল। কৃষকের ছোট্ট ছেলেটি খাবার নিয়ে হাজির হতো মাঠে। চাষি হাল শেষ করে ক্ষেতের আলে বসে আহার করত। তারপর হুঁকোয় তামাক সাজিয়ে আয়েশ করে দিত টান। এই ফাঁকে বলদগুলোও খানিকটা জিরিয়ে নিয়ে সতেজ হয়ে উঠত। চাষি এবার লাঙল রেখে গরুর সঙ্গে চঙ্গ জুড়ে দিয়ে শুরু করত মই দেওয়া। একপর্যায়ে তার ছোট্ট ছেলেটিকেও তুলে নিত চঙ্গটার অপর প্রান্তে। ডেলার ওপর দিয়ে ছুটে চলার আনন্দে শিহরিত হতো কিশোর মন। প্রথমে একটু ভয় ভয় লাগলেও বাপকে দেখে ঠিক সামলে নিত নিজেকে। আর এভাবেই বাপের কাছে দীক্ষা নেওয়া হয়ে যেত মই দেওয়ার। 

 

মই দৌড়

চৈত্র মাসে ক্ষেতের গম পেকে যেত। পাকা গম কেটে নেওয়ার পর জমি চাষ দিয়ে ফেলে রাখা হতো বৈশাখ মাসে পাটের বাইন বোনার জন্য। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হতো কৃষককে। চৈত্রসংক্রান্তি আর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে গ্রামে গ্রামে বসত মেলা। মেলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ঘোড়দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই ও মইদৌড়। খালি পড়ে থাকা বিশাল উন্মুক্ত মাঠে অনুষ্ঠিত হতো এসব খেলা। টান টান উত্তেজনায় ভরা মইদৌড়। মইদৌড়ে জমির উঁচু আলগুলো লাফ দিয়ে টপকে যাওয়া ছিল নিপুণ এক শৈল্পিক দক্ষতা।

 

উঠে যাচ্ছে

চাষাবাদের জন্য জমিতে মই দেওয়া অপরিহার্য। তবে উঠে যেতে বসেছে গরু দিয়ে মই দেওয়ার চল। কৃষিকাজে আধুনিকায়নের ফলে চাষের ক্ষেত্রে গরুর স্থান দখল করে নিয়েছে ট্রাক্টর। গরু দিয়ে হালচাষ করা প্রচুর সময় আর শ্রমসাধ্য। অন্যদিকে গরু লালন-পালন করাও ঝক্কিঝামেলার কাজ। দরকার হয় বাড়তি লোকের। কলকারখানা বেড়ে যাওয়ায় দিন দিন কমে যাচ্ছে কৃষি শ্রমিকও। তাই কৃষকরা এখন হয়ে পড়েছে যন্ত্রনির্ভর। মই দেওয়ার কাজটা তারা এখন ট্রাক্টর দিয়েই করে। যদিও এখনো গ্রামের পথে হাঁটলে হঠাৎ হঠাৎ চোখে পড়ে গরু দিয়ে মই দেওয়ার দু-একটা দৃশ্য। তবে আগের মতো দাপুটে ভাব নেই সেখানে। শক্তিশালী হালের বলদও আর দেখা যায় না; একসময় বাংলার ক্ষেত-খামার থেকে হয়তো পুরোপুরিই উঠে যাবে। গরুতে মই দেওয়ার দুর্দান্ত দৃশ্যটা শুধু ঝুলে থাকবে জাদুঘরের দেয়ালে শিল্পীর ক্যানভাসে। ভাগ্যিস আমাদের একজন শিল্পাচার্য জয়নুল ছিলেন!                    

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা