kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

রাব্বির মাকড়সা

মাকড়সা আর ঘাসফড়িংয়ের সুন্দর এক জগৎ বানিয়েছেন রাশিদুল ইসলাম রাব্বি। কোনো কোনো মাকড়সার ছবি তুলতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা সময়ও পার করেছেন। তিনি ম্যাক্রোফটোগ্রাফার। আদীব আরিফ গল্প করে এসেছেন

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাব্বির মাকড়সা

খালি চোখে খুব ভালো দেখা যায় না—এমন সব প্রাণীর ছবি বড় করে তোলার উপায় ম্যাক্রোফটোগ্রাফি। এতে রাব্বি প্রথম আকৃষ্ট হন ২০১৩ সালে। টমার শাহানের সঙ্গে রাব্বির পরিচয় ফেসবুকে। টমারের ওয়ালে কিছু মাকড়সার ছবি দেখে রাব্বির কৌতূহল জাগে। এমনিতে ম্যাক্রোফটোগ্রাফি বেশ খরচসাধ্য ব্যাপার। ম্যাক্রো লেন্সের দাম কম করেও ৪০ হাজার টাকা। টমার তাঁকে বাতলে দেন খরচ কমানোর উপায়। রাব্বি তাঁর সনি আলফা নাইনটি ক্যামেরাটি বিক্রি করে দিয়ে একটি ক্যানন সিক্স হান্ড্রেড ডি কেনেন। কারণ টমারের কাছে রাব্বি জেনেছেন এই ক্যামেরায় প্রাইম লেন্স (১৮-৫৫ এমএম) উল্টো করে বসিয়ে ম্যাক্রোফটোগ্রাফি ভালো করে করা যায়।

 

রাব্বি নির্বাচিত

জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ডে ফটো কম্পিটিশন ২০১৭-তে রাব্বির একটি ছবি সেরা দশের তালিকায় ছিল। সারা বিশ্ব থেকে আলোকচিত্রীরা এতে অংশ নিয়েছেন। ১০টি দেশের ১০টি ছবি সেরার তালিকায় জায়গা নেয়। বাংলাদেশের রাব্বির ছবি তার একটি। রাব্বির ছবিটির পাত্র একটি মাকড়সা। ছবিটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে তুলেছিলেন। যেদিন ছবিটি তুলতে বেরিয়েছিলেন, তার আগে বেশ কিছুদিন ছবি তোলায় বিরতি ছিল। অসুস্থতাই মূল কারণ। তাই অনেক দিন পর ছবি তুলতে বেরিয়ে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করছিলেন না। সারা দিন ঘোরাঘুরি করেও একটি ভালো ছবি পেলেন না। হতাশ হয়ে হলে ফিরলেন। ভাবলেন, হলে তো আমার একটি লাকি প্লেস আছে, সেখানে একটা ট্রাই করি। অনেকক্ষণ চেষ্টা চালিয়ে সত্যি একটি ভালো ছবি পেয়ে গেলেন। সাহস করে ওই ছবিটিই জমা দিলেন। নির্বাচিতও হয়ে গেলেন। 

রাব্বি কিন্তু লাইফস্টাইল, নেচার আর স্ট্রিট ফটোগ্রাফিও করেন। ম্যাক্রোতে তিনি মাকড়সা ছাড়াও ঘাসফড়িংয়ের ছবি তোলেন।

 

তোলেন চঞ্চল মাকড়সা

সাধারণত জাম্পিং মাকড়সা খুঁজে বেড়ান রাব্বি। এটি খুবই চঞ্চল। খুব ছোটাছুটি করে। অল্প সময়ের জন্য স্থির পাওয়া গেলেও কম্পোজিশন ঠিক করতে করতেই আবার অস্থির হয়ে ওঠে। তাই ঘণ্টা ধরে তার পেছনে ঘুর ঘুর করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে লাইট কম্বিনেশন ঠিক রাখতে রাব্বিকে ডিফিউজার ব্যবহার করতে হয়। নিজেই নিজের মনমতো একটি ডিফিউজার তৈরি করে নিয়েছেন রাব্বি। একটি ভালো ম্যাক্রো ছবির জন্য কম করেও ৫০-১০০টি শট নিতে হয়। তারপর সেরাটি বাছাই করেন। ম্যাক্রোফটোগ্রাফি শুরুর সময়টায় একটি ভালো ছবির জন্য ৩০০-৩৫০টি শটও নিয়েছেন। এ পর্যন্ত রাব্বি মোট ১০৫ প্রজাতির মাকড়সার ছবি তুলেছেন আর ঘাসফড়িং তুলেছেন ১৫ প্রজাতির। মোট ১২০ প্রজাতির পতঙ্গের জন্য ছবি তুলেছেন ৭০ হাজারেরও বেশি।

জগৎটি মনোমুগ্ধকর

একেকটি মাকড়সা সাত-আটটি রং ধরে। ক্যামেরায় খুব সুন্দর দেখায়। তবে তুলতে হয় খুব ধৈর্য ধরে। বাংলাদেশে বনজঙ্গল, ঝোপঝাড় হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। মাকড়সার বাসস্থানও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি সংরক্ষণে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে তারা বড় প্রাণীর প্রতি নজর রাখলেও মাকড়সা নিয়ে কাজ সে রকম করেনি। তাই এই মনোমুগ্ধকর জগিটকে রাব্বি প্রতিদিনই নতুন করে আবিষ্কার করেন।  রাব্বির ছবি স্পেন, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। জার্মানির একটি প্রদর্শনীতেও তাঁর দুটি ছবি প্রদর্শিত হয়েছে।

 

একজন রাব্বি

রাব্বির পড়াশোনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। এখন মাস্টার্সের ফল পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। থাকেন মীর মশাররফ হোসেন হলে। রাশেদ রাশিব নামে বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক বড় ভাই ছবি তোলার অনেক কৌশল শিখিয়েছেন রাব্বিকে। রাশেদ ভাই-ই তাই রাব্বির ওস্তাদ। তবে বিভিন্ন ফটোগ্রাফি কর্মশালায়ও অংশ নিয়েছেন। ২০১১ সাল থেকে তাঁর ছবি তোলা শুরু। তবে আগ্রহ তাঁর ছিল ছোটবেলা থেকেই। ২০০৬ সালে প্রথম ফিল্ম ক্যামেরা দিয়ে হলুদ সরিষাক্ষেতের ভেতর লাল-সবুজের জামা গায়ে এক কিশোরীর ছবি তোলেন। ছবিটির প্রেমে পড়ে যান রাব্বি। এরপর ডিজিটাল ক্যামেরা, মোবাইল ক্যামেরা এবং ২০১১ সালে তাঁর মায়ের জমানো টাকা দিয়ে কেনেন সনি ডিএসএলআর ক্যামেরা। তাই আজ তাঁর চেয়ে তাঁর মায়ের আনন্দ বেশি।

ফটোগ্রাফির পাশাপাশি রাব্বি একজন ভালো সংগঠক। ২০১৩ সালে সহপ্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (জেইউপিএস)। গত বছর তিনি এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে ছাত্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংগঠনটি বিজয় ফাউন্ডেশন কর্তৃক ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড পায় ২০১৬ সালে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা