kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

বিশাল বাংলা

পদ্ম পালঙ্ক

হবিগঞ্জ বহুকাল ধরে দারুশিল্পের জন্য বিখ্যাত। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় এটি টিকে আছে। সেখানকার একজন দারুশিল্পী লিটন মিয়া। পার্থসারথি রায়ের উৎসাহে একটি পদ্ম পালঙ্ক তৈরি করে সম্প্রতি সাড়া জাগিয়েছেন। শাহ ফখরুজ্জামান দেখতে গিয়েছিলেন

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



পদ্ম পালঙ্ক

পার্থ দারুশিল্প নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি নাট্যকর্মীও। বলছিলেন, ‘আমি ইদানীং লোকজ উপকরণ নিয়ে গবেষণা করছি। আগে হবিগঞ্জের নাট্যচর্চার ইতিহাস ও ফটোগ্রাফির ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছি। দারুশিল্পের সমৃদ্ধ জনপদ এই হবিগঞ্জ। কারণ হলো এখানকার পাহাড়ি এলাকা কাঠের অফুরান ভাণ্ডার। হাওরের জমিদার ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজন আগে শখ করে কাঠের নানা রকম আসবাব বানাতেন। নানা গল্পগাথাও ছড়িয়ে আছে এ নিয়ে। সহযোগী হিসেবে পাই নাট্যকার ও লেখক সিদ্দিকী হারুনকে। যাঁরা কাঠের কাজ করেন এবং এলাকার প্রবীণ যাঁরা, তাঁদের কাছ থেকে খবর নিয়ে আজমিরীগঞ্জ, সুজাতপুর, মিরপুর শচীধাম গিয়েছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরও গিয়েছি। আজমিরীগঞ্জের বিখ্যাত দারুশিল্পী কামিনীকুমার সূত্রধরের একটি পালঙ্ক জাতীয় জাদুঘরে আছে জেনে ঢাকায়ও গিয়েছি। আগে সুন্দর সুন্দর পালঙ্ক, দরজা, সিন্দুক, আলমারি তৈরি হতো। ভাটির জমিদাররা এগুলো বানানোর আদেশ দিতেন। কারুকাজ করা আসবাবের প্রতি তাঁদের আলাদা টান ছিল। জমিদাররা দারুশিল্পীদের নিয়ে আসতেন বাড়িতে। সেখানে বছরের পর বছর তাঁদের ভালো সম্মানী এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন। আর দারুশিল্পীরা মনের মাধুরী মিশিয়ে কাঠের মাঝে ফুটিয়ে তুলতেন নকশা। অনেক সময় কলকাতা থেকেও আসতেন শিল্পী। আজমিরীগঞ্জের নুরু মিয়া চেয়ারম্যানের বাড়িতে একটি পালঙ্ক এখনো টিকে আছে। কামিনীকুমার সূত্রধর এটি তৈরি করেছিলেন। তৈরি করতে নাকি ১২ বছর লেগেছিল। কামিনী কুমার দিরাই ভাটিপাড়ার জমিদার পুুতুলবাবুর বাড়িতে দীর্ঘ ১৪ বছর কাজ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে আছে বানিয়াচং কালীবাড়ির কাঠের মূর্তি ও আজমিরীগঞ্জ জিউর মন্দিরের মূর্তি।’ পার্থ বানিয়াচংয়ে দারুশিল্পী কৃষ্ণমোহন সূত্রধরের কাঠের তৈরি দুর্গামূর্তিও দেখে এসেছেন। এর বয়স দেড় শ বছর হবে। এ ছাড়া হবিগঞ্জ সদরের উমেদনগর আলগাবাড়ির এমদাদ উদ্দিন আহমেদের বাড়ির সুদৃশ্য পালঙ্কের কথাও জানালেন পার্থ। কৃষ্ণমোহনের তৈরি বিথঙ্গল আখড়াটিও বিখ্যাত। নবীগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ইসকন মন্দিরের রথও তাঁর তৈরি।

পার্থ বললেন, ‘আমার মনে হয়, কম করেও দেড় শ বছর হবে হবিগঞ্জের দারুশিল্পের বয়স। জানতে পেরেছি হবিগঞ্জ ইসকন মন্দিরের পাশে দেশভাগের আগে একটি কাঠের কারখানা ছিল। তখন সুন্ধি, চাম্বল ও গামারি কাঠের ওপর নকশা হতো বেশি।’

 

পদ্ম পালঙ্কের কথা

পার্থ কারুকাজ করা একটি পালঙ্ক তৈরির ইচ্ছা করেন। খুঁজতে থাকেন একজন ভালো শিল্পী। অনেকেই তাঁকে শহরের শ্মশানঘাট এলাকার লিটন মিয়ার নাম বলেন। লিটন মিয়া তাঁর আগ্রহ দেখে সানন্দে রাজি হয়ে যান। পার্থর পরামর্শ নিয়ে তিনি পৌরাণিক ও লোকজ নকশায় শুরু করেন পদ্ম পালঙ্ক তৈরির কাজ। লিটন মিয়া বলেন, ‘আমার ৮-১০ জন কারিগর আছে। নকশা হয়ে গেলে কারিগররা সবাই মিলে সাত মাস লাগিয়ে এই পালঙ্ক তৈরি করি।’ লিটন মিয়া নিজে দেড় শ জন কারিগর তৈরি করেছেন। এর মধ্যে কারিগর খাইরুল ইসলামের নাম করতে হয় বিশেষভাবে। এ ছাড়া বাকপ্রতিবন্ধী মুস্তফার কাজেও তিনি মুগ্ধ। লিটন মিয়ার এক ছেলে ও এক মেয়ে। তারা স্কুলে পড়ে।

পার্থর দুঃখ, এখন আর কেউ নিজে বুদ্ধি করে নকশা করে না। গ্রাহকরা বিভিন্ন বই থেকে নকশা দিয়ে যান। সেগুলো নকল করার কাজই হয় বেশি। তাই বলছিলেন, সরকারকে এই শিল্প রক্ষায় উদ্যোগী হতে হবে। নইলে ক্রমে ক্রমে শিল্পীরা অন্য পেশায় ঝুঁকবে।

এ শিল্প থেকে রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব।

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা