kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

মানিকগঞ্জ

মিরান উদ্দিন

গুটিকয় স্কুলছাত্র। কিন্তু তাদের নিয়েই মুসলিম লীগ নেতারা বিচলিত। পুলিশ পিছু নিল তাঁদের। গ্রেপ্তারও হলো কয়েকজন। তাঁরা ভাষার দাবিতে লড়েছেন। মিরান উদ্দিন দুই মাস আত্মগোপনে থাকলেন। সাব্বিরুল ইসলাম সাবু শুনেছেন সেসব দিনের কথা

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মিরান উদ্দিন

মাত্র কিছুদিন আগে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা দিয়ে গেছেন—উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। শুনে বাঙালি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঢেউ এসে লাগে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামেও। ঢাকা থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউটের ছাত্রদের কাছে পাঠিয়ে দেন বাংলা ভাষার দাবিতে কিছু লিফলেট। ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা বের করেন বিক্ষোভ মিছিল। পরে সমাবেশও করেন। সংগঠক ছিলেন নবম শ্রেণির ছাত্র মিরান উদ্দিন, ওয়াজেদ উদ্দিন, নিরঞ্জন বসু, দশম শ্রেণির রেহাজউদ্দিন ও ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী যতীন দাস।

এখন ৮৪ বছর বয়স মিরান উদ্দিনের। একমাত্র মেয়ের সঙ্গে ঘিওরে ভাড়া বাসায় থাকেন।

 

নন্দি স্যারের কথা বলি

তখন কে এন ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক ছিলেন প্রমথ নাথ নন্দি। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। ছাত্রদের খুব স্নেহ করতেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা, গান-বাজনা, নাটকচর্চায় উৎসাহ দিতেন; বিশেষ করে বলতেন বই পড়তে। নন্দি স্যার ছাত্রদের বলতেন, রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারব না। সহজে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারব না। বলতেন, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে সংগ্রাম করতে হবে। দিন-তারিখ ঠিক মনে নেই মিরান উদ্দিনের। তবে বিদ্যালয়ের পলাশগাছটিতে রক্তরাঙা ফুল ধরেছিল। তাই মাসটি ফাল্গুনই হবে। ‘আমি ছিলাম ক্লাস ক্যাপ্টেন। বিদ্যালয়ের পিয়ন মোহন দাস এসে কিছু লিফলেট দিলেন। বললেন, নন্দি স্যার বিলি করতে বলেছেন। লিফলেটের কথাগুলো সব মনে নেই। তবে মূল বক্তব্য ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। উর্দু হরফ চলবে না। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম ক্লাস বর্জন করে মিছিল নিয়ে ঘিওর সদরে গিয়ে সমাবেশ করব। সকাল ১০টার দিকে স্কুলের সব ছাত্র ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিয়ে মিছিল নিয়ে এগোতে থাকি।  তখন নদীতে কোনো সেতু ছিল না। খেয়া নৌকায় নদী পারাপার হতে হতো। মিছিল নিয়ে নদীর ঘাটে যাওয়ার পর ঘিওরের দিক থেকে আসা লোকজন ছাত্রদের আর এগোতে মানা করে। তারা জানায়, ঘিওর থানায় পুলিশরা রাইফেল তাক করে অবস্থান নিয়েছে। মিছিল নিয়ে গেলে গুলি করতে পারে; কিন্তু ছেলেরা যাবেই। এলাকার কয়েকজন মুরব্বি ছাত্রদের যেতে দিলেনই না। ছাত্ররা মিছিল নিয়ে ফিরে আসে স্কুলে। স্কুল প্রাঙ্গণেই সমাবেশ হয়। সেদিন আর স্কুলে ক্লাস হয়নি।’

 

লজিং থাকতেন

সে সময় মিরান উদ্দিন লজিং থাকতেন তেরশ্রী গ্রামে মীর সাহেবের বাড়িতে। মিছিল-মিটিং শেষে বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলছিলেন গ্রামের মাঠে। হঠাৎ করে মীর সাহেব এক ছেলের মাধ্যমে খবর পাঠান মিরানকে সরে পড়তে। স্থানীয় চেয়ারম্যান তাইজুদ্দিন ঠাকুরের মাধ্যমে তিনি খবর পেয়েছেন যে ছাত্ররা মিছিল, মিটিং আর লিফলেট বিলি করেছে, তাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করবে। মিরান উদ্দিন আশ্রয় নেন বড় মিলান গ্রামের সাত্তার মুন্সীর বাড়িতে। উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে রাত পার করেন। সকালে জানতে পারেন পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ওয়াজেদ উদ্দিন, রেহাজ উদ্দিন, নিরঞ্জন ও যতীনকে। তাঁর খোঁজে মীর সাহেবের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া আরো অনেকের বাড়িতে হানা দিয়েছে। দুপুর নাগাদ খবর পান আটক ছাত্রদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়ে মানিকগঞ্জ কোর্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বুঝতে পারেন তেরশ্রী গ্রামের এত কাছে সাত্তার মুন্সীর বাড়িও নিরাপদ নয়। রাতেই তিনি সরে পড়েন। এরপর দূরের আত্মীয় বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে আত্মগোপন করে থাকেন প্রায় দুই মাস। এর মধ্যে আটক হওয়া ছাত্রদের মানিকগঞ্জ কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে একপর্যায়ে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। এরপরই মিরান উদ্দিন আত্মগোপন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসেন।

কিন্তু এখানেই শেষ হলো না। মিরান উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় ঘিওর থানার তখনকার ওসি দবিরউদ্দিন খুব রেগে ছিলেন। তাইজুদ্দিন ঠাকুরের মাধ্যমে মিরান উদ্দিনকে তিনি ডেকে পাঠান থানায়। তাইজুদ্দিন ঠাকুর নিজেও সঙ্গে গেলেন। পুলিশ তাঁদের ওসির রুমে বসতে দেয়। ওসি ঘরে ঢুকেই মিরানকে গালাগাল করতে থাকে। একপর্যায়ে লাথি মারতে এগিয়ে আসে। বলে, মিছিল-মিটিং করলে জেলের ঘানি টানতে হবে। এর আগে মুসলিম লীগ নেতারা আটক ছাত্রদের বলেছিলেন, প্রমথ নন্দির নির্দেশে মিছিল করেছে, এখন মুচলেকা দিলে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ছাত্ররা রাজি হননি।

 

আত্মজীবনী লিখছেন

১৯৩৪ সালে জন্ম মিরান উদ্দিনের। ১৯৯৬ সালে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন।  স্ত্রী গত হয়েছে প্রায় পাঁচ বছর আগে। সময় কাটে দুই নাতি-নাতনির সঙ্গে খেলাধুলা আর গল্প করে। পত্রপত্রিকা আর বই পড়ার  অভ্যাস আছে। সম্প্রতি লিখতে শুরু করেছেন আত্মজীবনী। বললেন, আত্মজীবনীতে অবশ্যই থাকবে ভাষা আন্দোলনের কথা। বলবেন,  কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার কথা। বললেন, অনেক টাকা-পয়সার মালিক হইনি, এতে দুঃখ নেই। মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি তাতে আমি সুখী। ভাষা আন্দোলন আমাকে অধিকারসচেতন করে তুলেছে, দেশকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। তবে  যাঁরা জীবন বাজি রেখে ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছেন, তাঁদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হলে ভালো লাগত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা