kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আগুনের রাত

রয়টার্সের আলোকচিত্রী মোহাম্মদ পনির হোসেন। চকবাজারে আগুন লাগার পরই ছুটে গিয়েছিলেন। ক্যামেরাবন্দি করেছেন পুড়ে যাওয়া সময়গুলো। পিন্টু রঞ্জন অর্ককে শুনিয়েছেন সেই সময়ের গল্প।

২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আগুনের রাত

রাত তখন প্রায় পৌনে ১১টা। বংশালে আমাদের বাসায় ফেসবুকে চ্যাট করছি। ফেসবুকে আমাদের সাংবাদিকদের একটা গ্রুপ আছে। কোনো একটা ঘটনা ঘটলে কেউ না কেউ আপডেট দেয়। চকবাজারে আগুন লাগার কথা সেখানেই কেউ একজন বলে থাকবে। এক বড় ভাইয়ের দোকান আছে চকবাজারে। তাঁকে ফোন দিলাম, ‘ভাই, চকবাজারে নাকি আগুন লাগছে?’

—হ্যাঁ, চুড়িহাট্টায়।

—ওই ভবনে লোকজন থাকে?

—হ্যাঁ, থাকে তো।

এরই মধ্যে গ্রুপে একজন একটা ভিডিও ফুটেজ শেয়ার করল। দেখে মনে হলো, ভয়াবহ কিছু একটা ঘটেছে; আর দেরি করা উচিত হবে না। ক্যামেরার ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে রওনা দিলাম। তখন প্রায় সাড়ে ১১টা। রিকশায় করে পৌঁছতে মিনিট পনেরোর মতো লাগল। কাছাকাছি গিয়ে দেখি প্রচুর লোক। ভিড় ঠেলে সামনে এগোতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। আরেকটু এগোনোর পর মনে হলো কোনো আগ্নেয়গিরির কাছে চলে এসেছি। চারদিকে আগুন আর আগুন। তার ওপর দুই-তিন সেকেন্ড পর পর বিকট শব্দে কিছু না কিছু বিস্ফোরিত হচ্ছিল। ওয়াহিদ মঞ্জিলের জানালা আর বারান্দা দিয়ে আগুনের গোলা বাইরে এসে পড়ছে। ভয়ংকর পরিস্থিতি। কাছাকাছি যাওয়ার উপায় নেই। কোন গোলা সামনে পড়বে বলা মুশকিল। ক্যামেরা বের করে ক্লিক করা শুরু করলাম। এক ফাঁকে রয়টার্সের ভিডিওগ্রাফারকে ফোন করলাম। এএফপির মনির ভাইকেও ফোন দিয়ে বললাম, ‘ভয়াবহ অবস্থা। আমার মনে হয় আপনাদের আসা উচিত।’

চুড়িহাট্টা মোড় পার হয়ে ভবনের আরেক পাশে গেলাম। সেদিকেও দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ওয়াহিদ মঞ্জিলের পাশের একটা পাঁচতলা ভবনের তিনতলায় উঠলাম। এদিক থেকে ফায়ার ফাইটাররা পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিলেন। পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ ছিল যে ফায়ার সার্ভিসের লোকজনও সামনে যেতে পারছিলেন না। যাই হোক, কয়েক মিনিট ভিডিও করলাম। এখানেও বেশিক্ষণ থাকা গেল না। কারণ ওয়াহিদ মঞ্জিলে বিস্ফোরণ এত বেশি হচ্ছিল যে এই ভবনটিও কেঁপে কেঁপে উঠছিল। নেমে শাহি মসজিদের পাশ দিয়ে আরেকটা জায়গায় গেলাম। সেদিকে গিয়ে প্রথমবারের মতো লাশ দেখলাম। তিনটা লাশ রাস্তায়। কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ততক্ষণে প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো চলে গেছে। আমার মনে হলো বিরাট এক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে ৮-১০ জনকে জিজ্ঞেস করছিলাম, এই ভবনের ভেতরে লোকজন আছে কি না। কেউ বলল, লোকজন তো ছিল, বোধ হয় নেমে গেছে। কেউ আবার বলল, নামার সময় পাইলে তো? আসলে কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছিল না। রাত ততক্ষণে সাড়ে ৩টা। আগুন তখনো জ্বলছিল।

অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। এত লোকের কারণে ফায়ার ফাইটাররাও ঠিকমতো কাজ করতে পারছিলেন না। মানুষজনকে বারবার অনুরোধ করা হচ্ছিল, পানির পাইপে যাতে কেউ পা না দেয়। কিন্তু কে কার কথা শোনে! এদিকে গলি এত সরু যে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার পথও নেই। আমি যদিও বিশেষজ্ঞ না, তবু মনে হয়েছে, এটা আসলে পানি দিয়ে নেভানোর আগুন না। কারণ কেমিক্যাল যতক্ষণ না পুড়ে শেষ হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটা নিয়ন্ত্রণে আনা খুবই কঠিন। যে কারণে দেখলাম সকালবেলাও আগুন জ্বলছে। একপর্যায়ে তো ফায়ার সার্ভিসের লোকজন পানির পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইডও ছুড়েছেন।

আগুনের অনেক রং

একটা বিষয় বলার মতো—চকবাজারের আগুনের রং ছিল অনেক রকম—লাল, সবুজ, নীল বা বেগুনি। একেকটা বিস্ফোরণ হয়েছে আর একেক রঙের আগুন দেখতে পেয়েছি। তার মানে রাসায়নিকের রং যেমন, আগুনের রংও তেমন। আর এমন শব্দে বিস্ফোরণ হচ্ছিল যেন কোথাও ভবন ধসে পড়ছে।

 

গেলাম ঢাকা মেডিক্যালে

বার্ন ইনস্টিটিউটের সামনে তখন অ্যাম্বুল্যান্সের সাইরেন আর মানুষজনের তুমুল চেঁচামেচি। আমি অবশ্য ভেতরে যেতে পারিনি, বাইরে থেকেই মানুষের আতঙ্ক আর উদ্বেগ দেখছিলাম। হাসপাতালে যারা ভর্তি হয়েছে, বাইরে তাদের একটা তালিকা টাঙানো ছিল। তাতে স্বজনের নাম আছে কি না খুঁজতে দেখা গেল অনেককে।

রাতভর শরীরের ওপর দিয়ে কম ধকল যায়নি। শরীর আর সায় দিচ্ছিল না। তাই বাসায় চলে গেলাম। ল্যাপটপ অন করে কিছু ছবি পাঠালাম রয়টার্সে। এরপর ঘণ্টা দেড়েকের মতো বিশ্রাম নিলাম।

ভোর সাড়ে ৬টায় আবার চুড়িহাট্টায় চলে এলাম। তখনো ভবনের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধোঁয়া উঠছে, কোথাও কোথাও আগুনও জ্বলছে। সরু গলিটার দুই পাশের ঘরবাড়ি, দোকানপাট পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। এখানে-ওখানে পড়ে আছে পুড়ে যাওয়া মোটরসাইকেল, রিকশা, পিকআপ ভ্যান, প্রাইভেট কার ইত্যাদির কঙ্কাল। এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দুমড়ানো-মোচড়ানো প্রসাধনীর টিউব বা এজাতীয় কিছু। পায়ের নিচে যেন প্লাস্টিকের দানার পুরু কার্পেট বিছানো। তখন ভেতর থেকে একে একে লাশ বের করা হচ্ছে। পলিব্যাগে মোড়ানো লাশগুলো অ্যাম্বুল্যান্সে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। এখান থেকে কিছু ছবি তুললাম।

এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে গেলাম। কান্নাকাটিতে এখানকার বাতাস ভারী। অনেকে আবার অধিক শোকে পাথর। কারো গাল বেয়ে শুধু অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কেউ নির্বাক হয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। মর্গের ভেতরে গিয়ে যা দেখলাম, তার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। পুড়ে বীভৎস হয়ে গেছে মানুষের শরীর। কিছু দেহ এমনভাবে পুড়েছে যে আত্মীয়-স্বজনেরও শনাক্ত করার উপায় নেই। কারো নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে আছে। কারোর মাথার খুলিই নেই। কারোর শুধু কঙ্কালটাই আছে। কারো শরীরের নিচের অংশ নেই। পোড়া লাশের গন্ধে সেখানে টেকা দায়। মিনিট দশেকের বেশি থাকতে পারিনি।

 

তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন?

হিমঘর থেকে বের হওয়ার পর যেখানেই গেছি, মনে হয়েছে লাশের গন্ধ পাচ্ছি। আবার চকবাজার গেলাম। কিছু ছবি তুলে পরে দুপুরের দিকে আবার মর্গে এলাম। তখন আত্মীয়-স্বজনদের লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। অনেকের হাতে তাদের নিখোঁজ পরিচিতজনের ছবি। একে-ওকে দেখিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান চাইছেন। এখানে কিছু ক্লিক করার পর গেলাম আজিমপুর কবরস্থানে। সেখানে কয়েকটা লাশ দাফন করা হচ্ছিল। সেই ছবি তুললাম। ঢাকা মেডিক্যাল থেকে চকবাজার আবার চকবাজার থেকে ঢাকা মেডিক্যাল করতে করতে দিন কেটে গেল। ঢাকা মেডিক্যালে শোকার্ত স্বজনদের ছবি তুলছিলাম। মাঝ বয়সী এক মহিলা কাঁদতে কাঁদতেই বলছিলেন, ‘আপনারা কেন ছবি তুলছেন? যে গেছে তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন?’

 

একটা ছবি বিশেষ

আগুন লাগা ভবনের অদূরে প্রচুর লোক থাকার কারণে অনেকে ফায়ার সার্ভিসের পানির পাইপে পা দিচ্ছিল। যে কারণে পানির প্রবাহে বিঘ্ন ঘটে। একপর্যায়ে দেখলাম, রাস্তা থেকে লোকজন পানির পাইপটা তুলে কাঁধে নিয়েছে। যারা কাঁধে নিতে পারছে না, তারা হাত দিয়ে ওপরে তুলে ধরেছে। অনেক লোক একসঙ্গে কাজটা করেছে। পাইপ যত দূর গেছে মোটামুটি তত দূর দীর্ঘ মানুষের লাইন। ফায়ার ফাইটাররা এবার মোটামুটি ঝামেলা ছাড়াই পানি ছুড়তে পারছিলেন। এ দৃশ্যটা ফ্রেমবন্দি করেছি। পরে বাসায় এসে দেখলাম, পুরো ঘটনা তুলে ধরার জন্য এই একটা ছবিই যথেষ্ট। ছবিটা রয়টার্সসহ অনেক জায়গায় ছাপা হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, আগুনের লেলিহান শিখায় ওপরটা একেবারে লাল। অনেকগুলো হাত পানির পাইপটা ওপরে তুলে ধরেছে। আর মইয়ের ওপরে দাঁড়ানো দুই কি তিনজন আগুনের দিকে পাইপের মুখ তাক করে পানি ছুড়ছে। পাশে শাটার নামানো একটা দোকান। সেই দোকানের ওপরে সাইনবোর্ডে বাংলা হরফে লেখা ‘জীবন’!

এখনো চোখে ভাসছে

অসহনীয় এই দৃশ্য কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না। ভাবলাম, বেড়িয়ে এলে কিছু উপকার হবে। ২৩ তারিখ সকালে বিক্রমপুরে আমাদের গ্রামের বাড়িতে গেলাম। যাওয়ার আগে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম, এখন যত্রতত্র পোড়া লাশের গন্ধ পাই। সেখানে বিরাজ ভাই (আলোকচিত্রী এন্ড্রু বিরাজ) কমেন্ট করেছিলেন, ‘নিমতলী এবং রানা প্লাজায় কাজ করার পর আমারও একই রকম অনুভূতি হয়েছিল। এই ট্রমা কাটিয়ে ওঠা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।’

গ্রামের বাড়িতে রাতে বের হওয়ার পর মনে হলো, আমার সামনে সেই লাশগুলো হাঁটছে। এটা এক ধরনের হ্যালুসিনেশন বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, এখনো চোখ বন্ধ করলে সেই লাশের ছবি দেখতে পাই।

ছবি : রয়টার্স/মোহাম্মদ পনির হোসেন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা