kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

উদ্যমী বাংলাদেশ

যথাশিল্প

ভাগ্নি শারমিন আফরোজ লাবণীকে নিয়ে শাওন আকন্দ গড়ে তুলেছেন যথাশিল্প। হস্তশিল্পের একটু অন্যরকম প্রতিষ্ঠান। জুবায়ের আহম্মেদ এক দিন ঘুরে এসেছেন

২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যথাশিল্প

শাওন আকন্দ ও শারমিন আফরোজ লাবণী

বাড়ি ৮১৯, রোড ৫, বাইতুল আমান হাউজিং সোসাইটি, আদাবর।

বাড়িটির সামনে দিয়ে যেতেই চোখে পড়ে কাচের ফলকে লেখা—যথাশিল্প। মূল ফটক দিয়ে ঢুকে নিচতলায় সোজাসুজি যথাশিল্প। ভেতরে ঢুকতেই হাতের বাঁয়ে একটি কক্ষে সাজিয়ে রাখা হয়েছে নানা ধরনের হস্তশিল্পের জিনিসপত্র। বাঁশ, বেত দিয়ে তৈরি জিনিসপত্রও আছে। দেয়ালজুড়ে বিভিন্ন ধরনের ওয়ালমেট। একেকটি ওয়ালমেট যেন একেকটি গল্প বলছে। চোখ আটকালো একটিতে। তাতে নকশার নিচে লেখা,

‘কন্থায় আকিল কন্যা চান সুরুয পাহাড়

আরও যে আকিল কন্যা হাসা আর হাসি।’

এ রকম বিভিন্ন ধরনের নকশার ওয়ালমেট রয়েছে। 

আদাবরের ৫ নম্বর রোডে আরো একটি প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে যথাশিল্পের।

 

শুরুর গল্প

পারিবারিক সূত্রেই হস্তশিল্পের সঙ্গে পরিচয়। ৭০ দশকে শাওনের মা কুষ্টিয়া অঞ্চলে সমবায় সমিতি গড়েছিলেন। সমিতির মাধ্যমে মহিলাদের বানানো নকশিকাঁথা ঢাকায় এসে বিক্রি করতেন। শাওনের খালাও সুচিকর্মে পারদর্শী ছিলেন। তাঁর কাজ নিয়ে একটি বইও আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র ছিলেন। পড়াশোনা শেষে বেশ কিছুদিন গ্যালারি জলরঙের কিউরেটর হিসেবে চাকরি করেছেন। ২০১৪ সালে সেই চাকরিতে ইস্তফা দিলেন। এরপর লেখালেখি আর আঁকাআঁকিতেই পড়েছিলেন। প্রথম দিকে ভেবেছিলেন একটি ইনস্টিটিউশন করার। শাওন আকন্দ বললেন, ‘লম্বা সময় গবেষণা করে কাটিয়েছি। সে কারণে বাংলাদেশের লোকশিল্পের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ঘটেছিল। সেই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েই নতুন কিছু করার কথা ভাবছিলাম। শুরু থেকেই নতুন কিছু করার চেষ্টা ছিল।’ অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পাস করেছেন যথাশিল্পের আরেকজন পরিচালক শারমিন আফরোজ লাবণী। এরপর বেশ কিছুদিন দেশের বাইরে ছিলেন। বললেন, ‘চাকরি করতে ভালো লাগে না। আমি সেলাইয়ের কাজ জানি আর ডিজাইনের ব্যাপারে বেশ আগ্রহ ছিল। তাই ট্র্যাডিশনাল কোনো বিষয় নিয়ে ভিন্নধর্মী কিছু করতে চেয়েছিলাম। সেই সুযোগটা মামাই করে দিলেন।’  তখন ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাস। মামা-ভাগ্নি দুজনে মিলে শুরু করলেন যথাশিল্প।

শুরুতে সিনেমা পেইন্টিং নিয়ে ওয়ার্কশপ করেছিলেন।

আদাবরের সেন্টারটি চালু হলে মেটাল ক্রাফটস, উডেন ক্রাফটস, টেক্সটাইল, পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের হাতে তৈরি জিনিস রাখা হয়।

 

নোটবুক, টুল আর গামছা-শাড়ির গল্প

হরেক রকম নকশার নোটবুক মিলবে যথাশিল্পে। সুই-সুতার ফোঁড়ে নোটবুকের কাভারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে একেকটি গল্প। কোনো নোটবুকে ছয় ঋতুর নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোনোটির কাভারে প্রাকৃতিক দৃশ্য আবার কোনোটিতে পালকি করে বউ যাচ্ছে—এ রকম নকশা রয়েছে। ইলিশ মাছ হাতে করে বাজার থেকে যাচ্ছে—এ রকম নকশার নোটবুকও পাওয়া যাবে। আরো আছে সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং ও সাঁওতাল আর্টের কাভার করা নোটবুকও। নোটবুকের কাভারে বর্ষার বৃষ্টিভেজা কদম যেমন আছে, তেমনি শরতের কাশফুলেরও দেখা মিলবে।

একসময় সিনেমা প্রচারণার অন্যতম মাধ্যম ছিল ব্যানার পেইন্টিং। কাপড়ের বিশাল ক্যানভাসে উজ্জ্বল রঙে অভিনেতা-অভিনেত্রীর মুখ ফুটিয়ে তুলতেন শিল্পীরা। দেখলাম সেই সিনেমা ব্যানার ফুটিয়ে তোলা হয়েছে টুলের ওপর। কোনোটিতে আবার রয়েছে সাঁওতাল আর্ট।

একবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী হাটে এক তাঁতির সঙ্গে দেখা হয় শাওন আকন্দের। কথায় কথায় তাঁর চিন্তাধারা ভালো লেগে যায় শাওনের। এখন তিনি যথাশিল্পের জন্য গামছা তৈরি করেন। গামছা দিয়ে শাড়িও বানিয়েছেন তিনি।

 

আরো যা যা আছে

কলমদানির ওপরে রিকশা পেইন্ট। সঙ্গে আছে টিস্যুবক্স। টিস্যুবক্সের কোনোটির নকশায় রিকশা পেইন্ট আবার কোনোটিতে সাঁওতাল আর্ট। শখের হাঁড়িও আছে। আরো মিলবে গামছার গয়না। কুষ্টিয়ার গামছার পাশাপাশি ফতুয়া পাবেন। নানা রকমের বাঁশের ঝুড়ি ছাড়াও বাঁশ ও বেতের তৈরি সরপোশও পাওয়া যাবে। রাজশাহীর টেপাপুতুল ও ধামরাইয়ের মেটাল পুতুলও আছে। আছে জামদানি স্কার্ফও।

শাওন আকন্দ আরো বলেন, ‘যথাশিল্প হচ্ছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে আমরা একই সঙ্গে ওয়ার্কশপ করি, ইভেন্ট করি, ক্রাফটস মেকিং করি। আমরা চাই এমন একটি জায়গা তৈরি হবে, যেখানে লোকশিল্প, কারুশিল্প, ফাইন আর্টস এক জায়গায় চলে আসবে।’

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা