kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

লোকনায়ক

ফুলগাছটি লাগাইছিলাম

রুমালে মুখ চেপে ধরে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসত মানুষজন। মানিক আকবর বলছেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের কথা। এখন অবশ্য সেই পরিবেশ বদলে গেছে আর বদলে দিয়েছেন ডা. শামীম কবির

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফুলগাছটি লাগাইছিলাম

বেশি না, তিন বছর আগের কথা। হাসপাতালের বাইরের পরিবেশ ছিল নোংরা। ভেতরটাও ছিল অপরিচ্ছন্ন। ময়লা পানি বেরিয়ে যাওয়ার ড্রেন আবর্জনায় ভরে থাকত। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে যোগ দেন ডা. শামীম কবির। যোগ দেওয়ার পর থেকেই অনেক অভিযোগ পেতে থাকলেন। এর যত না চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে, তার চেয়েও বেশি হাসপাতালের পরিবেশ নিয়ে। চিকিৎসা নিতে যাঁরা হাসপাতালে আসেন, তাঁরা দুর্গন্ধে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেকে টিকতে না পেরে অন্য কোনো ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে চলে গেছেন এমন ঘটনাও অনেক।

 

বৈঠক করলেন শামীম

চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে বৈঠক করলেন ডা. শামীম কবির। পরামর্শ চাইলেন কিভাবে হাসপাতালে সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলা যায়। কেউ কেউ তো বললেন, ‘লোকবল কম। আগেও চেষ্টা করা হয়েছে। লাভ হয়নি। হবেও না। হাসপাতালকে পরিচ্ছন্ন রাখা যাবে না।’ তবে বেশির ভাগ মত দিলেন, সম্মিলিত চেষ্টা থাকলে হবে। তাই গঠন করা হলো সদর মডেল হাসপাতাল বাস্তবায়ন কমিটি, চুয়াডাঙ্গা। কমিটির সভাপতি হলেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন। সাধারণ সম্পাদক করা হলো চুয়াডাঙ্গার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী দেলোয়ার উদ্দীন জোয়ার্দ্দার দুলুকে। শামীম তারপর বিষয়টি শুধু আলোচনার টেবিলে ফেলে রাখলেন না, কমিটির সহায়তায় নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করলেন। এদিক-ওদিকে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে ফেলতে লাগলেন। জায়গাগুলোয় যেন নতুন আবর্জনা জমতে না পারে তার জন্য সব ফাঁকা জায়গায় ফুলের গাছ লাগিয়ে দিলেন। আবর্জনা ফেলার স্থান নির্দিষ্ট করে দিলেন।

 

ফুল কাজে দিল

কয়েক মাস যেতে না যেতেই ফুলগাছগুলো বড় হয়ে উঠল। গাছে গাছে ফুল ফুটল। আগে রোগী বা রোগীর স্বজনরা যেখানে-সেখানে আবর্জনা ছুড়ে ফেলতেন। সব ফাঁকা জায়গায় বাগান হয়ে যাওয়ায় আবর্জনা ছুড়ে ফেলতে কারোর মনই সায় দিচ্ছিল না। হাসপাতালের কর্মীরাও সুন্দর পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে যত্নবান ছিলেন। কেউ আবর্জনা ফেলতে চাইলে বাধা দিতেন। যদিও কেউ ভুলে ফেলে দিতেন, তবে পরে তা তুলে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে রাখতেন। এভাবেই বদলে গেল হাসপাতালের পরিবেশ। স্বীকৃতিস্বরূপ ডা. শামীম কবিরকে দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসক পরিবেশ পদক-২০১৮। গেল ২০ জানুয়ারি চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক গোপাল চন্দ্র দাস আনুষ্ঠানিকভাবে পদকটি প্রদান করেন।

 

সরেজমিনে হাসপাতাল

হাসপাতালের চারদিকেই সীমানাপ্রাচীর আছে। সদর দরজা পেরোলেই পাওয়া যায় একটি বড় গোল চত্বর। মাঝখানে বড়সড় একটি গাছ। এটি গ্রিল দিয়ে ঘেরাও করা। হাসপাতালের পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ সব দিকেই ফুলের বাগান। হাসপাতাল ভবনটি তিনতলা। রোগীদের থাকার কেবিন বা ওয়ার্ড সব জায়গা থেকেই ফুলের বাগান দেখা যায়। বাগানে ফুটে আছে ফুল। কোনোটা বেলি, কোনোটা গোলাপ। কিছু ভেষজ গাছও আছে। কোনো দুর্গন্ধ নেই, আছে ফুলের সুবাস। পশ্চিম দিকের ওয়ার্ডে দাদির কোলে একটি শিশুকে দেখতে পেলাম। পৌর এলাকার সাতগাড়ি গ্রাম থেকে তাঁরা এসেছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে। বাইরের ফুলের বাগানে তাকিয়ে আছে শিশুটি। নাম জুবায়ের। দাদি জানালেন, ফুলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই বেশির ভাগ সময় কাটছে জুবায়েরের। সদর উপজেলার হানুড়বাড়াদি গ্রাম থেকে এসেছেন আব্দুল কাদের। বললেন, ‘হাসপাতালে আগের চেয়ে অনেক ভালো পরিবেশ। নোংরা নেই। রাতে ফুলের বাসনা (সুবাস) আসে।’ কমিটির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার উদ্দীন জোয়ার্দ্দার দুলু বলেন, ‘বহির্বিভাগের রোগীদের আগে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাদের বসার জন্য দোতলায় লোহার চেয়ার কিনে দেওয়া হয়েছে। আমরা কমিটির তরফ থেকে ৩০টি সিলিং ফ্যান, নার্সকক্ষে র‌্যাকসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম দিয়েছি। নিয়মিত ব্লিচিং পাউডার সরবরাহ করা হয়। অপারেশনের পর রোগীকে যে কক্ষে রাখা হয়, সেটিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। হাসপাতালে এখন এমন কর্মীও আছেন, যাঁদের বেতন দেয় কমিটি।’

ডা. শামীম কবির বললেন, ‘২৫তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০০৬ সালে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগদান করি। তিন মাস পর সেখানকার আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার হই। ওই হাসপাতালে চিকিৎসকদের বসার জন্য ভালো কোনো চেয়ার-টেবিল ছিল না। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে প্রথম আসি ২০০৮ সালে। ২০১১ সাল পর্যন্ত ছিলাম। তারপর উচ্চতর ডিগ্রির জন্য রংপুর চলে যাই। সেখান থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবরে আবার সদর হাসপাতালে এসে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার পদে যোগ দিই। কমিটির সদস্যদেরই কৃতিত্ব বেশি। তাঁরা অত্যন্ত আন্তরিক। তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া পরিবেশ বদলানো সম্ভব ছিল না।’

 

ছবি : লেখক

মন্তব্য